ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

যুদ্ধের প্রভাবে আইএমএফের ঋণ সহায়তা বাড়তে পারে ২০ বিলিয়ন ডলার

ইব্রাহীম হুসাইন অভি | প্রকাশিত: ০৯:৪২ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের সরবরাহজনিত ধাক্কা দিয়েছে। জ্বালানি বাজার, মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এ যুদ্ধ। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা লাগতে পারে বলে জানায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বে দৈনিক তেল সরবরাহ প্রায় ১৩ শতাংশ এবং এলএনজি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। এ ধরনের ধাক্কা স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়িয়ে দেয়। যেমন যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার, তা বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছায়। যদিও এখন কিছুটা কমেছে, তবুও আগের তুলনায় অনেক বেশি।

এ প্রভাব মোকাবিলা করতে নিকট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যালান্স-অব-পেমেন্টস সহায়তার চাহিদা বাড়বে এবং এটি আনুমানিক ২০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে জানায় সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ‘স্প্রিং মিটিংস’ বা ২০২৬ সালের বসন্তকালীন বৈঠকের আগে গত ৯ এপ্রিল দেওয়া এক বক্তৃতায় এ তথ্য জানান সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।

এপ্রিল মাসের ১৩-১৮ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থমন্ত্রীরা যোগ দেবেন।

জর্জিয়েভা বলেন, এখন সবাইকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। কোন দেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নির্ভর করছে তারা সংঘাতের কতটা কাছে, তারা জ্বালানি আমদানিকারক নাকি রপ্তানিকারক এবং তাদের নীতিগত সক্ষমতার ওপর।

জ্বালানি সরবরাহে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ও দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে, যার প্রভাব উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই অনুভূত হচ্ছে।

ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একটি বড়, বৈশ্বিক ও অসম ধরনের সরবরাহ ধাক্কা, যেখানে বিশ্বে দৈনিক তেল সরবরাহ প্রায় ১৩ শতাংশ এবং এলএনজি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে কিছুটা কমলেও এখনো আগের তুলনায় অনেক বেশি।

এই ধাক্কার কারণে তেল শোধনাগারের কার্যক্রমে বিঘ্ন, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের ঘাটতি, পরিবহন ও বাণিজ্যে ব্যাঘাত এবং খাদ্যনিরাপত্তা সংকট দেখা দিয়েছে—যেখানে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়েছে। পাশাপাশি শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলও চাপের মুখে।

যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে জর্জিয়েভা বলেন, স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি আবারও একটি বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে, যা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সংকটের সৃষ্টি করেছে। এই যুদ্ধসহ অন্য সব যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি আমি গভীর সমবেদনা জানাই।

আইএমএফ

চলতি সপ্তাহে আমাদের স্প্রিং মিটিংসে যখন মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা একত্রিত হবেন, তখন আমাদের মূল লক্ষ্য হবে এই নতুন ধাক্কা কীভাবে মোকাবিলা করা যায় এবং মানুষ ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কীভাবে কমানো যায়। এজন্য প্রয়োজন এই ধাক্কার প্রকৃতি, প্রভাব বিস্তারের পথ, পরিমাণ এবং তা মোকাবিলার নীতিগুলো ভালোভাবে বোঝা। বলেন জর্জিয়েভা।

অর্থনীতিতে প্রভাব

এই ধাক্কাটি তিনটি প্রধান উপায়ে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমত, মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতি। গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের দাম বাড়লে তা বিভিন্ন ভোক্তাপণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। একই সঙ্গে সরবরাহ কমে গেলে জোরপূর্বকভাবে চাহিদা কমে।

দ্বিতীয়ত, ব্যয়বহুল মূল্যস্ফীতির একটি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা বেড়েছে। ইউরো অঞ্চলেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা এখনো স্থিতিশীল রয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, আর্থিক পরিস্থিতির মাধ্যমেও এর প্রভাব পড়ে। শুরুতে যা খুব সহায়ক ছিল, তা ধীরে ধীরে কঠোর হয়েছে। তবে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটেছে। উদীয়মান বাজারের বন্ডের স্প্রেড উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, শেয়ারের দাম সমন্বিত হয়েছে এবং ডলারের মান বেড়েছে। বর্তমানে আবার কিছুটা শিথিলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

আইএমএফের পরামর্শ

শুরুতেই একটি সতর্ক বার্তা দিয়ে আইএমএফ প্রধান বলেন, এটি একটি নেতিবাচক সরবরাহ ধাক্কা, তাই চাহিদার সমন্বয় এড়ানো যাবে না।

জর্জিয়েভা বলেন, নীতিনির্ধারকরা বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে পারেন। অবশ্যই তাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়। তাই আমি সব দেশকে আহ্বান জানাই—এককভাবে নেওয়া পদক্ষেপ যেমন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। কারণ এগুলো বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। আগুনে ঘি ঢালবেন না।

আরও পড়ুন

জেট ফুয়েলের আকাশচুম্বী দামে আকাশপথে ভ্রমণে অশনিসংকেত
বৈশাখী বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব, বিক্রিতে ধস
ইরান যুদ্ধে অর্থনীতিতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

এর বাইরে অতীতের ধাক্কাগুলোর মতোই সতর্কতা ও দ্রুত অভিযোজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চ্যালেঞ্জ হবে এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে কখন এবং কীভাবে আমরা এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় চলে যাচ্ছি তা শনাক্ত করা।

তিনি বলেন বর্তমানে, অপেক্ষা করা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার মধ্যে মূল্য আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্য স্থিতিশীলতার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি জোর দিয়ে জানাতে হবে। আর্থিক কর্তৃপক্ষগুলো দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ও অস্থায়ী সহায়তা দিতে হবে, যা তাদের মধ্যমেয়াদি আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

যদি মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে ও ব্যয়বহুল মুদ্রাস্ফীতি চক্র শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দৃঢ়ভাবে সুদের হার বাড়াতে হবে। আর্থিক সহায়তা তখনও লক্ষ্যভিত্তিক ও অস্থায়ী থাকা উচিত। অবশ্যই, সুদের হার বৃদ্ধি প্রবৃদ্ধিকে আরও ধীর করবে—এটাই এর স্বাভাবিক প্রভাব, বলে মত দেন জর্জিয়েভা।

সবশেষে যদি আর্থিক পরিস্থিতির কঠোরতা একটি নেতিবাচক চাহিদা ধাক্কা তৈরি করে, যা সরবরাহ ধাক্কার সঙ্গে যুক্ত, তাহলে মুদ্রানীতি আবারও একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার কাজে ফিরে যাবে। তখন যদি আর্থিক সামর্থ্য থাকে তবে আর্থিক নীতি সুপরিকল্পিত চাহিদা সহায়তায় রূপান্তরিত হবে বলে মনে করেন জর্জিয়েভা।

বাড়তে পারে ব্যালান্স-অব-পেমেন্টস সহায়তার চাহিদা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ছড়িয়ে পড়া প্রভাব বিবেচনায় আমরা আশা করছি নিকট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যালান্স-অব-পেমেন্টস সহায়তার চাহিদা বাড়বে। এটি আনুমানিক ২০ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকবে। যদি যুদ্ধবিরতি বজায় থাকে, তাহলে এই পরিসরের নিম্নসীমা, যা ২০ বিলিয়ন ডলার কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

তিনি আরও বলেন, এখানে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, গত কয়েক দশক ধরে অনেক উদীয়মান বাজার অর্থনীতির দেশ সুশৃঙ্খল নীতি নির্ধারণ করেছে। যে কারণে এই সহায়তার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি না হয়ে এই পরিসরে সীমিত আছে। দ্বিতীয়ত, এই ধাক্কা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে।

তাই আমাদের ১৯১টি সদস্য দেশ প্রয়োজনে অর্থায়নের মাধ্যমে আমাদের সহায়তার ওপর ভরসা করতে পারে। তারা এটাও আশা করতে পারে যে আমরা তাদের একত্রিত করে অনিশ্চয়তার এই ঘন কুয়াশার মধ্য দিয়ে সামনে এগোনোর পথ খুঁজে বের করবো। এটাই হবে আগামী সপ্তাহের মূল কাজ।

আইএইচও/এএসএ