ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

বিজয় দিবস

লাগেজভর্তি অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়েছিলেন তিনি

আনিসুল ইসলাম নাঈম | প্রকাশিত: ১২:১১ পিএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

সেনাপ্রশিক্ষণ শেষ। কমিশন লাভ করে র‍্যাঙ্ক পেলেন। পোস্টিং হলো পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে। কিন্তু বাংলাদেশে তখন কী চলছিল সেখবরও কানে এসেছিল এম এ ওয়াদুদের। একদিন সিদ্ধান্ত নেন, ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে দেশে ফিরবেন। তিনটি চায়নিজ স্টেনগান, তিনটি পিস্তল এবং ১৮টি ম্যাগাজিন লাগেজে নিয়ে তিন বন্ধু মিলে করাচি থেকে পালিয়ে এলেন তেজগাঁও বিমানবন্দরে। বিজয় দিবস উপলক্ষে জাগো নিউজকে সেই গল্প শোনালেন লেফটেন্যান্ট (অব.) এম এ ওয়াদুদ।

চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়ামের পাশে কয়েকটি বিল্ডিং পার হলেই তার বাসা। লিফটে করে উঠতেই দরজায় তার নামফলক চোখে পড়ে। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় অপেক্ষা করছিলেন তিনি। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফট্যানেন্ট (অব.) এম এ ওয়াদুদের বয়স এখন ৮২ বছর। শরীর কেমন? জানতে চাইলে একবুক হতাশা ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ভালো যাচ্ছে না।’ বছর ছয় আগে হারিয়েছেন স্ত্রীকে। সেই থেকে খুব একা হয়ে গেছেন।

warমুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে পাওয়া সম্মাননা স্মারক

এম এ ওয়াদুদের জন্ম ও বেড়ে উঠা চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের সুজাতপুর গ্রামে। পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পড়াশোনা করেছেন নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে। এই কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে বাবু সরওয়ার-ওয়াদুদ প্যানেলে ১৯৬৬ সালে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হন। বললেন, ‘তখন মেধার ভিত্তিতে নেতা নির্বাচিত হতো। এখন হয়েছে উল্টো। ছয়দফা নিয়ে উত্তাল দেশ। আমরাও নেমে পড়লাম। জিএস হওয়ায় মিছিলের সামনের সারিতে থাকতাম। একদিন পুলিশের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষ। দুজন পুলিশ মারা গেল, হতাহত হলো অনেকে। সেই ঘটনায় হওয়া মামলায় ফেঁসে গেলাম। আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে করাচি বোর্ড থেকে সেকেন্ড ডিভিশন নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করলাম।’

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেন এম এ ওয়াদুদ। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর ট্রেনিং হয় পাকিস্তানের কাকুল এলাকায়। একদিন ট্রেনিং স্টেশন কমান্ডার আমাকে তার অফিসে ডাকলেন। আমাকে তিন দিন ছুটি নিয়ে রাওয়ালপিন্ডি যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমার এক মামা ছিলেন পাকিস্তানের স্পিকার। তিনিই আমাকে আমন্ত্রণ করেন। তখন আমি নব্য ক্যাডেট। ইউনিফর্ম পড়ে সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে চলে যাই সেখানে। ইউনিফর্ম বদলে স্পিকার মামার সঙ্গে নাশতা করলাম। এরপর গেলাম পার্লামেন্টে। সেখানে স্পিকারের জন্য ভিআইপি লাউঞ্জ রয়েছে। লাউঞ্জের পাশেই বসলাম। চা বিরতির সময় মামা আইয়ুব খানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি আর্মিতে জেনে আইয়ুব খান হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপও হলো সেদিন। ফেরার সময় বললেন তাকেও যেন ‘মামা’ বলে ডাকি।’

war২০০৯ সালে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ভারত সরকারের দেওয়া সংবর্ধনায় প্রধান অতিথি জেনারেল জে আর এফ জ্যাকবের হাত থেকে সম্মাননা ও স্মারক গ্রহণের ছবি দেখাচ্ছেন এম এ ওয়াদুদ

অস্ত্রভরা লাগেজ নিয়ে পাকিস্তান থেকে পলায়ন
১৯৬৯ সালে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ শেষ হয়। সেখানে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে প্রশিক্ষণের পর কমিশন লাভ করে র‍্যাঙ্ক পেলাম। এরপর পোস্টিং হলো করাচির হায়দ্রাবাদ ক্যান্টনমেন্টের মালী নামের একটা জায়গায়। গহীন পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা জায়গাটা। সেখানে আমি, লেফটেন্যান্ট দিদারুল আলম এবং লেফটেন্যান্ট মাহাবুব একসঙ্গে ছিলাম। আমরা তিনজন খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। সেখানে কয়েক মাস এয়ার ট্রুপ ট্রেনিং চলে। ম্যাপ দেখে ট্রেনিং করতে হতো। সেই প্রশিক্ষণটা মুক্তিযুদ্ধের সময় কাজে দিয়েছে। প্রশিক্ষণে থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক দিন দিন অবনতির গুঞ্জন শুনতাম।

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে পূর্ব পাকিস্তান জয়ী হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান মুক্ত হন। কদিন বাদেই ১৯৭০ সালের নির্বাচন। ক্যান্টনমেন্টে একদিন আফজাল পাঠান নামের এক মুচির সঙ্গে কথা হলো। তখন সে আমার ব্যক্তিগত কিছু তথ্য জানতে চাইলো। ব্যাপারটায় আমার সন্দেহ হলো। সন্দেহ গাঢ় হলে দিদারুল ও মাহবুবকে বিষয়টি জানাই। একদিন ডিনারের পর নিরিবিলি জায়গায় তাদের নিয়ে বসে আলাপ করি। ঠিক সেসময় আরেক জায়গা থেকে একটা মেসেজ পাই, ‘টেক ইউর সেফটি ফাস্ট।’ সিদ্ধান্ত নিই, ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে দেশে চলে আসব তিনজন।

তিনটি চায়নিজ স্টেনগান, তিনটি পিস্তল এবং ১৮টি ম্যাগাজিন একটি ব্যাগে নিলাম। কিন্তু অস্ত্রভর্তি লাগেজ নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে বিমানে উঠব কীভাবে? আমার এক খালু তখন করাচী এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন অফিসার। তার সহযোগিতায় ইমিগ্রেশন পার হয়ে লাগেজ বিমানে তুলেছিলাম। এরপর আমরা ঢাকার তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামি। আগেই বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটা পিক-আপ গাড়ির ব্যবস্থা করে রাখি। গাড়িতে অস্ত্রভর্তি লাগেজ নিয়ে সোজা নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাটে চলে যাই। ঘাট থেকে লঞ্চে করে আমাদের এলাকায়। তখন আমরা তিনজন ইউনিফর্ম পরা ছিলাম। আমাদের দেখে গ্রামে একটা হইচই পড়ে গেল। তবে আমরা কাউকে বিষয়টা আঁচ করতে দিইনি।

যুদ্ধের প্রশিক্ষণ হলো শুরু
প্রথম দিকে দেশের পরিস্থিতি আসলে কী, সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো খবর পাচ্ছিলাম না। এরপর এদিক-সেদিক যাই, ঘোরাঘুরি করে খবর নিতে চেষ্টা করি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। নূরুল হুদার সঙ্গে পরিচয় হরো, তৎকালীন বৃহত্তর কুমিল্লার ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের জিএস। নুরুল হুদার নেতৃত্বে প্রথম মিটিং হয় মতলবের নিশ্চিন্তপুর এলাকায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর মতলব সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন ফ্লাইট লে. (অব.) এ বি সিদ্দিক। তখন গোলাপ মোরশেদ ফারুকী মতলব থেকে নির্বাচিত তৎকালীন পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য। তিনিসহ আমরা তিনজন এবং নুরুল হুদা, পাঁচজন মিটিং করি। সেই মিটিংয়েই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়, দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়, আমাদের যুদ্ধে নামতে হবে। এ ছাড়া ৭০ সালের নির্বাচনের পার্লামেন্ট বসার কথা ছিল জানুয়ারি মাসে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান বিষয়টা নিয়ে টালবাহানা করছে। তাই যে কোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত আসবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের থেকে।

মিটিং শেষে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় যুবক ও বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, দুই মাস টানা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে প্রায় ২ হাজার মানুষ অংশ নেয়। তখন দেশের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি। পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পার্লামেন্ট স্থগিত হওয়ার পর দ্বন্দ্ব পূর্ণমাত্রা পায়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনলাম। ভাষণ শুনেই বুঝলাম যুদ্ধের ঘোষণা চলে এসেছে। সেসময় পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় ২৬ হাজার বাঙালি আর্মি সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্যে অনেককে বন্দী এবং নিরস্ত্র করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা বাঙালি আর্মিদের বন্দী করা হয়।

warভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত রাজিত মিত্তার এবং বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহর হাতে ফুল তুলে দিচ্ছেন এম এ ওয়াদুদ ও তার সহধর্মিণী

যুদ্ধ শুরুর দিনগুলো
প্রথম বিদ্রোহ করেন কে এম শফিউল্লাহ, কুমিল্লায় খালেদ মোশাররফ, চট্টগ্রামে মেজর রফিকুল ইসলাম এবং অন্যরা বিক্ষিপ্তভাবে বিদ্রোহ শুরু করেন। আমরা তিন বন্ধু তখন কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুর মহকুমা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী (সাবেক প্রধানমন্ত্রী)। আমাদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণের বিষয়টি তিনি জেনেছিলেন। তখন চাঁদপুর মহকুমা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন ফ্লাইট লে. (অব.) এ বি সিদ্দিক। তিনি আমাকে চিঠির মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা গণহত্যা চালায়। পরদিন আমরা তিনজন কাঁধে অস্ত্র ও ব্যাগে ম্যাগাজিন নিয়ে চাঁদপুর চলে যাই। সেখানে দেখা হয় ফ্লাইট লে. (অব.) এ বি সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি আমাদের আগে থেকেই চিনতেন। তার সঙ্গে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে থাকাকালে দেখা হয়েছিল। তিনি সবার সঙ্গে আমাদের তিনজনকে পরিচয় করিয়ে দেন।

মহিলা কলেজে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প
চাঁদপুরের স্বাধীনতাকামী জনতা তখন বিছিন্নভাবে অবস্থান করছিলেন। সিদ্ধান্ত হয় সবাইকে একত্র করে চাঁদপুরে ক্যাম্প করার। খাওয়া-দাওয়ার কাজ সংগ্রাম কমিটি করবে। ২৭ মার্চ প্রথম চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প করা হয়। সেখানে অ্যাডজুট্যান্ট কমান্ডার হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্র রক্ষা করার দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হয়। ক্যাম্পের সবাইকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মধ্যে রাখতে হয়। ক্যাম্পে অপরিচিত কারও ঢুকতে হলে কার্ড বা পরিচয় নিশ্চিত করে ঢুকতে হতো। পুলিশ, ইপিআর, নেভি, এয়ারফোর্স এবং আর্মি মিলে প্রায় ৩শ জনের মতো সদস্য ক্যাম্পে আসেন, বলা যায় একটা পরিপূর্ণ বিগ্রেড। এ ছাড়া স্থানীয় উৎসুক জনতাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রাতে আমরা পেট্রোলিং শুরু করি। তখন সারাদিন ব্যায়াম এবং অস্ত্রের প্রশিক্ষণের ওপর থাকতাম। সাধারণ মানুষদের মাইকিং করে সতর্ক করে দিই। যে কোনো সময় পাকিস্তানী বাহিনীর হামলা হতে পারে।

warবীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট (অব.) এম এ ওয়াদুদ ও লেখক

চাঁদপুরে যুদ্ধ হলো শুরু
১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল সকাল ১০টায় চাঁদপুরের পুরান বাজার বাণিজ্যিক এলাকায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রথম হামলা চালায়। অনেক গুদামঘর ধ্বংস হয়ে যায়। একজন বৃদ্ধা মারা যান। পরে আমরা ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক চিফ অব কমান্ডারের সঙ্গে ক্যাম্পে বসলাম। পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করলাম। দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হলো। চাঁদপুরের বড় স্টেশন এলাকা, টেকনিক্যাল এলাকা, ইচলী ঘাট, প্রত্যেক এলাকায় একজনকে প্রধান করে দায়িত্ব দেওয়া হলো। আর আমি মেইন পয়েন্টে অবস্থান নিই। আমাদের কাছে তখন তেমন অস্ত্র ছিল না। সেদিন বিকেলেই কুমিল্লা থেকে হানাদার বাহিনীর বিরাট একটি দল টেকনিক্যাল স্কুলে অবস্থান নেয়। সেই রাতে চাঁদপুর শহরে হামলা চালায় পাকবাহিনী।

তারা আমাদের ক্যাম্পের সঠিক অবস্থান জানতো না। সেখান থেকে কামানের গোলা নিক্ষেপ করলেও সেসব গিয়ে মেঘনা নদীতে পড়তো। আমার নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান দল ছিল। রাত হওয়ার আগপর্যন্ত আমরা এলাকায় যুদ্ধ করি। রাতে মাইকিং করে মানুষকে সূর্য ওঠার আগে শহর ছাড়ার আহ্বান জানাই। পরদিন সকাল ৮টায় তারা চাঁদপুর শহরের দিকে মার্চ করে। তখন পুরো শহর জনমানবহীন। এরমধ্যে এক ভলান্টিয়ার তাদের দেখে স্যালুট দেয়। পাকিস্তান বাহিনী তাকে শত্রু মনে করে সেখানেই ফায়ার করে হত্যা করে। তারা শহরে ঢুকে পড়লে আমরা তাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করি। মাঝখানে একটি খালের পর ক্যাম্প, তাদের থেকে দূরত্ব ১০০ ফিট। আমার বাহিনীর গুলিতে একজন পাঞ্জাবি নিহত হয়। তার অস্ত্রটি ইপিআরের একজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আসে। আমি পেছন থেকে সেসময় তাকে কাভার দেই। এক পর্যায়ে আমাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরদিন, ১০ এপ্রিল, সকাল ৮টার দিকে আমরা ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া হাইস্কুলে নতুন ক্যাম্পে চলে যাই। সেখানে সেক্টরের আওতায় এলাকা ভাগ করে দেওয়া হয়।

আমার বাহিনী নিয়ে প্রথমে মতলব যাই। এরপর আগরতলার মেলাঘরে চলে যাই। সেখানে মুজিবনগর সরকারের তালিকায় নাম লেখাই। অস্ত্র রিপোর্ট করে চলে আসি। আমার দায়িত্ব পড়ে মতলব, গজারিয়া থানা, পশ্চিম দিকে মেঘনা নদী, পূর্বদিকে চান্দিনা এই জোনে। একে ২নং সেক্টরের অধীনে একটি অঞ্চল হিসেবে ধরা হতো। এই পুরো মেঘনা অঞ্চলে কমান্ডার ছিলাম আমি। পুরো নয় মাস যুদ্ধে এই অঞ্চলে কোনো পাঞ্জাবি পা দিতে পারেনি।

গোয়ালমারি যুদ্ধে আহত এবং বিজয় অর্জন
২নং সেক্টরের বড় যুদ্ধগুলোর মধ্যে গোয়ালমারি যুদ্ধটি অন্যতম। দাউদকান্দি, মতলব ও গজারিয়া উপজেলা অঞ্চলে পাকবাহিনীর তৎপরতা সীমিত করতে এবং এ অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করতে এ যুদ্ধের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ২০ নভেম্বর ঈদুল ফিতর। ভোরে উঠে নামাজ, সেমাই রান্না করতে হবে। তাই আগের দিন একটু তাড়াতাড়িই মুক্তিযোদ্ধারা ঘুমিয়ে পড়েন। গার্ড মুক্তিযোদ্ধারাও ঈদের রাত ভেবে ঘুমিয়ে পড়েন। তাদের ধারণা ছিল, হানাদার হলেও পাকিস্তানিরাও তো মুসলমান। তাই এ পবিত্র রাতে আর আক্রমণের ভয় নেই। কিন্তু স্থানীয় রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের এ গোপন ঘাঁটির খবর দাউদকান্দি থানা, ডাকবাংলো ও আশপাশের কয়েকটি ক্যাম্পে থাকা পাকসেনাদের কাছে পৌঁছে দেয়।

তারা ঈদের দিন ভোররাতেই মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা যখন ফজর ও ঈদের নামাজের জন্য ব্যস্ত, তখন ভোর ৪টার দিকে ঘাঁটি আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে। গোয়ালমারি বাজারের বটগাছের নিচে ইয়াসমিন নামে এক পাগলি (ইনসান পাগলি) থাকত। পাক সেনাদের দূর থেকে আসতে দেখে সে দৌড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটির কাছে চলে আসে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘আইয়ে রে আইয়ে রে, আইয়ে রে আইয়ে রে।’ তার চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে মুক্তিযোদ্ধারা ঘুম থেকে জেগে ওঠেন এবং কেউ অস্ত্র হাতে নেন, কেউবা পাগলিকে গালাগাল করতে থাকেন। হঠাৎ বাজারের দিক থেকে গুলি আসতে থাকে। এবার মুক্তিযোদ্ধারা নিশ্চিত হন যে, তারা সত্যই আক্রান্ত। তারাও অস্ত্র নিয়ে ঘাঁটি থেকে কিছুটা পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে পাল্টা গুলি ছুঁড়তে শুরু করেন। কৌশলগত কারণে তারা আরও পেছনে জামালপুর গ্রামের দিকে যেতে থাকেন। পাকসেনারাও গুলি ছুঁড়তে-ছুঁড়তে এগিয়ে যান। এর ফলে পাকবাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়।

দিনটির বর্ণনা দিতে গিয়ে এম এ ওয়াদুদ বলেন, ‘মতলব সুজাতপুর ডিগ্রি কলেজ আমাদের ক্যাম্প ছিল। সেখানে অস্ত্রাগার ছিল। নিয়মিত প্যারেড হতো। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু কড়ই গাছে ওয়্যারলেস বেঁধে দেওয়া হয়। হেডকোয়ার্টারে প্রায় ১ হাজার ২শ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এরমধ্যে কমান্ডো, ডাইরেক্ট অপারেটর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর, ঈদের দিন। আমি দখল করা পাকিস্তানি গানবোট দিয়ে মেঘনা নদী টহল দিয়ে আসি। নতুন বিয়ে করেছেন এ রকম কয়েকজনকে ইফতারের পর ছুটি দেওয়া হয়। আর দক্ষ ১৫ জন যোদ্ধা নির্বাচন করে দুটি এলএমজি, দুই পাশে বালুর বস্তা দিয়ে মাঝখানে মর্টার বসানো হয়। অপারেশনের সময় এটি আমি পরিচালনা করতাম। সেদিন রাতে সব জায়গায় পেট্রোলিং করা হয়। সবাইকে বলা হলো, ঈদের আনন্দে কেউ যাতে বাংকার ফেলে না যায়। আমরা সবাই নদীপথে সতর্ক অবস্থায় ছিলাম। তবে পাকিস্তানীরা উত্তর-পূর্ব দিক শ্রীরায়েরচরের সামনে গোয়ালমারি দিয়ে আসতে শুরু করে।

warএম এ ওয়াদুদের ১৯৭৩ সালের ছবি

ওই অঞ্চলে শামীম ওসমানের দাদার বাড়ি, করিম ভূঁইয়া (সাবেক সেনাপ্রধান), মেজর জেনারেল সুবেদার ভূঁইয়া এবং ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের (সাবেক মন্ত্রী) বাড়ি। তারা এদিক দিয়ে ঢুকে সব বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলার পরিকল্পনা করেন। আমার ঘাঁটিতে প্রায় সব ধরনের অস্ত্র ছিল। সেদিন সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই ওয়্যারলেস বেজে ওঠে ‘হ্যালো, হ্যালো... শহীদনগর থেকে বলছি। পাকবাহিনীর প্রায় ১০টি গাড়ি পশ্চিম দিকে যাচ্ছে।’ শোনার পর আমি যুদ্ধের সাইরেন বাজিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিই। তখন সবাই সশস্ত্র হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। আমি বাহিনী নিয়ে ভোরেই ঘাঁটি থেকে রওনা হলাম। সূর্য ওঠার আগেই আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যাই। এরপর সবাইকে পজিশন নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিই। গোয়ালমারি বাজারের খুব কাছাকাছি চলে যাই। সেখান থেকে দেখলাম শামীম ওসমানের দাদার বাড়িতে আগুন দেওয়া হচ্ছে। তখন ওপরে একটা রকেট লাঞ্চার ছুঁড়লাম। এরপর শুরু হলো হামলা। আমাদের বাহিনীর তীব্র আক্রমণে তারা বেকায়দায় পড়ে গেল। মেজর আলামিন যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে বলেন ‘ট্রুপস ক্লোজ...’। তারা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে চাইরেও বাঙালি গেরিলা ও সশস্ত্র যোদ্ধাদের কাছে টিকতে পারেনি। সাধারণ বাঙালি যুদ্ধ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন সেদিন।’

আমি বড় বড় আম গাছের মাঝে ছিলাম। যুদ্ধ করতে করতে সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে সবাই দুর্বল হয়ে পড়ি। ফাঁকে ফাঁকে খাবার খাই। ঈদের দিন মানুষ জন রুটি আর সেমাই দিয়ে রোল বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ান। দুপুর নাগাদ হানাদারদের গোয়ালমারি বাজারের দলটি উত্তরে দাউদকান্দি থানার দিকে পিছু হটতে থাকে। তখন আমার নেতৃত্বাধীন ইউনিট তাদের ওপর তুমুল আক্রমণ চালায়। এতে বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হন এবং বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এ সুযোগে আমার দল গোয়ালমারি বাজার দখল করে নেয়। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে হানাদাররা বাজারের দিকে গুলি ছুঁড়তে থাকলে মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমীন শহীদ হন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সর্বশক্তি দিয়ে হানাদারদের আক্রমণ করেন। কমান্ডার শফিকের নেতৃত্বাধীন দাউদকান্দির পূর্বাঞ্চলের ইউনিট, গোয়ালমারি চৌধুরী বাড়ি ঘাঁটির দল এবং আমার দল, এ তিন ইউনিট একযোগে হানাদারদের ওপর আক্রমণ করে। পাকসেনারাও পাল্টা জবাব দেয়। এদিকে গোমতী-মেঘনা নদীর পশ্চিম পাড়ে গজারিয়ায় অবস্থানরত একটি দল নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম অগ্রসর হন। আমি বিকাল সাড়ে চারটার দিকে আহত হই। তখন মেজর আলামিনের নেতৃত্বে পাকবাহিনী আমার কাছে আত্মসমর্পণ করে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাংকার থেকে গুলি এসে লাগলো। আমার পিঠের ওপরের দিকে ঘাড়ের পেছনের অংশে, একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় গুলি। চোয়ালের একপাশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আহত হওয়ার আধঘণ্টা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাই। এরপর আমার সেকেন্ড ইন চিফকে যুদ্ধের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি নির্দেশনা দেওয়া হয়, ‘হয় শেষ শত্রু, না হয় শেষ বুলেট’, এর আগে যুদ্ধ বন্ধ হবে না।

আহত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক ফাস্ট এইডের কিছু পাওয়া যায়নি। আমাকে পাশের একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী তার নতুন শাড়ি ছিঁড়ে আমার আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে পেঁচিয়ে দেন। বিষয়টা আমার কাছে আশ্চর্যের মনে হলো। আমাদের ঘাঁটিতে ভালো ভালো ডাক্তার ছিল। তারা আমাকে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ করে দিল। আমি পেইনকিলার ইনজেকশন নিজেই হাতে পুশ করলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে দিশেহারা পাকবাহিনী সন্ধ্যার পর দাউদকান্দি থানার দিকে পালিয়ে গিয়ে কালারকান্দি আনাল খালের কাঠের পুল এলাকায় অবস্থান নেয়। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম তিনদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে এখানে প্রায় ৪০ জনের মতো পাকসেনা নিহত হয়। জীবিতদের মধ্যে দুজন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে এবং বাকিরা দাউদকান্দি থানার দিকে পালিয়ে যায়। ধরা পড়া দুজনকে পরে মেরে ফেলা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহীদদের লাশ ও ১৩ জন আহত যোদ্ধাকে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে আমার নেতৃত্বাধীন দলটি সুজাতপুর ঘাঁটিতে ফিরে আসে। এই যুদ্ধে ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ৮ জন গ্রামবাসী শহীদ হন।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
বিজয়ের ৫৪ বছরে বাংলাদেশ

কেএসকে/জেআইএম/আরএমডি

আরও পড়ুন