ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

ডিজিটাল যুগে গ্রন্থাগার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম

মোহাম্মদ সোহেল রানা | প্রকাশিত: ০৩:১৩ পিএম, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

‎একটা সময় ছিল, যখন নীরব দুপুরে কিংবা বিকেলের অবসরে গ্রন্থাগারে কাঠের চেয়ারে বসে বইয়ের পাতা উল্টানোর মৃদু শব্দই ছিল তরুণদের সবচেয়ে প্রিয়। শত শত বইয়ের ভিড়ে নিজেদের পছন্দের বই খুঁজে নেওয়াই ছিল তাদের ব্যস্ততা। তবে ডিজিটাল যুগের ঝলমলে পর্দা, দ্রুতগতির ইন্টারনেট আর এক ক্লিকে পাওয়া তথ্যে গ্রন্থাগার যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে বই থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম

‎বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে গ্রন্থাগারের সম্পর্ক গভীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগার, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গণগ্রন্থাগার এক সময় ছিল জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশক কিংবা তার আগের সময়গুলোতে, যখন ইন্টারনেট ছিল বিলাসিতা, তখন গ্রন্থাগারই ছিল শিক্ষার্থী ও তরুণদের একমাত্র ভরসা। পরীক্ষার প্রস্তুতি, সাহিত্যচর্চা, পত্রিকা পড়া বা অবসরে বই পড়ার আনন্দ সব কিছুর ঠিকানা ছিল লাইব্রেরি।

‎তবে সময় বদলেছে। আজকের তরুণ প্রজন্মের নিত্যসঙ্গী হচ্ছে স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ। গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক এসব প্ল্যাটফর্মে তথ্য আর বিনোদনের ছড়াছড়ি। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে যে তথ্য মেলে, সেখানে আর কেউ লাইব্রেরিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতে চান না। যা আজ গ্রন্থাগারের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।

‎বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। এক সময় যেখানে লাইব্রেরিতে বসার জায়গা পাওয়া যেত না, পছন্দের বইটি পড়তে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, কখনো মাসও পেরিয়ে যেতো। এখন অনেক সময় বইয়ের তাকই যেন একাকী দাঁড়িয়ে থাকে। ধুলোয় ঢাকা পড়েছে বইয়ের আবরণও। শিক্ষার্থীরা এখন নোট, বইয়ের পিডিএফ কিংবা ইউটিউব লেকচারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে গ্রন্থাগার দিন দিন যেন পাঠক হারিয়ে ফেলছে। এর মধ্যেই দেশের অনেক গ্রন্থাগার বন্ধও হয়ে গেছে। কিছু গ্রন্থাগার খোলা থাকলেও নেই পাঠকের দেখা, এক সময়ের ব্যস্ত অফিস সহকারী এখন নীরবে বসে বেলা পার করার ছুতো খোঁজেন।

আরও পড়ুন
নতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!
মাদুলির মোড়কে নিরাপত্তার খোঁজ, ভ্রান্ত বিশ্বাসে বাঁধা বাস্তবতা

‎তবে শুধু প্রযুক্তিকে দোষ দিলে পুরো সত্য বলা হয় না। দেশের অনেক গ্রন্থাগার সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে আধুনিক করতে পারেনি। পুরোনো বই, অপ্রতুল নতুন প্রকাশনা, বসার অস্বস্তিকর পরিবেশ, ডিজিটাল সুবিধার অভাব-এসব কারণে তরুণরা আকর্ষণ বোধ করে না। অনেক উপজেলা বা স্কুল-কলেজের গ্রন্থাগার কেবল নামেই আছে, বাস্তবে সেগুলো তালাবদ্ধ কিংবা অব্যবহৃত। ফলে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে গ্রন্থাগারের সম্পর্কটা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এছাড়া ‎আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন। ডিজিটাল যুগে মনোযোগ ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ছোট ভিডিও, দ্রুত বদলে যাওয়া কনটেন্টে অভ্যস্ত তরুণদের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়া কঠিন হয়ে উঠছে। লাইব্রেরি যেখানে ধৈর্য, মনোযোগ আর গভীর চিন্তার জায়গা, সেখানে আজকের তরুণরা অভ্যস্ত দ্রুতগতির স্ক্রলে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক গঠন ও চিন্তাভাবনার গভীরতায়ও।

‎তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে গ্রন্থাগার ও বই পড়ার ওপর নতুন করে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন কবি ও প্রাবন্ধিক জাকারিয়া জাহাঙ্গীর। ‎জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘পৃথিবী যতই এগিয়ে যাক, তথ্যপ্রযুক্তির যত উন্নয়নই হোক না কেন, কিংবা যত আধুনিক ডিভাইসই আবিষ্কৃত হোক জ্ঞান ও পাঠযোগ্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। অথচ তথাকথিত সভ্যতার এই যুগে আমরা দেখছি, সামাজিক অবক্ষয় তরুণ সমাজকে দিন দিন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবক্ষয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ তরুণদের বইমুখী করা। কিন্তু দুঃখজনক এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।’

‎তিনি আরও বলেন, ‘দেশে বিদ্যমান গ্রন্থাগারগুলো চরম অবহেলার শিকার। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক গ্রন্থাগার আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যদিও কিছু জায়গায় বেসরকারিভাবে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে পর্যাপ্ত সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে তাও টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মননচর্চার বিকাশে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ ও প্রয়োজন ছিল।’

‎এই লেখক মনে করেন, তরুণ প্রজন্মকে মাদক, জুয়া, অপরাজনীতি ও নানামুখী সামাজিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে সরকারকে এখনই ভাবতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গ্রন্থাগার চালু ও সক্রিয় করতে হবে, পাঠবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং তরুণদের বই পড়ায় উৎসাহিত করতে পুরস্কারের তালিকায় বইকেই যুক্ত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু জ্ঞান গড়ে তোলে গ্রন্থাগার। একটি বইয়ের পাতায় যে ধীরতা, গভীরতা ও অনুভব তা স্ক্রিনে মেলে না। গ্রন্থাগার মানুষকে একা হয়েও চিন্তার সঙ্গে থাকতে শেখায়, নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখায়। বাংলাদেশ যেমন সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির দেশ, সেখানে গ্রন্থাগার হারিয়ে গেলে সেই শিকড়ও দুর্বল হয়ে পড়বে।

‎ডিজিটাল যুগকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু তার সঙ্গে হাত মিলিয়েই গ্রন্থাগারকে বাঁচাতে হবে। কারণ গ্রন্থাগার শুধু বইয়ের ঘর নয় এটি একটি জাতির চিন্তার ঘর। যদি তরুণরা সেই ঘর থেকে দূরে সরে যায়, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরও দ্রুতগতির হলেও গ্রন্থাগার না থাকার কারণে শূন্যতাও হয়ে উঠবে। আর সেই শূন্যতা কোনো স্ক্রিনই পূরণ করতে পারবে না।

কেএসকে

আরও পড়ুন