ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. বিনোদন

হিন্দিতে গাওয়ার জন্য মোটা অংকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন অঞ্জন দত্ত

বিনোদন ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

গান, অভিনয় আর জীবনের ভাঙাগড়ার গল্প-অঞ্জন দত্তকে কোনো একটি পরিচয়ের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা যায় না। কয়েকটি প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীদের কৈশোর ও যৌবনের যে কজন শিল্পী নিঃশব্দে কিন্তু গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছেন, অঞ্জন দত্ত তাদের অন্যতম। আজ (১৯ জানুয়ারি) দুই বাংলার এই জনপ্রিয় এই শিল্পীর জন্মদিন।

অঞ্জন দত্ত মানেই ‘বেলা বোস’। এই গানটি সবার কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। কলেজস্ট্রিটের বিকেল, চায়ের কাপ, সিগারেটের ধোঁয়া আর অপূর্ণ প্রেম-এই গান যেন শুধুই একটি প্রেমকাহিনি নয়, বরং একটা সময়ের দলিল। ঠিক যেমন ‘চ্যাপ্টা গোলাপ ফুল’ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্কুলজীবনের প্রথম প্রেমে-বুকপকেটে রাখা বানানভুল চিঠি আর খাতার ভেতরে যত্ন করে রাখা শুকনো গোলাপের স্মৃতিতে। অঞ্জনের গানে গল্প থাকে, থাকে জীবন, আর থাকে আমাদের নিজেদের ছায়া।

এরপর ‘আমি বৃষ্টি দেখেছি’-ভাঙাচোরা জীবনের এক আত্মস্বীকারোক্তি। ‘আমি অনেক ভেঙেচুরে, আবার শুরু করেছি’- এই লাইনগুলো যেন এক অঞ্জনের নয়, বহু মানুষের জীবনের কথাই বলে যায়। ‘ববি রায়ের সঙ্গে চলে যেও না’ গানে সম্পর্কের দ্বিধা আর হারানোর ভয় যেমন আছে, তেমনই ‘রঞ্জনা আমি আর আসবো না’ হয়ে উঠেছে এক প্রজন্মের আবেগের নাম। আবার ‘আমার শৈশবের দার্জিলিংটা’ কিংবা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় ফিরে আসে পাহাড়, শৈশব আর নস্টালজিয়া।

গানের এই জনপ্রিয়তাই একসময় অঞ্জন দত্তকে পৌঁছে দেয় বড় বড় সংগীত প্রযোজনা সংস্থার দরজায়। সিএমভির মতো নামী প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে চুক্তি করতে চায়। শুধু তাই নয়, প্রস্তাব আসে তার জনপ্রিয় বাংলা গানগুলো হিন্দিতে অনুবাদ করে গাওয়ার। সঙ্গে ছিল মোটা অংকের পারিশ্রমিকের হাতছানি। বাস্তব অর্থে এটি হতে পারত তার ক্যারিয়ারের আরেকটি মোড়- ভারতীজুড়ে পরিচিতি, আরও বেশি অর্থ, আরও বড় বাজার।

কিন্তু এখানেই থেমে যান অঞ্জন দত্ত। তিনি জানতেন, কোথায় থামতে হয়। এক সাক্ষাৎকারে অঞ্জন নিজেই বলেছিলেন, টাকার প্রলোভন তার কাছে বড় হয়ে ওঠেনি কখনোই। তার কাছে গান শুধু পণ্য নয়, এটি ভাষা, অনুভব আর সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। বাংলা ভাষায় যে আবেগ, যে সহজতা আর যে আত্মার টান তার গানে রয়েছে, তা হিন্দিতে রূপান্তরিত করলে অনেকটাই হারিয়ে যাবে-এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

হিন্দিতে গাওয়ার জন্য মোটা অংকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন অঞ্জন দত্ত

আসলে অঞ্জন দত্তের শিল্পবোধ বরাবরই আপসহীন। গান আর সিনেমা-দুটোই তাঁর কাছে আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তবে তিনি নিজে বহুবার বলেছেন, গানের পরিচয়ে পরিচিত হলেও তিনি আসলে অভিনেতা হতে চেয়েছিলেন। সেই অভিনেতা হওয়ার আকুতি তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল থিয়েটারের মঞ্চে। ঢাকায় মঞ্চস্থ ‘সেলসম্যানের সংসার’ নাটকে উইলি লোম্যান চরিত্রে তার অভিনয় আজও অনেক দর্শকের মনে গেঁথে আছে। জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক বৃদ্ধ সেলসম্যানের কান্না, হাসি আর অসহায়তা-সবকিছুতেই ছিল একজন নিবেদিত অভিনেতার ছাপ।

অঞ্জন দত্তের জীবনও তাঁর গানের মতোই বৈচিত্র্যময়। ১৯৫৩ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় জন্ম হলেও পড়াশোনা দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুলে। কঠোর শৃঙ্খলার মাঝেই গড়ে ওঠে তাঁর বিদ্রোহী মন। প্রেম, শাস্তি, স্কুলমাস্টারের বেত—সবকিছুর মধ্যেই তৈরি হচ্ছিল একজন শিল্পী। বাবার ব্যবসায় মন্দা, আর্থিক টানাপোড়েন, স্কুল বদল-জীবনের বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। একসময় বাবাকে হারিয়ে আরও পরিণত হয়েছেন অঞ্জন।

থিয়েটার থেকেই সিনেমায় তার যাত্রা। নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য গ্রামে গিয়ে তাঁতিদের সঙ্গে থাকা, শারীরিক কষ্ট সহ্য করা—এই আত্মনিবেদন প্রমাণ করে অভিনয় তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা পেলেও অঞ্জন পাননি তথাকথিত নায়কোচিত সাফল্য। হয়তো সেখান থেকেই তাঁর উপলব্ধি-খ্যাতি বা অর্থ নয়, শিল্পের সততাই আসল।

এই উপলব্ধিই তাঁকে হিন্দিতে গান গাওয়ার মোটা অংকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে সাহস জুগিয়েছিল। তিনি জানতেন, আপস করলে হয়তো আরও বড় তারকা হওয়া যেত, কিন্তু নিজের শিল্পীসত্তাকে হারানোর ঝুঁকি ছিল। তাই বাংলা গানেই থেকে গেলেন তিনি- ‘বেলা বোস’, ‘চ্যাপ্টা গোলাপ ফুল’, ‘আমি বৃষ্টি দেখেছি’, ‘ববি রায়ের সঙ্গে চলে যেও না’, ‘রঞ্জনা আমি আর আসবো না’-এই গানগুলোই হয়ে উঠল তার পরিচয়।

আরও পড়ুন:
কবে মুক্তি পাচ্ছে প্রভাসের ‘স্পিরিট’
ধানুশ-ম্রুণাল কি সত্যি বিয়ে করছেন?

আজ ৬৭ বছরে পা দেওয়া অঞ্জন দত্ত প্রমাণ করেছেন, শিল্পীর কাছে টাকার অংকের চেয়েও বড় হতে পারে আত্মসম্মান আর শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা। গায়ক, অভিনেতা কিংবা পরিচালক-যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তিনি আসলে একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী।

এমএমএফ/এমএস

আরও পড়ুন