আলো-ছায়ার লুকোচুরি, কুয়াশায় মোড়া ঢাকার সকাল
ভোর পেরোতেই ঢাকা শহর যেন ঢুকে পড়ে এক ধূসর আবেশে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ঘন কুয়াশা আলোকে ঢেকে দেয়, ছায়াকে করে তোলে আরও দীর্ঘ ও রহস্যময়। রাস্তায় নামা মানুষের মুখ স্পষ্ট নয়, পরিচিত শহরটাও হঠাৎ অচেনা মনে হয়। দূরের কিছুই ধরা পড়ে না চোখে, শুধু হেডলাইটের ফিকে আলো আর অস্পষ্ট অবয়ব জানিয়ে দেয়, জীবন থেমে নেই। কুয়াশার পর্দার আড়ালেও ঢাকার সকাল শুরু হয় নিজস্ব ছন্দে, আলো আর ছায়ার নীরব লুকোচুরির মধ্য দিয়েই।

ঢাকার সকাল মানেই এখন আর কেবল যানজট বা কোলাহল নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘন কুয়াশার এক ধরনের নিঃশব্দ আধিপত্য। আজও ভোর গড়াতেই শহরের আকাশ ঢেকে যায় ধূসর চাদরে। দূরের কিছুই স্পষ্ট নয়, আলো-ছায়ার সীমারেখা মুছে গিয়ে পুরো নগরী যেন ঢুকে পড়ে এক অনিশ্চিত দৃশ্যপটে।

হাতিরঝিল ও কারওয়ানবাজার এলাকায় সকাল থেকেই এই কুয়াশার দাপট চোখে পড়েছে। উঁচু ফ্লাইওভারের আলো ঝাপসা হয়ে আসে, পানির ওপর ভেসে থাকা আলো–প্রতিচ্ছবিও হারিয়ে ফেলে তার স্পষ্টতা। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকা গাড়ি, রিকশা আর মানুষের ছায়া, সব মিলিয়ে শহরটাকে মনে হয় যেন কোনো সিনেমার স্লো-মোশন দৃশ্য।

এই দৃশ্যের মাঝেই চোখে পড়ে আরেকটি বাস্তবতা হেডলাইট জ্বালিয়ে মোটরসাইকেল চালানো মানুষজন। কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই যে অনেক চালকই বাধ্য হচ্ছেন দিনের বেলায়ও হেডলাইট ব্যবহার করতে। দূর থেকে আসা আলোর ফিকে রেখা দেখে বোঝা যায়, সামনে কেউ আছে এটাই যেন এখন বড় ভরসা।

মোটরসাইকেল চালকদের জন্য এই সময়টা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় হঠাৎ ব্রেক, লেন পরিবর্তন কিংবা পথচারীর উপস্থিতি অনেক সময় ধরা পড়ে দেরিতে। তারপরও জীবিকার তাগিদে, অফিসের সময় বাঁচাতে কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাসের কারণেই তারা রাস্তায় নামেন। কুয়াশার সঙ্গে যেন তাদের এক নীরব লড়াই চলে প্রতিদিন।

কারওয়ানবাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। ভোরের বাজার, পণ্যবাহী ট্রাক, বাস আর ছোট যান সব একসঙ্গে চলাচল করে। কুয়াশার পর্দা ভেদ করে চলা এসব যানবাহনের শব্দ আগে আসে, চেহারা আসে পরে। অনেক সময় শুধু হর্ন আর ইঞ্জিনের শব্দ শুনেই পথ আন্দাজ করতে হয়।

হাতিরঝিলে চিত্রটা একটু ভিন্ন হলেও ঝুঁকি কম নয়। খোলা জায়গা, পানির কাছাকাছি হওয়ায় এখানে কুয়াশা আরও ঘন হয়ে জমে থাকে। ব্রিজের ওপর দিয়ে চলার সময় নিচের পানি আর সামনের রাস্তার সীমারেখা একাকার হয়ে যায়। হেডলাইটের আলো পানিতে পড়ে প্রতিফলিত হলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়; কোথায় রাস্তা শেষ, কোথায় বাঁক শুরু, তা বুঝতে সময় লাগে।

এই কুয়াশা শুধু যানবাহনের গতি কমায় না, বদলে দেয় শহরের মেজাজও। মানুষ কম কথা বলে, তাড়াহুড়ো কমে যায়। চা-দোকানে বসে থাকা লোকজনের চোখে ঘুম আর কুয়াশা মিশে থাকে। শহর যেন একটু ধীর হয়ে আসে, একটু বেশি সাবধানী হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন এ ধরনের আবহাওয়ায় হেডলাইট জ্বালানো, গতি কম রাখা, হেলমেট ও রিফ্লেক্টিভ জ্যাকেট ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে সচেতনতা আর প্রয়োজনের মাঝে অনেক সময়ই ফারাক থেকে যায়। তারপরও যারা হেডলাইট জ্বালিয়ে চলছেন, তারা অন্তত নিজেদের দৃশ্যমান রাখার চেষ্টা করছেন-এটাই এই কুয়াশার ভেতরে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

ঢাকার এই কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল তাই শুধু আবহাওয়ার খবর নয়, এটি নগরজীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এখানে সতর্কতা, তাগিদ আর অভ্যাস সব একসঙ্গে চলতে থাকে। কুয়াশা একসময় কেটে যাবে, সূর্য উঠবে, রাস্তা পরিষ্কার হবে। কিন্তু এই সময়টায় শহর যেভাবে নিজেকে সামলে নেয়, সেটাই বলে দেয় ঢাকা প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে।
জেএস/