ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. একুশে বইমেলা

বই আলোচনা

রাতের হাতে দিনের তসবিদানা: অনিবার্য মশালের দ্যূতি

সাহিত্য ডেস্ক | প্রকাশিত: ০২:৪৪ পিএম, ২৫ মার্চ ২০২৬

এমরান হাসান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অমূল্য অধ্যায়। এটি শুধু ইতিহাসের একটি পর্ব নয় বরং একটি মহা-দর্শনের প্রতিফলন, যেখানে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা, দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অনন্য মিশ্রণ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উপন্যাসগুলো আধুনিক সাহিত্যে একটি গভীর দার্শনিক রূপকল্প সৃষ্টি করেছে, যা কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দলিল নয় বরং একটি জাতির মানসিক অবস্থান, আত্মবোধ ও অস্তিত্বের সংকটের চিত্রও প্রদর্শন করে। এসব উপন্যাসকে একটি সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হলে, তাদের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের উচ্চমানের শৈল্পিক এবং দার্শনিক গহ্বর, যা সময়, স্থান এবং অনুভূতির সীমা ছড়িয়ে বাঙালি জাতির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার চেতনা চিত্রিত করেছে।

এমনই একটি উপন্যাস নুসরাত সুলতানার লেখা ‘রাতের হাতে দিনের তসবিদানা’। এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ হলেও তার প্রকাশভঙ্গি অর্থাৎ বয়ান ভঙ্গিমা সম্পন্ন অন্যরকম। এ উপন্যাসের যিনি প্রধান চরিত্র ব্যক্তিত্ব হয়ে ফুটে উঠেছে। তিনি হয়তো বাস্তব কোনো চরিত্র, যা লেখক স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। লেখক হয়তো চরিত্রটিকেই সৈজুদ্দি নামে উপস্থাপন করেছেন। চরিত্রটির কৈশোর, যৌবনের নানা খাত প্রতিঘাতের বিবরণ নিপুণ হাতে তুলে এনেছেন নুসরাত সুলতানা। তার সাথে কত ভাবে জড়িয়ে গেছে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ। জড়িয়ে গেছে হাজারো মানুষের ভালোবাসা আর উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের চোখের গোপন অশ্রু। একটি উপন্যাস হওয়ার জন্য যে সমস্ত বিষয়ের প্রয়োজন; তার সবটুকুই কাজে লাগিয়েছেন উপন্যাস রচনার সময়।

ছাব্বিশ পর্বে সমাপ্ত উপন্যাসটি প্রথমবার যিনি পড়বেন; তিনি সৈজুদ্দিকে বিভিন্নভাবে অনুভব করবেন। লেখক সেভাবেই উপস্থাপন করেছেন। যেন পাঠকের বুঝতে সুবিধা হয়। আসলে সে কেমন চরিত্রের লোক, তার চিন্তা কাদের নিয়ে এবং তার জীবনের উদ্দেশ্যই বা কী? কৈশোরে প্রথম মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া প্রধান চরিত্র একজন সাধারণ মানুষের মতোই বাঁচতে চায়, থাকতে চায় মা-বাবার স্নেহে, মানুষের কল্যাণে ব্রত হতে চায় সমস্ত জীবনব্যাপী। কিন্তু পেছনে লাগে চিরন্তন শত্রু, তার কৈশোরের প্রেমিকা রিজিয়ার বাবা। কারণ অল্প বয়সের প্রেম। প্রেমের বিষয়টি বেশ চিত্তাকর্ষক না হলেও উপন্যাসের প্রথমদিকে পাঠকের চিন্তাকে হালকা বাঁকবদল করাতে সক্ষম। কেননা ‘রাতের হাতে দিনের তসবিদানা’ মূলত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস নাকি অন্য কিছু? এমন ভাবনা ভাবতে বাধ্য করবে পাঠককে উপন্যাসের বারো অধ্যায় পর্যন্ত। কেননা বারো অধ্যায় পর্যন্ত ঔপন্যাসিক নুসরাত সুলতানা সৈজুদ্দি চরিত্রটিকে সাজিয়েছেন এমনই একটু একটু রূপে, যেখানে একজন ঔপন্যাসিক এ চরিত্রের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে এগোতে থাকেন মহান মুক্তিযুদ্ধের আবহের দিকে। এভাবেই এগোতে থাকে কাহিনি।

উপন্যাস মূলত একটি কল্পিত বাস্তবতার নির্মাণ, যেখানে লেখক একদিকে যেমন জীবনের অনুকরণ করেন; অন্যদিকে তেমনই তাকে পুনর্গঠনও করেন। এ পুনর্গঠনের ক্ষমতাই ঔপন্যাসিকের প্রধান শক্তি। যখন তিনি কোনো পূর্বনির্ধারিত কাঠামো, মতাদর্শ বা অনুকরণমূলক রীতির কাছে আত্মসমর্পণ করেন; তখন তার সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ণ হয়। কিন্তু যখন তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার আলোকে উপন্যাস নির্মাণ করেন; তখন তা হয়ে ওঠে অনন্য শিল্পসত্তা। এই স্বাধীন নির্মাণশৈলী উপন্যাসকে কেবল কাহিনিনির্ভর রচনা থেকে উত্তীর্ণ করে গভীর মানবিক ও দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

স্কুলের মেধাবী ছাত্র সৈজুদ্দির বিনা অপরাধে গ্রেফতার হওয়ার পরই পাল্টে যেতে থাকে জীবন। সময়ের পরিক্রমায় সে রূপ নেয় সৈজুদ্দি ডাকাত নামে। কিন্তু তার ডাকাতি করার উদ্দেশ্য একেবারেই ভিন্ন। সে আশপাশের এবং দূর-দূরান্তের এলাকার জমিদার ধরনের ঘরে ডাকাতি করে। সেই ডাকাতির প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করে নিজের এলাকার সাধারণ মানুষের কল্যাণে। তার চিন্তায় সব সময় খেলা করে গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং নির্যাতিত মানুষের কল্যাণ। এ জন্যই গ্রামের সাধারণ মানুষ তাকে মন দিয়ে ভালোবাসে।কৈশোরের প্রেমিকা রিজিয়াও তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পাঠকের মনে হতে পারে কোথায় মুক্তিযুদ্ধের কথা? কোথায়ই বা সত্য বর্ণনা! এ প্রশ্নের উত্তর পেতে পেরোতে হবে আরও বারোটি অধ্যায়।

সময়ের পরিক্রমায় তার জীবনে আসে রেবেকা নামের তন্বী এক তরুণী। যে সবকিছু দিয়েই স্বামীকে আগলে রাখতে চাইতো, কিন্তু বিধাতা তাকেও সরিয়ে দিয়েছেন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আবার বাঁকবদল হয় সৈজুদ্দির জীবনে। সে সময়ের ক্রমে পাঠগ্রহণ করে চারু মজুমদার-চিন্তার। সেখান থেকে নিজ এলাকায় এসে সে গঠন করে ‘সৈজুদ্দি বাহিনী’। যার মূল কাজ হলো গরিব, অসহায় মানুষের পাশে থাকা কিন্তু তার জন্য অর্থের জোগান দেবে কে? আর কেই বা তাকে দেখাবে উন্নয়ন শুরুর মানচিত্র? অবশেষে সৈজুদ্দির লক্ষ্য আশপাশের জমিদার এবং ধনকুবের পরিবার। শুর হয় তার ডাকাত জীবন। তার ডাকাতির কৌশল বড় অদ্ভুত! কোনো রক্তপাত নেই, হইচই নেই। তার লক্ষ্য টাকা নিয়ে জনগণের কল্যাণ করা।

এভাবেই চলছিল সময়, সৈজুদ্দির জীবন। কাহিনি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঔপন্যাসিক নুসরাত সুলতানা। সাল ১৯৬৬। হঠাৎ মিথ্যা মামলায় আবারও জেলে যেতে হয় সৈজুদ্দিকে। তার হৃদকমলে উজলে ওঠে সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর বিশ্বাস আর ভালোবাসা। রাত জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া, জিকির করেই কাটছিল সময়। নুসরাত সুলতানা লিখেছেন—
‘জেলে আর তেমন কষ্ট হচ্ছে না সৈজুদ্দির। যখন যা প্রয়োজন—খাবার, ওষুধ, বিড়ি সিগারেট বাহির থেকে আনিয়ে নিচ্ছে। দেখা করে গেছে আমেনা বেগম। আসগর মোল্লা প্রায়ই আসে। দেখা করে। যা প্রয়োজন দিয়ে যায়। জেলের অভ্যন্তরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে সৈজুদ্দির আধ্যাত্মিক গুণের কথা। তাছাড়া আশপাশের কয়েদিরা দ্যাখে গভীর রাত অবধি সৈজুদ্দিকে তাহাজ্জুদ নামাজ এবং জিকিরে সময় অতিবাহিত করতে। কয়েদিরা তাদের মাথা ব্যথা, পেট ব্যথার সমস্যা নিয়ে সৈজুদ্দির নিকটে গেলে সে পানি পড়া দেয়, ঝাড়ফুঁক দেয়। তাতে সুস্থ হয়ে যায় অনেকেই। ধীরে ধীরে পুরো কারাগারে সৈজুদ্দির ভক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে।’

এই জেলেই তার সাক্ষাৎ ঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। তার সেবা শুশ্রুষা করার আবদারে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে সৈজুদ্দি। তার মগজে হঠাৎ খেয়াল হয় অনির্বাণ এক দ্যোতনার—গণমানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম। রাতের হাতে দিনের তসবিদানা উপন্যাসের পাতায় পাতায় এমন কাহিনির বর্ণনা নুসরাত সুলতানা করে যাচ্ছিলেন নিপুণ হাতে। বদলে যেতে থাকে উপন্যাসের দিকচিত্র। সৈজুদ্দি ডাকাতের সাধারণ উপন্যাস থেকে নুসরাত সুলতানার হাত ধরে বাঁকবদল করতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে। নুসরাত সুলতানার উপন্যাসে ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গভীর মিশ্রণ ফুটে ওঠে বাস্তব চিন্তার বয়ানে। বারোতম অধ্যায়ের পর থেকে শুরু করে উপন্যাসের পাতায় পাতায় জড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা যুদ্ধ ও সংগ্রামের বর্ণনা। কমান্ডার হিসেবে সৈজুদ্দি তার ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখেন মুক্তিযোদ্ধাদের। একের পর সফল অপারেশনের কারণে তার নাম এবং বীরত্ব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

চরিত্র নির্মাণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি চরিত্র শূন্যে জন্মায় না; সে একটি নির্দিষ্ট সমাজ, সময় ও পরিবেশের অংশ। তার চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ, এমনকি তার ভাষাও সেই প্রেক্ষাপট দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই চরিত্রকে নির্মাণ করতে হলে লেখককে সেই সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করতে হয়। চরিত্রের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্মীয় বিশ্বাস—এসবই তার পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে। এই সূক্ষ্ম উপাদানগুলো উপেক্ষা করলে চরিত্র কৃত্রিম হয়ে ওঠে।

সংলাপ চরিত্র নির্মাণের এক শক্তিশালী মাধ্যম। সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রের অন্তর্জগৎ, মনোভাব, এমনকি গোপন সংকটও প্রকাশ পায়। একটি সার্থক সংলাপ কখনো সরাসরি কিছু বলে না বরং ইঙ্গিতের মাধ্যমে গভীর অর্থ বহন করে। সংলাপের ভাষা চরিত্রভেদে পরিবর্তিত হওয়া উচিত। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত, শহুরে ও গ্রামীণ, বয়স্ক ও তরুণ—সবার ভাষা একরকম হতে পারে না। সংলাপের এই বৈচিত্র্যই চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলে।

কেননা চরিত্রের দ্বন্দ্ব উপন্যাসের গতি সৃষ্টির অন্যতম উপাদান। এই দ্বন্দ্ব হতে পারে বাহ্যিক—সমাজ, পরিবার বা অন্য কোনো চরিত্রের সঙ্গে; আবার হতে পারে অন্তর্দ্বন্দ্ব—নিজের ভেতরের আকাঙ্ক্ষা ও নৈতিকতার সংঘাত। এই দ্বন্দ্বই চরিত্রকে চালিত করে এবং তাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। একটি চরিত্র যত জটিল দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়, তার গভীরতা তত বৃদ্ধি পায়। পাঠকও তখন তার সঙ্গে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি চরিত্রের সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিখুঁত চরিত্র কখনোই আকর্ষণীয় হয় না। মানুষের মতো চরিত্রের মধ্যেও দুর্বলতা, ভুল এবং অন্ধকার দিক থাকা উচিত। ত্রুটিগুলোই তাকে মানবিক করে তোলে। একটি চরিত্র যখন নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে, তখন তার যাত্রা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। পাঠক তখন তার ব্যর্থতায় কষ্ট পায় এবং তার সাফল্যে আনন্দিত হয়।

ভাষাশৈলী চরিত্র নির্মাণে সূক্ষ্ম অথচ প্রভাবশালী উপাদান। লেখকের বর্ণনা, শব্দচয়ন এবং বাক্যগঠন চরিত্রের আবহ তৈরি করে। কখনো একটি ছোট্ট বর্ণনাই একটি চরিত্রকে স্পষ্ট করে তুলতে পারে। যেমন তার চোখের দৃষ্টি, হাঁটার ভঙ্গি বা বিশেষ অভ্যাস—এসবই চরিত্রের পরিচয় বহন করে। ভাষার এই নান্দনিক ব্যবহার চরিত্রকে আরও গভীর ও স্মরণীয় করে তোলে। এমনই বিষয়ভিত্তিক চিন্তার প্রতিফলন নুসরাত সুলতানা ঘটিয়েছেন উপন্যাসের পাতায় পাতায়।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্মৃতির রাজনীতি। অনেক লেখক দেখিয়েছেন যে যুদ্ধের স্মৃতি কেবল ব্যক্তিগত নয় বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও বহন করে। নুসরাত সুলতানার লেখাতেও বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি দেখান কীভাবে যুদ্ধের স্মৃতি কখনো গৌরবের উৎস, আবার কখনো বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের বীরত্বগাথার পাশাপাশি তিনি মানুষের ক্ষতি, হারানো স্বপ্ন এবং মানসিক ক্ষতের কথাও তুলে ধরেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসের ভাষা কোনোভাবেই আড়ম্বরপূর্ণ বা বাহুল্যপূর্ণতা দাবি করে না কখনোই বরং এটি একধরনের গভীর, সরল এবং পরিশীলিত প্রকৃতিকেই ধারণ করে সবকিছু নিয়ে। উপন্যাসে যুদ্ধের নির্মমতা এবং তার পরিণতির ছবি অঙ্কিত করতে লেখকরা সাহিত্যিক ভাষাকে একটি নিরীক্ষণধর্মী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিছু লেখক তাদের শব্দচয়নে এমন গভীরতা এনেছেন, যা শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরেনি বরং যুদ্ধের অন্তর্নিহিত মানসিক অবস্থা, প্রতিশোধের প্রবণতা এবং যুদ্ধের পরবর্তী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে বাস্তবিকভাবে প্রকাশ করেছে। একটি শক্তিশালী উপন্যাসের ভাষা সাধারণত সমালোচকের চোখে গভীর অর্থপূর্ণ এবং বিশ্লেষণী হয়ে ওঠে, যেখানে লেখক শুধু ঘটনাকে উপস্থাপন করেন না বরং তাদের প্রেক্ষাপট, সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধগুলোও নির্ধারণ করেন, নুসরাত সুলতানাও এর বিপক্ষে যাননি। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার এবং লেখকের শৈলী যেমন চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সামাজিক শ্রেণীভেদ এবং মর্মস্পর্শী সম্পর্কের মাধ্যমে ঐতিহাসিক সময়ের ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। ‘রাতের হাতে দিনের তসবিদানা’ এমনই ভাষাশৈলীর উপন্যাস।

উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ দিকের একটি হলো লেখকের চরিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া। যুদ্ধের বিভীষিকা, পরবর্তী দুঃস্বপ্ন এবং অসংখ্য মানবিক ও সাংস্কৃতিক সংকট লেখকের চরিত্রগুলোর মধ্যে উঠে আসে। এসব চরিত্র একদিকে ইতিহাসের ভারে চেপে থাকা, অন্যদিকে অস্তিত্বের সংকটে দোদুল্যমান। যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের সমাজের যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চেহারা বদলে গিয়েছিল, তা এ উপন্যাসে এক গহীণ গবেষণার মতো উপস্থাপিত হয়েছে। নুসরাত সুলতানা তার ব্যতিক্রম করেননি। চরিত্র রূপায়ণেও তিনি মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আমিনা, ফজল মোল্লা, রিজিয়া, রেবেকা, আসগর মোল্লা, মিনিসহ অনেক চরিত্রের সাথে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করেছেন উপন্যাসে।

সৈজুদ্দির জীবনে আবার আসে নতুন মানুষ মিনি। তাকে নিয়ে সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। উপন্যাসের আঠারোতম পর্বে নতুন মানুষের সাথে জীবন শুরু করেন সৈজুদ্দি। নুসরাত তার দক্ষ্য লেখনীতে সৈজুদ্দিকে এঁকেছেন ঋদ্ধ পুরুষের চরিত্রে। স্বাধীনতার পর সৈজুদ্দি বঙ্গবন্ধুর সমর্থন নিয়ে দেশ গড়ার নতুন সংগ্রামে মননিবেশ করেন।

কাহিনি এগোতে থাকে। বিশেষ তেমন একটা ঝামেলা না হলেও উপন্যাসের প্রয়োজনেই শুরু হয় সামাজিক, পারিপার্শ্বিক দ্বন্দ্ব। যেমন থাকে সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিষ্ঠানে আর সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে। সৈজুদ্দি মোল্লা জীবনের প্রয়োজনেই নিজের নীতি আদর্শ আর চিন্তার বিষয়ে সমুন্নত থাকেন সব সময়। কিন্তু অবক্ষয় হয় চারপাশের মানুষের জন্য, তাদের লোভ-লালসা, দম্ভ এসবের কারণেই। কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার এ উপন্যাস নিয়ে বলেছেন—‘কিন্তু সোনার মানুষগুলো মুক্তিযুদ্ধজয়ের পরে কেন নিজেদের ভূমিকা পালন করতে পারে না? উত্তর খুঁজতে গ্রিক মহাকাব্যের দেবতাদের নির্ধারিত নিয়তির মতো অমোঘ একটি বিষয় লেখক খুঁজে বের করেছেন এই উপন্যাসে। তা হচ্ছে আমাদের অসুস্থ আর্থসামাজিক কাঠামো। নুসরাত সেই অসুস্থতা তত্ত্ব দিয়ে নয়, দেখিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অসংখ্য মানুষের কার্যকারণ দিয়ে।’ এই যে দেখিয়ে দেওয়ার সাহস এবং যোগ্যতা—এই যোগ্যতা তাদেরই থাকে; যারা সত্য বলতে ভয় পায় না। কখনো পিছপা হয় না হাজারো বাধা-বিপত্তি থেকে।

একটি সত্যিকারের উপন্যাসের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বন্ধনে আবদ্ধ। পাঠক কেবল গল্প পড়েন না; তিনি চরিত্রগুলোর সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত হন, তাদের অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে অনুভব করেন। এই সংযোগ তখনই সম্ভব হয়, যখন উপন্যাসে আন্তরিকতা ও সত্যতার উপস্থিতি থাকে। একজন ঔপন্যাসিক যখন নিজের মতো করে গল্প নির্মাণ করেন, তখন সেই আন্তরিকতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পায়। এই স্বতঃস্ফূর্ততাই পাঠকের মনে গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে। অন্যদিকে কৃত্রিম বা অনুকরণমূলক রচনা এই সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়।

উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা দীর্ঘ ধৈর্যের ফলাফল। এটি কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া নয়, এটিই প্রধান সৃজনশীল অন্বেষণ। একজন লেখককে তার চরিত্রের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়, তার অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে হয়, তার দুঃখে কাঁদতে এবং আনন্দে হাসতে হয়। পাশাপাশি উপন্যাসের ভাষাশৈলী চরিত্র নির্মাণে সূক্ষ্ম অথচ প্রভাবশালী উপাদান। লেখকের বর্ণনা, শব্দচয়ন এবং বাক্যগঠন চরিত্রের আবহ তৈরি করে। কখনো একটি ছোট্ট বর্ণনাই একটি চরিত্রকে স্পষ্ট করে তুলতে পারে। যেমন তার চোখের দৃষ্টি, হাঁটার ভঙ্গি বা একটি বিশেষ অভ্যাস—এসবই চরিত্রের পরিচয় বহন করে। ভাষার এই নান্দনিক ব্যবহার চরিত্রকে আরও গভীর ও স্মরণীয় করে তোলে।

এই অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া চরিত্র কখনোই প্রাণ পায় না। যখন চরিত্র সত্যিই জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন উপন্যাস কেবল একটি গল্প থাকে না; তা হয়ে ওঠে জীবনের প্রতিচ্ছবি, মানবমনের গভীরতম সত্যের এক শিল্পিত প্রকাশ। এই চরিত্র বিনির্মাণে সার্থক নুসরাত সুলতানা। ‘রাতের হাতে দিনের তসবিদানা’ উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে তার শৈল্পিক ছোঁয়ায়। সৈজুদ্দি, আমিনা, রেবেকা, রিজিয়া, মিনি, ফজল মোল্লাসহ অন্যান্য চরিত্র এই মন্তব্যের বাস্তব প্রমাণ।

বাংলা সাহিত্যে একটা সময় ছিল যখন ইতিহাসের সংলাপ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে চিত্রিত হতো শুধু যুদ্ধের তথ্য-প্রমাণ কিংবা শত্রু-বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে। এ কথা সত্য যে, মহান মুক্তিযুদ্ধ একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের সংগ্রাম, যে সংগ্রামের পেছনে রয়েছে বহুবিধ মানসিক ও সামাজিক আঘাত। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে যে শূন্যতা ও শোচনীয়তা সৃষ্টি হয়েছিল, তা নুসরাত সুলতানার উপন্যাসে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে প্রতিফলিত হয়েছে। সেই আদিচিন্তা, আবহের দায় থেকে মুক্ত হয়ে নুসরাত সুলতানা এমন ঘোর অন্ধ সময়ের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছেন ‘রাতের হাতে দিনের তসবিদানা’য়। মুক্তিযুদ্ধের ট্র্যাজেডি, বিপন্নতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙন এ উপন্যাসে কতটা উঠে এসেছে তার বিচারক সচেতন পাঠক।

এ উপন্যাস সচেতন পাঠকের কাছে শুধু ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে না। বরং একটি মানসিক বিপর্যয়ের আবেগময় প্রদর্শন হয়ে দাঁড়াবে—এ প্রত্যাশা সব সময়ের।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

এসইউ

আরও পড়ুন