জ্বালানি সংকট কাটাতে কৌশলগত মজুত গড়ে তুলতে হবে: ড. ইজাজ
‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অতিথিরা/ছবি: সংগৃহীত
দেশে চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে কেবল সরবরাহ বাড়ানো নয়, বরং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং শিল্পখাতে বিকল্প উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ অভিমত দেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশের গ্যাস খাতে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। একসময় ৩ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদনের তথ্য তুলে ধরা হলেও বর্তমানে উৎপাদন ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডিরও নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে চাহিদা বেড়ে প্রায় ৪ হাজার এমএমসিএফডিতে পৌঁছেছে। ফলে প্রায় ১ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, এটা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, আমরা এখনো জ্বালানি সংকটেই আছি। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কৌশলগত মজুতের প্রয়োজনীয়তা
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে কৌশলগত মজুত (স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ) গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ৯০ দিনের মজুতের কথা বলা হলেও অনেক উন্নত দেশও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, আমরা যদি ৪৫ দিনের মজুত নিশ্চিত করতে পারি, সেটাই অনেক বড় অগ্রগতি হবে।
ড. ইজাজ ব্যাখ্যা করে বলেন, এই মজুত কেবল জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য নয়, বরং বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমেও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তেলের দাম যখন কম থাকে তখন কিনে রাখা এবং দাম বাড়লে ব্যবহার বা বিক্রি করা গেলে স্বাভাবিক সময়েই এই মজুতের খরচ উঠে আসতে পারে।
মূল্য অস্থিরতা ব্যবস্থাপনায় সুযোগ
ইজাজ হোসেন বলেন, বছরে একাধিকবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামা করে। এই মূল্য অস্থিরতাকে (প্রাইস ভোলাটিলিটি) সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে দেশের জন্য তা লাভজনক হতে পারে।
আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে কম দামে কিনে বেশি দামে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে সেটাই আমাদের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভের খরচ বহন করতে পারবে—যোগ করেন তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমাবদ্ধতা
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক সময় স্থাপিত সক্ষমতা (মেগাওয়াট) দেখে ভুল ধারণা তৈরি হয়। এক মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ মানে এক মেগাওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নয়।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সৌরবিদ্যুৎ রাতের বেলায় উৎপাদন সম্ভব নয় এবং ব্যাটারি সংযুক্ত করলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এটি জীবাশ্ম জ্বালানির সমপর্যায়ে চলে আসে।
ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দেশটিতে বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য সক্ষমতা থাকলেও মোট বিদ্যুৎ সরবরাহে এর কার্যকর অবদান তুলনামূলক কম। একইভাবে পাকিস্তানে কিছু এলাকায় দিনে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নেট-জিরো অর্জনে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শুধু নবায়নযোগ্য বা পারমাণবিক জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, নেট জিরোতে যেতে হলে এনার্জি এফিশিয়েন্সি এবং এনার্জি কনজারভেশন অপরিহার্য। এটি একটি সংস্কৃতির মতো গড়ে তুলতে হবে।
শিল্পখাতে অপচয় ও বিনিয়োগ সংকোচন
শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারে অদক্ষতা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনো দক্ষতা বাড়াতে বিনিয়োগে অনাগ্রহী। দুই পয়সা বেশি খরচ হবে বলে তারা বিনিয়োগ করতে চায় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি বড় ক্ষতির কারণ।
সরকারি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মাধ্যমে খরচ কমানো সম্ভব। অনেক শিল্পে এখনো নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে গ্যাসের তুলনায় কম খরচেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগে। সেই হিসেবে ১০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা বাড়াতে ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
এ ধরনের বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে—এ প্রশ্ন তুলে ড. ইজাজ বলেন, শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে।
আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, দেশে সংকট এলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ক্রাইসিস এলে আমরা অনেক কথা বলি, কিন্তু পরে সব ভুলে যাই। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে টেকসই সমাধানে যেতে হবে।
এমএএস/এমএমকে