আটকে গেলো ১৭১৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি
শিক্ষা মন্ত্রণালয় লোগো
বিদায়বেলায় অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে একসঙ্গে এক হাজার ৭১৯টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তোড়জোড় শুরু করেছিল। মাত্র ৮ দিনে সাড়ে তিন হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক যোগ্য বিবেচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরে তা অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি চেয়ে পাঠানো চিঠিতে সাড়া দেয়নি অর্থ বিভাগ। পাশাপাশি ‘নজিরবিহীন’ এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ঘুসবাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে জাগো নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে টনক নড়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সরকারের আমলে এমপিওভুক্তি চূড়ান্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
নাম প্রকাশ না করে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘১৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করলে সরকারের ব্যয়ের বোঝা বাড়বে। বছরে ৬৭০ কোটি টাকা খরচ বাড়বে। এটা বিবেচনায় নিয়ে এবং এ সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি এটি চূড়ান্ত করলে সমালোচনা হবে উল্লেখ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও আপাতত এ নিয়ে আর জোর দিতে আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন।’
গত ৫ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচনা করে এমপিওভুক্তির অনুমতি চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব বেসরকারি মাধ্যমিক-৩-এর উপসচিব সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী।
জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিয়ম মেনে এমপিওভুক্তির আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়েছিল। সেটি অর্থ বিভাগে অনুমতির জন্য পাঠানো হয়েছে। এরপর আর কোনো আপডেট তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থ বিভাগ অনুমোদন দিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন
১৭১৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তোড়জোড়, নেপথ্যে ‘ঘুসবাণিজ্য’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠির তথ্যানুযায়ী- গত ১৪ জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে অনলাইনে আবেদন নেওয়া শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ আবেদন প্রক্রিয়া চলে গত ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে মোট ৩ হাজার ৬১৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও পেতে অনলাইনে আবেদন করে। আবেদন শেষে শুরু হয় যাচাই-বাছাই।
কিন্তু মাত্র আট কর্মদিবসে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষ করে ফেলেছে এমপিও কমিটি। তালিকা চূড়ান্ত করে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) এক হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচনা করে এমপিওভুক্তির অনুমতি চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ৪৭১টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৩৫টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৪৫টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ, স্নাতক পাস কলেজ ৭৮টি, ২৩২টি স্নাতক (সম্মান) কলেজ এবং স্নাতকোত্তর কলেজ ৩৫টি।
এদিকে, ‘রকেট গতিতে’ আবেদনগ্রহণ, যাচাই-বাছাই শেষে এতসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ ওঠে, প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানভেদে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুস লেনদেন হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষক প্রতি ১০ লাখ টাকা করে লেনদেন হয়েছে। ফলে যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বেশি, সে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে ঘুসও বেশি। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেনদেনের পরিমাণ অর্ধকোটি ছাড়িয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত হলে হঠাৎ করেই সরকারের খরচ বাড়বে। বছরে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে খরচ হবে ৬৭০ কোটি টাকারও বেশি। অথচ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই কাম্য শিক্ষার্থী। নামকাওয়াস্তে চলা স্কুল ও কলেজকে এমপিওভুক্তি করা হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে।
যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, শিক্ষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে যাচ্ছে। এখানে কোনো অর্থের লেনদেন হয়নি। যাচাই-বাছাই করে এ তালিকা চূড়ান্ত করেছেন তারা।
এএএইচ/এমএএইচ/