বই আলোচনা
মস্তকের বিস্ফোরণ: অন্তর্গত বিস্ফোরণের ভাষান্তর
ফাইল ছবি
কাউসার হাসান
সময়ের থাকে নিজস্ব গোপন অভিধান। যে অভিধানে ভাঙনের ভেতর জন্ম নেয় শব্দেরা। ক্ষয়ের ধারে দাঁড়িয়ে তৈরি হয় অর্থেরা। আমিরুল ইসলাম বাপনের কাব্যগ্রন্থ ‘মস্তকের বিস্ফোরণ’ সেই অভিধানেরই দগ্ধ পাঠোদ্ধার; এক অন্তর্গত বিস্ফোরণের ভাষান্তর। ২০২৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় শিখা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের কবিতাগুলো কোনো সরল আবেগরেখা অনুসরণ না করে তারা ভাঙে, ছড়িয়ে পড়ে ও পুনর্গঠিত হয় অস্থির মানসচিত্রের মতো।
বইয়ের নামকবিতায় উচ্চারিত ‘এই সংকুচিত পৃথিবীতে আমার মাথাটা রাখার জায়গা পাচ্ছি না’ যেন সমকালীন অস্তিত্বের কেন্দ্রীভূত রূপক। কবিতায় ‘পৃথিবী’ কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি মানসিক পরিসরের সংকোচন। সত্তা এখানে নিজের জন্য নিজেই হয়ে ওঠে অনধিকার প্রবেশকারী।
‘আগ্রাসন’ কবিতার ‘মানুষ মানুষই রবে, এর বেশি কী চায়?’ পঙক্তি ফিরিয়ে আনে মানবতার আদিম ও অবিভাজ্য ধারণাকে। যেন বহুযুগের ইতিহাস, মতাদর্শ ও বিভাজনের স্তর ভেদ করে মানুষের সহজতম সত্তায় পৌঁছাতে চান কবি।
‘নগ্ন ব্যর্থতা’য় ‘ব্যর্থতার রাত ছিঁড়ে ভোরের সূর্য ওড়াও’ চিত্রকল্পে ব্যর্থতা আর সমাপ্তি নয়, তা এক অন্তঃসত্ত্বা সম্ভাবনা, যার গর্ভে লুকানো থাকে নতুন আলোর বীজ। এখানে অন্ধকার নিজেই আলো জন্মের পূর্বশর্ত।
প্রেমের কবিতাগুলোয় বাপন ভিন্নতর আবহ নির্মাণ করেন। ‘প্রণয়ের ককটেল’ কবিতায় প্রশ্ন ওঠে, ‘কবিতা কি নারী, নাকি বেদনা?’ এ দ্বিধাবিভক্ত প্রশ্নে তৈরি হয় প্রেম, সৃজন ও যন্ত্রণার অবিচ্ছেদ্য ত্রিবেণী। এখানে প্রেম কোনো স্থির অনুভূতি নয়, এটি পরিবর্তনশীল রসায়ন; যেখানে পাশাপাশি অবস্থান করে আকর্ষণ ও ক্ষয়।
‘আমার পণ’ কবিতায় ‘তোমাকে ভালোবাসতে পারাটাই আমার পরম সৌভাগ্য’ উচ্চারণে প্রেম হয়ে ওঠে নীরব অঙ্গীকার। যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে নিবেদনই অধিক মুখ্য। আবার ‘পোঁড়া প্রাণ’ কবিতায় ‘তুমি আমার সব ভাবনা, তোমায় নিয়ে ধ্যান’ প্রেমকে প্রকাশ করে ধ্যানমগ্ন একাগ্রতা হিসেবে। যা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যায় ব্যক্তিসত্তাকে।
সময়ের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনের ভিন্ন ভঙ্গি দেখা যায় ‘লাভ পেনডামিক’ কবিতায়। ‘তোমার চেয়ে বড় পেনডামিক—পৃথিবীতে আর কী আছে বলো?’ ব্যক্তিগত অনুভূতি এখানে বিশ্বজনীন অভিঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সৃষ্টি করে নতুন তাৎপর্য। আর প্রেম যেন সংক্রমণের মতো পাল্টে দেয় ভেতরের ভূগোলকে।
‘মোহমুক্তি’ কবিতার ‘আমাকে উড়তে দাও’ সংক্ষিপ্ত উচ্চারণে নিহিত অন্তর্লীন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এটি কোনো বাহ্যিক উড়াল নয় বরং অন্তর্জাগতিক পরিসর প্রসারিত করার প্রয়াস।
‘সুখের জাহাজ’ কবিতার ‘বড় কোনো নদী হলে সুখের জাহাজ আসবে হয়তো’ পঙক্তিতে প্রতীক্ষা লাভ করে নান্দনিক রূপ। এখানে সময়ের প্রতিরূপ নদী আর অপ্রাপ্তির সম্ভাব্য আগমনী জাহাজ। ‘আশীর্বাদ’ কবিতায় ‘দুঃখকে সঙ্গী করে জীবন কাটাক’ উচ্চারণ শৈল্পিক অভিশাপ।
অন্যান্য কবিতা ‘জাহাসুজ’, ‘ছিলান সভ্যতা’, ‘সমর্পণ’, ‘রেজিমেন্ট’, ‘এ কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম’—সব মিলিয়ে বহুস্বরিক অভিজ্ঞতার পরিসর তৈরি করে। কোথাও আত্মপরিচয়ের ভাঙা আয়না, কোথাও সভ্যতার অবচেতনে জমে থাকা অন্ধকার, কোথাও বা একান্ত ব্যক্তিগত স্বগতোক্তি। এসব মিলিয়ে অন্তর্জাগতিক প্রতিধ্বনি-ভূমি গড়ে ওঠে।
এ কাব্যগ্রন্থ পাঠ করা মানে কোনো সুসংহত গল্পের ভেতর দিয়ে যাওয়া নয়, সংবেদী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা। শব্দ এখানে কেবল বাহন নয়, তারা নিজেই ঘটনা ও নিজেই কম্পন।
সবশেষে বলা যায়, ‘মস্তিষ্কের বিস্ফোরণ’ এমন কাব্যভূমি, যেখানে ভাষা নিজের সীমা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। এই বই পাঠ মানে কেবল কবিতা পড়া নয় বরং অন্তর্লীন শব্দ-বিস্ফোরণের ভেতর দিয়ে নিজস্ব নীরবতার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়া।
বইয়ের নাম: মস্তকের বিস্ফোরণ
কবির নাম: আমিরুল ইসলাম বাপন
ধরন: কাব্যগ্রন্থ
প্রকাশক: শিখা প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: মো. সাদিতউজজামান
মূল্য: ৩০০ টাকা।
এসইউ