নৃত্য-সংস্কৃতির ফিরিস্তি তুলে দিলেন লুবনা মারিয়াম
লুবনা মারিয়াম। ছবি: সংগৃহীত
এক বছর বিরতির পর এ বছর নৃত্যকলায় দেওয়া হলো একুশে পদক। পদকপ্রাপ্ত শিল্পীর নাম ঘোষণার পর থেকেই নৃত্যাঙ্গনে অস্বস্থি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তা রূপ নেয় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায়। ফেসবুক সয়লাব হয়ে যায় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পীর যোগ্যতার প্রশ্নে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দেশ ও জাতির জন্য কী করেছেন এই শিল্পী? এ বিতর্কের মধ্যেও আজ (২৬ ফেব্রুয়ারি) বৃহস্পতিবার অন্য গুণীজনদের সঙ্গে একুশে পদক তুলে দেওয়া হয় তরুণ নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদের হাতে।
এদিকে নবীন নৃত্যশিল্পীদের একটি দল ফেসবুকে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করেছিল। তাদের দাবী, বাংলাদেশের নৃত্য সম্প্রদায় তাদের জায়গা দিতে চায় না। বরং প্রবীণরা তাদের দূরে রেখেছে। ওই পোস্টগুলোর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নৃত্য-সংস্কৃতির ফিরিস্তি ফেসবুকে তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী ও সংস্কৃতিসাধক লুবনা মারিয়াম। নৃত্যে কী কাজ হয়েছে বাংলাদেশে? সে প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘কথা তোলার আগে মনে রাখা দরকার যে কাজগুলো পথ দেখিয়েছে। গত এক মাস ধরে, আমার সোশ্যাল মিডিয়া ফিড বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীদের সম্পর্কে তীব্র মন্তব্যে ভরে উঠেছে — ‘গেটকিপিং’, ‘আভিজাত্য’ এবং ‘প্রবেশাধিকার’ প্রসঙ্গে। জীবন-অভিজ্ঞতা থেকে এ নিয়ে কিছু বলতে চাই।’
লুবনা মারিয়াম লিখেছেন, ‘অভিযোগ তোলার আগে আমাদের মনে রাখা উচিত — যে পথ দিয়ে আমরা হাঁটছি, সেটি কেউ না কেউ তৈরি করে দিয়েছিল। গত এক মাস ধরে সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীদের বিরুদ্ধে নানা তীর্যক মন্তব্য চোখে পড়ছে — ‘গেটকিপিং’, ‘আভিজাত্য’, ‘প্রবেশাধিকার সীমিত করে রাখা’সহ নানা অভিযোগ। কিন্তু এই অঙ্গনে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া একজন মানুষ হিসেবে বলতে হয়, বাস্তবতা এত সরল নয়।’
নিজের শুরু করা কাজগুলো প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘দশকের পর দশক নাচকে প্রোসেনিয়াম মঞ্চের বাইরে — সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে, গ্রামের উঠানে, স্কুলঘরসহ এমন সব জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে শিল্পকে কখনও সম্ভাবনা হিসেবে ভাবাও হয়নি। “সাধনা” ও “কল্পতরু”র মতো উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা হয়েছে, আচারভিত্তিক পরিবেশনশিল্পকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, প্রান্তিক কণ্ঠকে জেগে উঠতে, গাইতে ও দৃশ্যমান হওয়ার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। নড়াইলসহ বিভিন্ন জেলায় “লাঠিখেলা” পুনরুজ্জীবনে কাজ করা হয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিনের পুরুষশাসিত এই খেলায় মেয়েদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তা কেবল দেখানোর জন্য নয়, শক্তি, মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে।’
তিনি লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল তরুণ নৃত্যশিল্পীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তারা ভারতে প্রশিক্ষণসহ আরও সমৃদ্ধ জ্ঞান নিয়ে দেশে ফিরতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য এবং যারা কখনও মহড়াকক্ষে যাওয়ার সুযোগ পায়নি, তাদের জন্যও আউটরিচ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছিল। লোকজ ঐতিহ্যকে নথিভুক্ত করা হয়েছে, আচারভিত্তিক পরিবেশনা শক্তিশালী করা হয়েছে, এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক ঐতিহ্য-তালিকা তৈরি করা হয়েছে — যাতে সাংস্কৃতিক জ্ঞান সেই মানুষদের কাছেই থাকে, যারা তা ধারণ করে।’
আক্ষেপ করে তিনি লিখেছেন, ‘এই তৃণমূল কাজের পাশাপাশি উদ্ভাবনী নৃত্যনাট্য প্রযোজনা ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে — রবীন্দ্রনাথের পুনর্নির্মাণ, নারীবাদী পরিবেশনা, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া, এবং সমকালীন জরুরি সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংলাপ। কারণ শিল্পকে বাঁচতে হলে তাকে বিবর্তিত হতে হয়। তাই যখন শুনি — নাচকে “জনগণের কাছ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে”, তখন প্রশ্ন জাগে, যে গ্রামে কোনো স্টুডিও নেই, সেখানে কে কাজ করছে? যে শিশু টিউশন ফি দিতে পারে না, তাকে কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে? ইতিহাস যাদের ভুলে গেছে, সেই সম্প্রদায়ের কাছে কে নাচ পৌঁছে দিয়েছে?’
এই জ্যেষ্ঠ শিল্পী লিখেছেন, ‘প্রবেশাধিকার স্লোগানে তৈরি হয় না। তা গড়ে ওঠে দশকের ধৈর্যশীল পরিশ্রমে। একইসঙ্গে একটি সত্য স্বীকার করতে হবে — বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার শ্রেণি, ভৌগোলিক অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা দ্বারা প্রভাবিত। এটি কোনো একক শিল্পীর দোষ নয়, এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা, যা আমাদের সম্মিলিতভাবে বদলাতে হবে। আরও পরিষ্কার করে বলা দরকার — ক্লাসিক্যাল প্রশিক্ষণ শিল্পকে এলিট বানায় না, তা শৃঙ্খলাকে গভীর করে। কমিউনিটি চর্চা শিল্পকে দুর্বল করে না, তা তাকে টিকিয়ে রাখে। ঐতিহ্যের কঠোর অনুশাসন যেমন দরকার, তেমনি দরকার উন্মুক্ত অংশগ্রহণ। যারা ভিত্তি নির্মাণ করেছেন — তাদের সম্মান জানাতে হবে। আবার যারা প্রবেশাধিকার বিস্তৃত করছেন তাদেরও স্বাগত জানাতে হবে। তরুণ প্রজন্ম, যারা নতুন ভাষা ও সরঞ্জাম নিয়ে আসছে, তাদেরও জায়গা দিতে হবে। এসব বিরোধীতা নয়, এগুলোই সংস্কৃতির বাস্তুতন্ত্র।’
লুবনা মারিয়াম জানিয়েছেন, ‘কোনো প্রজন্মই নাচের মালিক নয়। প্রতিটি প্রজন্ম তা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, নতুনভাবে গড়ে তোলে, এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়। দরজা খোলা মানে ঐতিহ্য দুর্বল হওয়া নয়, বরং শক্তিশালী হওয়া। পুরোনো মঞ্চকে সম্মান জানিয়ে, নতুন অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানালে শিল্প আরও সত্য হয়। যখন আরও মানুষ চর্চায় যুক্ত হয়, তখন শিল্প জাতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। যখন আরও গল্প নাচে প্রকাশ পায়, তখন একটি দেশ নিজেকে চিনতে শেখে।’
ছয় দশক বাংলাদেশের নৃত্যাঙ্গনে কাজ করছেন লুবনা মারিয়াম। শিল্পী হিসেবে কাজের পাশাপাশি শিল্পী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। বহু শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিয়ে নাচ শিখতে পাঠিয়েছেন দেশের বাইরে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নৃত্যনাট্যের নির্দেশক তিনি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার তাকে দিয়েছেন শিল্পকলা পদক।
আরএমডি