ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কৃষক সংগ্রাম ‘তেভাগা আন্দোলন’

ড. মো. ফোরকান আলী | প্রকাশিত: ০৪:৩৬ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬

‘জান দেব তো, ধান দেবো না,’ ‘আধি নাই তে-ভাগা চাই,’ ‘লাঙ্গল যার জমি তার,’ ‘তেভাগা’র চেতনা ভুলিনাই ভুলবনা’ এমন স্লোগানে প্রকম্পিত করে ৪ জানুয়ারি রোববার দিনাজপুরে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক তেভাগা দিবস। দিবসটি স্মরণে তেভাগা আন্দোলনে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর গুলিতে প্রথম শহীদ শিবরাম মাঝি ও সমিরুদ্দিনের শহীদ হওয়ার স্থান চিরিরবন্দর উপজেলার তালপুকুর-বাজিতপুরে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে থাকে তেভাগা চেতনা পরিষদ।

পৃথিবীতে যতগুলো বড় কৃষক আন্দোলন হয়েছে অবিভক্ত বাংলায় (ব্রিটিশ আমলে) তেভাগা আন্দোলন তার অন্যতম। তখন বাংলার মাটিতে হিন্দু-মুসলমান ও উপজাতি নারী-পুরুষ কৃষকদের রক্তে রঞ্জিত এশিয়ার বিখ্যাত এক কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তাই অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে তেভাগা আন্দোলন আজও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। বাংলায় যে তিনটি বড় ধরনের কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম অধ্যায় হলো তেভাগা আন্দোলন এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। এই আন্দোলন ফলশ্রুতিতে পরর্বতীতে জমির মালিক ও আধিয়ার কৃষকদের মধ্যে বর্গা চুক্তির সংস্কার সাধিত হয়। অবিভক্ত বাংলার সমাজ কাঠামোতে এক ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়।

farmer১৯৪৬ সালে সংগঠিত এ আন্দোলনে এই বাংলার অবহেলিত কৃষকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিল। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অবিভক্ত বাংলার তেভাগা আন্দোলনের যেসব শহীদের তালিকা পাওয়া যায় তা থেকে ১৩২ জনের নাম জানা যায়। সে সময় ৩ হাজার ১১৯ জন কৃষক গ্রেফতার হয়েছিল। ১৯টি জেলায় বিস্তৃতি লাভ করে এই তেভাগা আন্দোলন। জেলাগুলো হলো দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোহর, ফরিদপুর, বগুড়া, চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলী, নদীয়া, বাকুড়া, বীরভূম, মালদহ এবং জলপাইগুড়ি। তেভাগা সংগ্রাম ছিল প্রধানত উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের দাবিতে সংগঠিত বর্গাচাষিদের আন্দোলন। এই আন্দোলন সংঘটিত করেছিলেন অবিভক্ত বাংলা কৃষকসভার কর্মীরা।

সেপ্টেম্বর মাসে কৃষক সভার কাউন্সিল থেকে তেভাগার দাবিতে জেলায় জেলায় আন্দোলন সংঘটিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর আগে ১৯৪৫ সালে কৃষকসভা জোতদার ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রাম পরিচালনা করেছিল। কৃষকসভার আহ্বানে জেলায় জেলায় স্বোচ্ছাসেবক ট্রেনিং এবং প্রচার আন্দোলন কাজ শুরু হয়েছিল। আর কাজে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তেভাগার দাবি সারাদেশের কৃষকের মনে বিদ্রোহের দাবানল সৃষ্টি করেছিল। এই তেভাগা আন্দোলন থেকেই কৃষকরা প্রথম আওয়াজ তুলেছিল, ‘লাঙল যার জমি তার।’ ‘আধি নয় তেভাগা চাই।’ ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’ ‘নিজখোলানে ধান তোলো।’ ‘জান দেবো তো ধান দেবো না।’ তেভাগা তাই শুধু ভাগ আদায়ের লড়াই নয়, কৃষকের আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইও বটে।

তেভাগার লড়াইতেই ভাগচাষি প্রথম জমিদারদের ভাগ জমিদারদের দিয়ে মাঠ থেকে নিজের প্রাপ্য ধান নিজের খামারে তুলেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জোতদারি ও জমিদারি প্রথা ক্ষুদ্র কৃষকদের শোষনের সুযোগ করে দেয়। খাজনা আদায়ের জন্য জোতদাররা তাদের দাসের মতো ব্যবহার করে। জমিদার জোতদারদের এই শোষণ, নিপীড়ন নির্যাতন বঞ্চনায় কৃষকের মনে বিক্ষোভের জন্ম দেয়। এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে আন্দোলনে রুপ নেয়। এই সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্র দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী ও জলপাইগুড়ি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। যেসব জেলায় তেভাগা জোতদাররা ভাগচাষিদের ওপর অমানবিক ব্যবহার করত এবং শোষণ ও জুলুম ছিল মাত্রাতিরিক্ত, সেসব জেলা ছিল সংগ্রামের পীঠস্থান। দিনাজপুর জেলায় বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) তেভাগা আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে। এটা ছিল তেভাগা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র।

farmerতৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় ৩০টি থানার মধ্যে ২২টি থানায় তেভাগা আন্দোলন দ্রূত এগিয়ে যায়। রংপুর জেলার নীলফামারী মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) আন্দোলন হয় তীব্র। যশোর জেলায় আন্দোলন হয় নড়াইল মহকুমায় (বর্তমানে জেলা)। পাবনা জেলার একাংশে তেভাগা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ময়মনসিংহ জেলার চারটি স্থানে আন্দোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এখানে মূল আান্দোলন ছিল টংক আন্দোলন। ঢাকা জেলার কুকুটিয়া আঞ্চলে তেভাগা আন্দোলন গড়ে উঠে।

দিনাজপুর ও আশপাশের জেলায় এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ, গুরুদাস তালুকদার, কালী সরকার, রূপনারায়ণ রায়, বিভূতি গুহ, অজিত রায়, জনার্দ্দন ভট্টাচার্য, সূধীর সমাজপতি, সচীন্দ্র চক্রবর্তী ও সুশীল সেন প্রমুখ। আন্দোলন তীব্রতর হতেই থাকে এবং কৃষকরা জমিদার জোতদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। সে সময় ১৯৪৬-৪৭ সালে তেভাগা আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন পুলিশ ঠাকুরগাঁয়ের রানীশংকৈল অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের নেতা ডোমা সিংকে গ্রেফতার করতে গেলে শত শত কৃষক তা প্রতিরোধ করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সফুর চাঁদ, মাকুট সিং ও নেন্দেলি সিং।

সেদিন যা হয়েছিল চেন্দু বটতলায়: ১৯৪৭ সালের ৪ জানুয়ারি দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর থানার তালপুকুর ও বাজিতপুর গ্রামে তেভাগা আন্দোলনকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে এক জঘন্য বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। এ নৃশংস ঘটনায় পুলিশের গুলিতে অনেক বর্গাচাষি হতাহত হয় এবং প্রাণ হারায় শিবরাম মাঝি ও সমিরদাই। গুলিবিদ্ধ হয়ে খুকিরাম মার্ডি, খিলুহাসদা, পরেশ মহন্ত, দায়ারামসহ ৬ জন মারা যান। অন্যদিকে দিনাজপুরের অন্যান্য এলাকার পুলিশের গুলিতে ১৬ জন কৃষক প্রাণ হারায়। তাছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুরের খাঁপুরে সর্বাধিক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী ও নীলফামারীর ডিমলার খগাখড়ি বাড়িতে তেভাগার তীব্র আন্দোলন হয়েছিল। ক্রমান্বয়ে এ আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

farmerঅবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে তেভাগা আন্দোলন আজও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। বাংলায় যে তিনটি বড় ধরনের কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল তার মধ্যে সব থেকে উজ্জ্বলতম অধ্যায় হলো তেভাগা আন্দোলন এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। যতটুকু জানা যায়, তেভাগার শহীদ হিসেবে শিবরাম মাঝি ও সমিরউদ্দিনই প্রথম শহীদ। শিবরাম, সমিরউদ্দিনের রক্তে রঞ্জিত দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার তালপুকুর-বাজিতপুর গ্রামের চেন্দু বটতলায় স্থাপিত তেভাগা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে থাকে।

তেভাগা পরিষদ দিনাজপুর এই ৪ জানুয়ারিতে তেভাগা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তেভাগা আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতায় বলতে হয়, আজ জমিদার জোতদারের যুগ নাই। তেভাগা চারভাগার প্রশ্ন আজ নাই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আজকের কৃষক চাষিরা নিজের জমিতে অথবা অন্য ব্যক্তি মালিকের জমি সনওয়ারি ঠিকা নিয়ে আবাদ করে নিজের মতো করে। সমকালীন প্রেক্ষাপটে কৃষকের সমস্যাগুলো ভিন্নরূপ নিয়েছে।

কৃষিতে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের মাঝে সার-বীজ, কীটনাশকের সরবরাহের ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের মাঝে ঋণ ব্যবস্থাপনার সমস্যা, কৃষকদের মূল উৎপাদন উপকরণ ভূমি, এই ভূমি আইনের জটিলতা ও সংস্কারের বিষয়গুলো দিনকে দিন তীব্র সংকটময় পরিবেশ সৃষ্টি করছে। কৃষকরা আজ দিশেহারা। মধ্য কৃষক আজ ভূমিহীন হতে চলেছে। এসব জরাজীর্ণ সংকট নিরসনের জন্য নতুন আঙ্গিকে কৃষক আন্দোলন আজ জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকরা সংগঠিত হয়ে সমকালীন প্রেক্ষাপটে তাদের দাবি-দাওয়া পূরণে সক্রিয় হবেন এবং কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলবেন এটাই স্বাভাবিক। কৃষকদের হতাশার কিছু নেই। আন্দোলন সঠিকভাবে গড়ে তুললে সফলতা আসবেই। এটাই ঐতিহাসিক বাস্তবতা। পৃথিবীর সব কৃষক আন্দোলন তার সাক্ষ্য বহন করে। তেভাগা আন্দোলনও কৃষকদের কাছে সেই অনুপ্রেরণাই যুগিয়ে আসছে।

farmerএছাড়া নিকট অতীতে ভারতের কৃষক আন্দোলন প্রমাণ করে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সরকারকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করেছে। কৃষকদের অধিকার সমুন্নত হয়েছে। এটিই গোটা পৃথিবীর কৃষক সমাজের আশা জাগানিয়া বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। তেভাগা পরিষদ, দিনাজপুরের উদ্যোগে শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, আলোচনা সভা প্রতি বছর হয়ে থাকে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে থেমে থাকলে চলবে না।

তেভাগা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ও চেতনা আজ কৃষকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণ কৃষকের মধ্যে তেভাগার চেতনা সৃষ্টি করে কৃষকদের উন্নতির জন্য কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তবেই আসবে এই দিবস পালনের স্বার্থকতা। সমকালীন কৃষকদের যে বহুমুখী সমস্যা এ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বিভিন্ন সুপারিশধর্মী আলোচনা জরুরি। শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে তেভাগা দিবস উদযাপন না করে সত্যিকার কৃষকের অধিকার কিভাবে অর্জন সম্ভব হবে কৃষি ও কৃষকের সার্বিক উন্নয়ন হবে এ নিয়েই কার্যকরি পদক্ষেপ নিয়ে তেভাগা পরিষদ সামনে পথ এগুবে এটাই হোক সবার প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন
দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়বো স্বদেশ
বিয়েতে মেহেদি পরা আজকের নয়, ৫০০০ বছরের ঐতিহ্য

কেএসকে

আরও পড়ুন