ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. শিক্ষা

রোজায় যে কারণে স্কুল খোলা রাখতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়

আল-আমিন হাসান আদিব | প্রকাশিত: ০৭:৪১ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এবার পবিত্র রমজানে মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয় (ষষ্ঠ-দশম) খোলা রেখে বাৎসরিক ছুটির তালিকা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাতে আপত্তি শিক্ষক ও অভিভাবকদের। লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েও সাড়া না পাওয়ায় বিষয়টি গড়ায় হাইকোর্টে। রিট আবেদন করেন এক আইনজীবী। রিটের ওপর শুনানির পর উচ্চ আদালত ১৮ ফেব্রুয়ারি (রোজা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ) থেকে নিম্ন-মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন।

ধারণা করা হচ্ছিল—হাইকোর্টের আদেশ মেনে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে স্কুলে ছুটি ঘোষণা করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে দেখা গেলো ভিন্নচিত্র। নিজেদের সিদ্ধান্তেই অনড় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত রমজানে স্কুল বন্ধে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।

আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রণালয়ের আপিলের ওপর শুনানি হবে। সেখান থেকে আসবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ফলে এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—রমজানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এত তোড়জোড় কেন?

যে কারণে স্কুল খোলা রাখতে চায় মন্ত্রণালয়
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষকদের আন্দোলন, বৈরী আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বছরে নির্ধারিত যে ক্লাস হওয়ার কথা, তা কোনো বছরই হয়নি। এতে পাঠদান ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের মাঝে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি। ধারাবাহিক এ শিখন ঘাটতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

রমজানের পরই কিন্তু গ্রীষ্মকালীন অবকাশ। আবার কোরবানির ঈদ। সবমিলিয়ে ক্লাসের সময়টা আর মিলছে না। এ কারণে রোজার প্রথমার্ধে (১৫ দিন) স্কুলে এবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এখন বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। ফলে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসবে। এ নিয়ে মন্তব্য করাটা সমীচীন হবে না

এ কারণে কয়েক বছর ধরে রোজাসহ নির্ধারিত বিভিন্ন ছুটি কিছুটা কমিয়ে ক্লাসের কর্মদিবস বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছিল। এ বছর তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাৎসরিক ছুটির তালিকায় ছুটির দিন কমানো হয়েছে।

আরও পড়ুন
রমজানে মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের আদেশ চেম্বারে স্থগিত
রমজানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি নিয়ে ‌‘ধোঁয়াশা’

মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, গত বছর মাউশির মনিটরিং ও ইভালুয়েশন বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা কেমন শিখছে, তা নিয়ে প্রতিবেদন করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীরা খুবই দুর্বল। তারা কোনো রকমে উপরের ক্লাসে উঠে গেছে। যেটুকু তাদের শেখাটা বাধ্যতামূলক, সেটুকুও শিখতে পারেনি। এর পেছনে যেসব কারণ উঠে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম ক্লাস কম হওয়া। কোথাও কোথাও বছরে ১০০ দিনেরও কম ক্লাস হয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এজন্য ক্লাসের সংখ্যা বাড়াতে ছুটি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও একই পরামর্শ দিয়েছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব রেহেনা পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা হয়তো কমে আসবে। শিক্ষকদের কর্মবিরতি বা আন্দোলন ঠেকানো গেলেও প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের ক্ষেত্রে কারও হাত নেই। যেমন- শৈত্যপ্রবাহ, তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসটা নিরবচ্ছিন্ন পাঠদানের উপযুক্ত সময়। এবার সেসময় রমজান পড়েছে। এসময়ে কিছু ক্লাস হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি কমবে।’

তিনি বলেন, ‘দেখুন, রমজানের পরই কিন্তু গ্রীষ্মকালীন অবকাশ। আবার কোরবানির ঈদ। সবমিলিয়ে ক্লাসের সময়টা আর মিলছে না। এ কারণে রোজার প্রথমার্ধে (১৫ দিন) স্কুলে এবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এখন বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। ফলে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসবে। এ নিয়ে মন্তব্য করাটা সমীচীন হবে না।’

প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র
এবার বাৎসরিক ছুটির তালিকায় ১২ দিন ছুটি কমিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালে যেখানে বাৎসরিক ছুটি ছিল ৭৬ দিন। এবার তা কমিয়ে করা হয়েছে ৬৪ দিন। পাশাপাশি রমজানের প্রথম ১৬/১৭ দিন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ।

যেহেতু ক্লাস কম হওয়ার একটি বিষয় সামনে এসেছে এবং তা সত্যিও; এক্ষেত্রে রমজানে ১০-১২ দিন যদি ক্লাস হয়, তা কর্মঘণ্টা কমিয়ে শিডিউল করা যেতে পারে। তাতে শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতেই পড়ালেখায় কিছুটা এগিয়ে যাবে

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, গত বছর (২০২৫) শিক্ষকরা প্রায় ৩৫ দিন কর্মবিরতি পালন করেছেন। শৈত্যপ্রবাহ, তাপপ্রবাহ ও বন্যার কারণে ছুটি ছিল দুই সপ্তাহের বেশি। এতে বছরে ১০০ দিনের কম ক্লাস হয়েছে। সেজন্য ছুটি কমিয়ে ক্লাস বাড়াতে বাৎসরিক ছুটির তালিকা ও শিক্ষাপঞ্জিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের উপ-পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জয়নাল আবেদীন জাগো নিউজকে বলেন, ‌ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা এবার ছুটি কমিয়েছি। ছুটির তালিকা অনুযায়ী- রমজানের প্রথম দিকে কিছুদিন স্কুল খোলা থাকবে। রমজান, ঈদসহ কয়েকটি ছুটি ৮ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখা হবে। তবে আদালতের নির্দেশনা বা মন্ত্রণালয় চাইলে তাতে পরিবর্তন আনতে পারে।

শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা যা বলছেন
শিক্ষার্থীদের সরাসরি ক্লাসে পাঠদান করেন শিক্ষকরা। তারা অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। শিক্ষকরা বলছেন, রমজানে স্কুল খোলা থাকলেও তা খুব একটা কাজে আসে না। সেজন্য বন্ধ রাখারই পক্ষে শিক্ষকদের একটি অংশ। তবে অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, রমজানে সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এনে বা স্কুলের সময় কমিয়ে খোলা রাখলে ভালো হবে।

রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘রমজানে এবার স্কুল খোলা রাখার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় খুব সিরিয়াস। কিন্তু আমরা শিক্ষকরা যেটুকু দেখি রোজার মধ্যে ক্লাস চালু থাকলেও শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসতে চায় না। অষ্টম, নবম ও দশমের অনেক ছাত্র-ছাত্রী রোজা রাখতে শুরু করে। তারা রোজা রেখে ক্লাসে আসতে অনীহা দেখায়।’

তবে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার শিক্ষক সাইদুল ইসলাম অবশ্য ভিন্নমত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু ক্লাস কম হওয়ার একটি বিষয় সামনে এসেছে এবং তা সত্যিও; এক্ষেত্রে রমজানে ১০-১২ দিন যদি ক্লাস হয়, তা কর্মঘণ্টা কমিয়ে শিডিউল করা যেতে পারে। তাতে শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতেই পড়ালেখায় কিছুটা এগিয়ে যাবে।’

আরও পড়ুন
পুরো রমজানে মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ হাইকোর্টের

ক্লাসের সময় কমিয়ে খোলা রাখা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। তিনি সম্প্রতি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান ছিলেন।

সেক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা বা ক্লাসের সময় কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। অথবা দিনে যেখানে ৬টি বিষয়ের ক্লাস হতো সেখানে তিনটি নেওয়া যেতে পারে

অধ্যাপক মনজুর আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাৎসরিক যে ছুটির তালিকা করেছে, তা নিশ্চয়ই শিক্ষার অংশীজনদের পরামর্শে সভা করেই করেছে। তাহলে এটা হঠাৎ একেবারে বাতিল করে দেওয়াটা যৌক্তিক নয়। যদি কেউ সরকারের বা মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতে যান, তাহলে সেখানে মন্ত্রণালয়েরও উচিত কেন তারা সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল, তা তুলে ধরা।’

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সব দিক বজায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যায় কি না, তা বিবেচনার পরামর্শ দিয়ে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা শিখছে কম, এটা তো সত্য। সব গবেষণা-জরিপে তো সেটা উঠে আসছে। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে ক্লাস কম হওয়া একটি। সেটি সমাধানে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সেটা রমজানে ছুটি কমিয়ে হোক কিংবা অন উপায়ে।’

‘যদি রমজানের ছুটি কমানোর প্রয়োজন থাকে, সেক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা বা ক্লাসের সময় কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। অথবা দিনে যেখানে ৬টি বিষয়ের ক্লাস হতো সেখানে তিনটি নেওয়া যেতে পারে’—যোগ করেন অধ্যাপক মনজুর।

এএএইচ/এমকেআর