আ’লীগ আমলে অর্থনীতি ধ্বংসের যে চিত্র সংসদে তুলে ধরলেন অর্থমন্ত্রী
সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী/ছবি: সংগৃহীত
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ বছর সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী এ অভিযোগ করেন। সেই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সরকারের আমলের অর্থনৈতিক সূচক, সামাজিক বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার বিস্তারিত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে এবং অতীত সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
আমির খসরু জানান, বর্তমান মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে জনগণ মোট চারবার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপিকে এ সুযোগ দিয়েছিল। সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল মেয়াদে তারা এ দায়িত্ব পালন করেছেন। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বিএনপি জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে বিশ্বাস করে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে।
এ দায়বদ্ধতা থেকে অর্থমন্ত্রী সংসদে বিএনপির সর্বশেষ অর্থবছর ২০০৫-০৬, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছর ও অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, সামাজিক খাতের সূচক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরেন।
ভ্রান্ত নীতি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি
অর্থমন্ত্রী বলেন, ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে। বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে এসে প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধূলিস্যাৎ করা হয়।
আরও পড়ুন
সংসদে পাস হলো বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন অধ্যাদেশ
পুঁজিবাজারের ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে হবে বিশেষ কমিশন
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
আমির খসরু বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে এবং কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে আসে।
কর্মসংস্থান ও কাঠামোগত সংকট
আমির খসরু বলেন, অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। গত এক দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষি খাতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু এসময়ে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ, আর শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতেই বেশি করে নিয়োজিত হয়েছে। এতে করে ছদ্ম-বেকারত্ব তীব্রতর হয়েছে এবং তরুণদের শ্রমশক্তি অপচয় হয়ে তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। বর্তমানে কৃষি খাত মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ যোগ করলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এ খাতে নিয়োজিত। এ বৈপরীত্য কৃষি খাতে শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতাকে ইঙ্গিত করে ও শ্রমবাজারের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। এটা কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধির ঝুঁকিরই পরিচায়ক।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগ
আমির খসরু বলেন, ২০০১-০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় জিডিপির ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ছিল ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এ চিত্র উল্টে যায়। বিনিয়োগ জিডিপির ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় নেমে আছে ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে। বিনিয়োগ সঞ্চয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা বৈদেশিক উৎস হতে সংস্থান করা হয়েছে। ফলে বহিঃখাতের ওপর চাপ বেড়েছে।
টাকার বিনিময় হার
তিনি জানান, ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭ দশমিক ২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা হয়েছে ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ টাকায়। ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতাকে কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।

মুদ্রা সরবরাহ
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ (এম২) প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা অর্থনীতিতে প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। এম২ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও ঋণ প্রবাহ
আমির খসরু জানান, ২০০৬ সালের জুনে অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধিও ২১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপের বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে, ২০০৫-০৬ সালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সময়ে মুদ্রানীতির অব্যবস্থাপনাসহ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৯ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০২৪-২৫ সালে আরও কমে সাড়ে ৬ শতাংশে এসে পৌঁছেছে।
আর্থিক ব্যবস্থাপনা
মন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময় রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায়ও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক মাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমাবদ্ধ থেকেছে।
মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যয় ছিল ১১ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪ হাজার ৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশেই স্থির থাকে। তবে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ২ শতাংশে। ফলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ০৫ শতাংশে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজেট ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু বাজেট ঘাটতি যে বেড়েছে তাই নয়, এ বৃদ্ধির মানও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত এবং এগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ফলশ্রুতিতে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেননি। লুটপাটের মাধ্যমে লাখো কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রতিবেদনে বিশদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আরও পড়ুন
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সংসদে অর্থমন্ত্রী
জ্বালানিতে ভর্তুকির বাইরেও লাগবে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, বাজেট ঘাটতি বাড়বে
তিনি আরও বলেন, সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং তুলনামূলক উচ্চ সুদের ব্যয় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের দায়ও বৃদ্ধি পায়।
ঋণ ও সুদ পরিশোধ
আমির খসরু জানান, ২০০৫-০৬ সালে মোট সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমান ছিল যথাক্রমে সাড়ে ১৪ ও ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া, সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা। অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ সালে মোট ঋণ-জিডিপির অনুপাত প্রায় একই থাকলেও অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমান দাঁড়ায় যথাক্রমে সাড়ে ২১ ও ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির শতাংশে কমলেও এই ঋণের একটা অংশ অরেয়াতি বা অনেক ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক কিংবা মিশ্র হওয়ায় দেশের ঋণ পরিশোধের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ বিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ১৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অধিক নির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তি কঠিন হয়েছে, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়ে থাকে।
আমদানি-রপ্তানি, প্রবাস আয় ও রিজার্ভ
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে সাড়ে ১০ বিলিয়ন ও ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬ ও ১২ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ও সাড়ে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২৩-২৪ সালে রপ্তানি ও আমদানি বেড়ে যথাক্রমে ৪০ দশমিক ৮ ও ৬৩ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও এই দুটি সূচকের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। এছাড়া, আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এসময় রেমিট্যান্স বেড়ে ২৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ালেও হুন্ডি প্রবাহ বা অর্থপাচারের কারণে রিজার্ভের পরিমাণ কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, বলেন আমির খসরু।
তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে আসে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় (৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার), যা রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পরিমাণগত অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও গুণগত দিক থেকে ভারসাম্যহীনতা, নীতি সমন্বয়ের ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় উপনীত হয়েছিল, যা থেকে উত্তরণ আজকের সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মাথাপিছু আয়
আমির খসরু জানান, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিকে তাকালে সংখ্যাটি প্রথমে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। কিন্তু এ নিয়েও বড় বিতর্ক আছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কিন্তু সেই আয়ের সিংহভাগ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীর হাতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপের (হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে- এইচআইইএস) তথ্য অনুযায়ী, আয়-ভিত্তিক জিনি কোফিশিয়েন্ট ২০০৫ সালে ছিল ০ দশমিক ৪৬৭। ২০০৫ এর পর থেকে এই সূচকের ধারাবাহিক অবনতি হয়ে সর্বশেষ ২০২২ সালে এসে পৌঁছায় ০ দশমিক ৪৯৯ পয়েন্টে।
মন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ খানার আয় ছিল সবচেয়ে কম আয়ের পাঁচ শতাংশ খানার ৩৫ গুণ। ২০২২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১ গুণ। ফলশ্রুতিতে একটি বৈষম্যমূলক অলিগার্কিক সমাজের উত্থান হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি
অর্থমন্ত্রী বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভাতা দেওয়া হলেও এর কাভারেজ ও ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিকীকরণ করা হয়নি। এতে উপকারভোগীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বাইরে থেকে গেছে, যা ক্রমান্বয়ে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচনেও দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করা, যা গত ফ্যাসিস্ট সরকার সুনিপুণভাবে করে গেছে। প্রশিক্ষিত ও পেশাদার আমলাতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি রাজনৈতিক সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। ১৬ বছরে একে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে খ্যাত আর্থিক খাত ধ্বংসের কিনারে এসে দাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন
৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি
রপ্তানিকারকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল চালু
তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য দুটি সূচক সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ- শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার এবং মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও (সিএআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসে সেই চিত্র আমূল পাল্টে গেছে। সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে। এখানে উল্লেখ, খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিক ভাবে অনুসৃত সংজ্ঞাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে ভুলভাবে প্রদর্শন করে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে।
আমির খসরু বলেন, মূলধন পর্যাপ্ততার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে সিএআর ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ৩ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে আসে। মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো এই ব্যাংকগুলো কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘ দেড় দশকের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণদান এবং সুশাসন ও জবাবদিহির অনুপস্থিতির অনিবার্য পরিণতি।
রাজস্ব প্রশাসন
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম স্তম্ভ হলো রাজস্ব আহরণ। অথচ দীর্ঘদিন রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণে কর আহরণের সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হয়নি।
তথ্য ব্যবস্থাপনা
তিনি বলেন, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে নীতিনির্ধারণে সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ, রপ্তানির ক্ষেত্রে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জনের একটি তথ্য বিভ্রাট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, যা সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে।
সরবরাহ চেইন
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে এ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করেছে।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার এমন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব নেয়, যেখানে বহিঃখাতের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একযোগে বিদ্যমান ছিল। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল এবং আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছিল একটি বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। উল্লেখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় জনগণ বিএনপিকেই তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে দেশ পরিচালনা এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের।
এমএএস/একিউএফ
সর্বশেষ - অর্থনীতি
- ১ ডিএপির বিরুদ্ধে কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ
- ২ বিএনপি আমলে সবসময় আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ছিল: অর্থমন্ত্রী
- ৩ আ’লীগ আমলে অর্থনীতি ধ্বংসের যে চিত্র সংসদে তুলে ধরলেন অর্থমন্ত্রী
- ৪ ২০২৫ সালে রেকর্ড ১৩২৪ কোটি টাকার মুনাফা সিটি ব্যাংকের, প্রবৃদ্ধি ৩১%
- ৫ সংসদে পাস হলো বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন অধ্যাদেশ