ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

বৈশাখী বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব, বিক্রিতে ধস

এমদাদুল হক তুহিন | প্রকাশিত: ০৭:৪২ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • সন্ধ্যায় মার্কেট বন্ধ হওয়ায় বিক্রিতে ভাটা
  • পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও নতুন সংগ্রহ থাকলেও ক্রেতা নেই
  • প্রায় ৫০ শতাংশ পোশাক বিক্রি না হওয়ার শঙ্কা
  • পোশাক বিক্রি না হলে দেনা-পাওনা পরিশোধ নিয়ে শঙ্কা

অন্তর্বর্তী সরকারের ‘ভয় ও মবের’ সংস্কৃতি কাটিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সময়ে দেশে উদযাপিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। এবার ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখের ব্যবধানও প্রায় ২০ দিন। সে হিসাবে দেশের পোশাক ব্র্যান্ড ও কারুশিল্পীরা সময় পেয়েছেন ১৫ দিনের বেশি। ভয়হীনভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নিয়েছেন ব্যাপক প্রস্তুতি। পোশাক বিক্রেতাদের প্রস্তুতিও ভালো।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্তে বেচাকেনায় অশনিসংকেত। বৈশাখের শাড়ি-পাঞ্জাবি তো বটেই, কারুশিল্পসহ প্রস্তুত করা বিভিন্ন পোশাক নিয়ে দুশ্চিন্তায় বিক্রেতারা।

বিক্রেতাদের বেশিরভাগ বলছেন, বৈশাখের জন্য প্রস্তুত করা পোশাকের অধিকাংশই রয়ে যাবে। ক্রেতারা মার্কেটে আসতে না পারায় এ অবস্থা। কেউ কেউ বলছেন, বিক্রি ভালো হচ্ছে। এক বছর পর বৈশাখে ভালো বেচাকেনা করতে পারছেন তারা। পোশাকের দাম রয়েছে আগের মতোই।

রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি পোশাক ব্র্যান্ড পহেলা বৈশাখ ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। দোকানগুলোতে ক্রেতাদের টুকটাক ভিড়ও রয়েছে। বিক্রিও হচ্ছে মোটামুটি। আবার কোনো কোনো দোকানে ক্রেতা নেই। অলস সময় পার করছেন বিক্রেতারা।

jagonews24

ফ্যাশন ব্র্যান্ডের উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ বলছেন, বৈশাখ উপলক্ষে প্রস্তুত করা পোশাকের মধ্যে এবার গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশই থেকে যেতে পারে। এর চেয়ে বাজে বৈশাখ আর আসেনি বলেও মন্তব্য কারও কারও।

আজিজ সুপার মার্কেটের বিসর্গ শোরুমের বিক্রয়কর্মী রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বৈশাখের পাঞ্জাবি, শাড়ি, থ্রি-পিস, ওয়ান পিস, বাচ্চাদের পাঞ্জাবি, ছোট মেয়েদের টপস এসেছে। এর বাইরে পহেলা বৈশাখ কেন্দ্র করে আমাদের কিছু এক্সট্রা শাড়ি এসেছে। আমাদের মূল আকর্ষণ শাড়ি-পাঞ্জাবি। আমাদের সেল খুব ভালো।’

আরও পড়ুন
সন্ধ্যায় শপিংমল-দোকান বন্ধ হওয়ায় বিক্রিতে ধস, ধাক্কা বৈশাখী বাজারেও
গ্যাস সংকটে পোশাক কারখানায় উৎপাদন ৫০% কমেছে: ঢাকা চেম্বার
বৈশাখের রঙিন সাজে নতুন তাঁতের পোশাক

তিনি বলেন, ‘গতবার বা আগেরবার যেমন দাম ছিল, এবারও দাম তেমনই রাখা হয়েছে। দাম বাড়ানো হয়নি এবার। শাড়ি ২ হাজার ১৫০ থেকে শুরু হয়ে ২ হাজার ৬৫০ টাকা, বড়দের পাঞ্জাবি ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা, ছোটদের পাঞ্জাবি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। ছোট মেয়েদের টপস ৬৮০ থেকে ১ হাজার ৮০ টাকা। সাইজ ভেদে দামে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। গতবারও আমাদের ভালো বিক্রি হয়েছে, এবারও বিক্রি ভালো।’

jagonews24

এই বিক্রয়কর্মী আরও বলেন, ‘ঈদের পর আমাদের ২৬ মার্চের প্রোডাক্ট ছিল। ঈদ, পূজা-পার্বণ সব উৎসব কেন্দ্র করেই আমাদের বিশেষ আয়োজন থাকে।’

দেশীয় পোশাক ব্র্যান্ডের ইনচার্জ রোমানা হামিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার ঈদের পর আমরা সময় পেয়েছি। গত বৈশাখে এই সময় পাওয়া যায়নি। বিক্রি মোটামুটি ভালো। বৈশাখে শাড়ি-পাঞ্জাবি ভালো বিক্রি হচ্ছে। আমাদের পোশাকের দাম হাতের নাগালে। বেশিরভাগ কাপড় বেক্সি ভয়েল ও কটন।’

লণ্ঠন শোরুমের বিক্রয়কর্মী মাসুদ বলেন, ‘এবার বৈশাখের ব্যবসায় ধস। সব কাপড় রয়ে গেছে। বিক্রি করতে পারছি না। কারণ ক্রেতারা আসেই সন্ধ্যা ৭টার পরে। কিন্তু সেই সময় দোকান বন্ধ করতে হয়। যখন ক্রেতা আসতে শুরু করে তখনই মার্কেট কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের লাইন অফ করে দেয়। ফলে বেচাকেনা করতে পারছি না।’

আবির্ভাবের বিক্রয়কর্মী শ্যামল বিশ্বাস বলেন, ‘বৈশাখ উপলক্ষে আমরা কটন কাপড়ের ওপর প্রিন্টের পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন পণ্য এনেছি। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রেতা নেই। সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে ক্রেতা বেশি আসে, অথচ সেই সময়ই মার্কেট বন্ধ রাখতে হচ্ছে—এতে বিক্রি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এবার ঈদ ও পহেলা বৈশাখ কাছাকাছি হওয়ায় উৎপাদনেও সমস্যা হয়েছে। ঈদের পণ্যে ব্যস্ত থাকায় বৈশাখের জন্য পর্যাপ্ত পণ্য প্রস্তুত করা যায়নি। তার ওপর ঈদের ছুটিতে কারিগররা না থাকায় উৎপাদন আরও কমে গেছে।’

এই বিক্রেতা আরও বলেন, ‘দামের দিক থেকে গতবারের মতোই রাখার চেষ্টা করেছি। যেমন একটি পাঞ্জাবির মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও ডিসকাউন্ট দিয়ে ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ৮০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তারপরও ক্রেতারা দরদাম করছেন। আগে যেখানে ফিক্সড প্রাইস ছিল, এখন পরিস্থিতির কারণে তা আর রাখা যাচ্ছে না। মোটকথা, ব্যবসার অবস্থা এখন খুবই খারাপ।’

আরও পড়ুন
জ্বালানি সংকটে বান্দরবানে হোটেল-রিসোর্টে কমেছে আগাম বুকিং
সংকটের মধ্যেও ঐতিহ্যের টানে কর্মব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা
যুদ্ধের প্রভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা

এই মার্কেটে বন্ধুর সঙ্গে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন ফাহমিদা নামের এক তরুণী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাড়ি-পাঞ্জাবি দেখতে আসছি। বাজার যে খুব বেশি রমরমা তেমন দেখছি না। পছন্দ তেমন হচ্ছে না। কালেকশনও তেমন নেই।’

jagonews24

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন শাহীন। আজিজ সুপার মার্কেটে এসেছেন বৈশাখের পাঞ্জাবি কিনতে। নিজের পাঞ্জাবি পছন্দ হওয়ার পর একই সঙ্গে মেয়ে ও স্ত্রীর জন্য থ্রি-পিস ও শাড়ি কেনেন। শাহীন বলেন, ‘বৈশাখের বাজার এবার খুবই মন্দা। আমি ৬টার দিকে মার্কেটে এসেছি। নিজের পাঞ্জাবি পছন্দ করেছি। কিন্তু ৭টায় মার্কেট বন্ধ হয়ে যাবে। তাই মেয়ে ও মেয়ের মাকে ছাড়াই তাদের কাপড় কিনেছি। ঠিকভাবে পছন্দ করে ও সময় নিয়ে কেনাকাটা করা যাচ্ছে না।’

যা বলছেন ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মালিকরা

ফ্যাশন হাউস ‘সাদাকালো’র অন্যতম উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন এন্টারপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি আজহারুল হক আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি আগের কয়েক বছরের তুলনায় ভালো ছিল। কারণ গত কয়েক বছর বৈশাখ ঈদের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আলাদা করে প্রস্তুতির সুযোগ ছিল না। কিন্তু এবার ঈদের পর ১০ থেকে ১৫ দিনের একটি সময় পাওয়া গেছে, তাই সবাই বেশি করে প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রস্তুতির সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে আমরা এখনো সংশয়ে। এ অবস্থায় আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, সকালের সময় কমিয়ে দিয়ে মার্কেট অন্তত রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হোক। তাহলে অন্তত ব্যবসা কিছুটা সচল রাখা সম্ভব হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বৈশাখ উপলক্ষে প্রস্তুত করা পোশাকের মধ্যে কারও হয়তো প্রায় সব থেকে যাবে, আবার কারও হয়তো ৫০ শতাংশ থেকে যাবে, গড়ে এবার বৈশাখ খুবই খারাপ। আমার ধারণা, এর আগে কখনো বৈশাখ বোধহয় এত খারাপ যায়নি।’

jagonews24

পোশাক ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা জাগো নিউজকে বলেন,‘ বৈশাখের বাজার বেশ বড়। অনেক সময় তা ঈদের চেয়েও বড়। কারণ সব ধর্মের মানুষ বৈশাখে কেনাকাটা করেন। আর আমরা এবার ঈদের পর ১৫ দিনের বেশি সময় পেয়েছিলাম। অর গতবার তো বৈশাখ হয়নি। ফলে এবার আমাদের প্রস্তুতি বেশ ভালো ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশে সন্ধ্যা ৭টায় মার্কেট বন্ধের সিদ্ধান্তে আমরা দিশাহারা হয়ে পড়েছি। যে বিনিয়োগ করেছিলাম, মার্কেটে ক্রেতা যেতে না পারায়, আমরা বিরাট সংকটে পড়েছি।’

বিপ্লব সাহা বলেন, ‘বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এই সময়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পণ্য-যেমন টেপা পুতুল, শখের হাড়ি, কুলা, বিভিন্ন কারুশিল্প—এসব সারা বছর বিক্রি হয় না, শুধু বৈশাখেই চাহিদা থাকে। এসব পণ্যের সঙ্গে গ্রামের অসংখ্য মানুষ জড়িত। তারা যদি এই সময় পণ্য বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে এবং দেনা-পাওনা শোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে।’

ইএইচটি/ইএ