বিকেএমইএ’র সংবাদ সম্মেলন
পোশাক শিল্পের উন্নয়নে শ্রম অধ্যাদেশের সংশোধন পুনর্বিবেচনার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম/ছবি: সংগৃহীত
শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর কিছু বিধান পুনর্বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের টেকসই উন্নয়ন, উৎপাদন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই হস্তক্ষেপ কামনা করেছে সংগঠনটি।
রোববার (৫ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম এ দাবি জানান।
সংগঠনটি বলছে, প্রস্তাবিত কিছু সংশোধনী শিল্পের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় অর্থনীতিতেও। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতকে সুরক্ষা দিতে এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ চান হাতেম।
তিনি বলেন, যারা এ ধরনের সংশোধন প্রস্তাব করেছেন তারা চান না দেশে শিল্প থাকুক। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করেছেন। তারা দেশের শত্রু এবং বিদেশের এজেন্ট বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী নেতা। এ সংশোধন প্রস্তাব পাশ হলে শ্রমিক ও মালিকরা একে অপরের প্রতিপক্ষ হবে এবং অসন্তোষ তৈরি হবে বলেও উল্লেখ করেন মোহাম্মাদ হাতেম। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর একাধিক ধারা পুনর্বিবেচনা ও সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বিকেএমইএ।
সংগঠনটির মতে, বর্তমান সংশোধিত অধ্যাদেশের কিছু বিধান শিল্প খাতের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং তা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর মধ্যে কিছু ধারা অস্পষ্ট এবং শিল্পবিরোধী, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সংশোধনের সুপারিশ তুলে ধরেছে।
প্রধান আপত্তি ও প্রস্তাবিত সংশোধন
শ্রমিক সংজ্ঞা
বর্তমান সংশোধিত আইনে ‘শ্রমিক’ সংজ্ঞার আওতা অত্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিকেএমইএ’র মতে, এতে ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকের মধ্যে পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, সংজ্ঞাটি সীমিত করে শুধুমাত্র প্রকৃত শ্রমিক শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত রাখা। এতে প্রশাসনিক বিভ্রান্তি কমবে এবং শ্রম আইন প্রয়োগে স্পষ্টতা বজায় থাকবে।
শ্রমিক কর্তৃক চাকরির অবসান
এই ধারার অধীন কোনো স্থায়ী শ্রমিক যদি চাকরিতে ইস্তফা দেন, সেক্ষেত্রে মালিক ওই শ্রমিককে বিভিন্ন ধাপে ক্ষতিপূরণ দেবেন বলে বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আইনে চাকরিতে তিন বছর পূর্ণ করলেই ক্ষতিপূরণ প্রযোজ্য করা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্তরে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি কোনো শ্রমিক তিন বছর পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে মালিকের অধীন চাকরি করেন তাহলে তিনি সাত দিনের মজুরি পাবেন। অন্যদিকে, যদি তিন বছরের বেশি কিন্তু ১০ বছরের কম মেয়াদে মালিকের অধীন অবিচ্ছিন্নভাবে চাকরি করেন তাহলে ১৫ দিনের মজুরি এবং ১০ বছর বা তদুর্ধ্ব সময় চাকরি করলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ দিনের মজুরি অথবা গ্রাচ্যুইটি—যেটি বেশি হবে সেটি দিতে হবে।
এক্ষেত্রে বিকেএমইএ’র প্রস্তাব হলো আগের তুলনায় ধাপে ধাপে অর্থাৎ ৩-৫ বছর, ৫-১০ বছর ও ১০ বছরের বেশি যৌক্তিক কাঠামো বজায় রাখা। সংগঠনটি মনে করে, হঠাৎ করে কম সময়ের জন্য ক্ষতিপূরণ চালু হলে মালিকপক্ষের ব্যয় বেড়ে যাবে এবং শ্রমিকদের ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতা বাড়তে পারে।
যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি
বর্তমান আইনে একটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌথ দরকষাকষি বা সিবিএ হিসেবে গণ্য হয়। বিকেএমইএ’র প্রস্তাব হলো—কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি একটিমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন থাকে সেক্ষেত্রে উক্ত ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠানের জন্য যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি বলে গণ্য হবে।
ভবিষ্যৎ তহবিল ও পেনশন স্কিম
কোনো প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১০০ জন স্থায়ী শ্রমিক কর্মরত থাকলে, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক শ্রমিকদের সুবিধার জন্য ভবিষ্যৎ তহবিল গঠন করবেন। তবে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবলের মধ্যে যারা লিখিতভাবে আগ্রহ প্রকাশ করবেন তাদের জন্য জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রবর্তিত সর্বজনীন পেনশন স্কিম ‘প্রগতি’-তে অংশ নিলে ভবিষ্যৎ তহবিল গঠনের বিধান থেকে অব্যাহতি পাবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত স্কিমে মালিক ও কর্মরত শ্রমিক উভয়েই ৫০ শতাংশ চাঁদা দেবেন।
প্রসূতি কল্যাণ সংজ্ঞা
বিকেএমইএ মনে করে, বর্তমান আইনে প্রসূতি কল্যাণের সুবিধা বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তাই এটি সরল ও সাধারণ রাখার পক্ষে মত দিয়েছে সংগঠনটি। অতিরিক্ত বিধান যুক্ত হলে বাস্তব প্রয়োগে জটিলতা বাড়তে পারে বলে মনে করছে বিকেএমইএ।
ট্রেড ইউনিয়ন সংখ্যা বৃদ্ধি
বর্তমান সংশোধনে একটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচটি পর্যন্ত ইউনিয়ন অনুমোদনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিকেএমইএ’র দাবি, সীমা নির্দিষ্ট রেখে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। তারা মনে করে অতিরিক্ত ট্রেড ইউনিয়ন শিল্পে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হয়রানি ও বৈষম্য তদন্ত কমিটি
নতুন আইনে বাইরের সংগঠনের সদস্য অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখানে কারখানার কর্মীর বাইরে থেকে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিকেএমইএ চায় শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সদস্য দিয়ে কমিটি গঠন হোক। তারা মনে করে এতে গোপনীয়তা রক্ষা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে।
বৈষম্য প্রমাণের দায়
প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য, সহিংসতা ও হয়রানির অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করতে হবে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী প্রতিনিধি থাকবে। এর মধ্যে একজন নারী প্রধান থাকবেন এবং দুজন বাইরের বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এছাড়া বৈষম্যের ক্ষেত্রে প্রমাণের দায় নিয়োগকর্তার ওপর থাকবে।
সংশোধিত আইনে প্রমাণের দায় নিয়োগকর্তার ওপর আরোপ করার ধারা বাতিল চায় বিকেএমইএ। তাদের যুক্তি, একতরফাভাবে দায় চাপালে আইনি ঝুঁকি ও অপব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিকেএমইএ মনে করে, শ্রম আইন অবশ্যই শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করবে, তবে তা যেন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, আমরা এরই মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি বিস্তারিত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছি। আশা করছি, এ বিষয়ে সরকার দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে। সংশোধিত শ্রম আইন অপরিবর্তিত থাকলে শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ হ্রাস এবং রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শিল্পের স্বার্থ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সংশোধনীগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
আইএইচও/এমএমকে