ভোট শেষে ফলাফল কীভাবে তৈরি হয় জানেন?
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন মানেই সাধারণত একদিনের ভোটগ্রহণ ও পরে ধাপে ধাপে ফলাফল ঘোষণা। তবে এবার একই দিনে সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াই কিছুটা ভিন্ন ও জটিল হয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন আগেই জানিয়েছে, দুটি আলাদা ব্যালটে ভোট হওয়ায় গণনা ও ফল প্রস্তুতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লাগতে পারে।
ভোটের সময়সূচিতে পরিবর্তন
বাংলাদেশে সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট হয়। কিন্তু এবার ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায় এবং চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। অর্থাৎ ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে, যাতে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-দুটি প্রক্রিয়াই নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়। নির্ধারিত সময় পার হলেও যদি কোনো কেন্দ্রের ভেতরে ভোটার উপস্থিত থাকেন, তবে তাদের ভোট দেওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।
ভোট শেষে গণনা শুরু যেভাবে
ভোটগ্রহণ শেষ হলে প্রতিটি বুথের ব্যালট বাক্স প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে সিল ও লক করে নির্ধারিত গণনা কক্ষে নেওয়া হয়। যদিও ভোট বিভিন্ন কক্ষে হয় বিশেষ করে নারী ও পুরুষ ভোটারের জন্য আলাদা কক্ষ থাকে গণনা করা হয় একটি নির্দিষ্ট কক্ষে, যেখানে প্রার্থীদের প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকতে পারেন।
গণনা শুরু করার আগে কর্মকর্তারা বাক্স নম্বর ও লকের নম্বর মিলিয়ে নেন। এরপর বাক্স খুলে ব্যালট পেপার বের করা হয় এবং কর্মকর্তারা গণনা শুরু করেন। যেহেতু এবার দুটি ব্যালট রয়েছে একটি সংসদ নির্বাচনের এবং অন্যটি গণভোটের তাই প্রথমে এগুলো আলাদা করা হয়। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট প্রতীক অনুযায়ী ভাগ করা হয়, আর গণভোটের ব্যালট ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ এই দুই ভাগে গণনা করা হয়। যেসব ব্যালট ছেঁড়া, সিলবিহীন বা কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়া পাওয়া যায়, সেগুলো বাতিল হিসেবে আলাদা রাখা হয়।
কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রস্তুতি
গণনা শেষে নির্ধারিত সরকারি ফরমে প্রতিটি কেন্দ্রের ফলাফল লিখতে হয়। সেখানে প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট, বাতিল ভোট, মোট প্রদত্ত ভোট সব তথ্য সংখ্যায় ও কথায় লিখতে হয়। কোনো কাটাকাটি বা অস্পষ্টতা থাকলে তা সন্দেহের কারণ হতে পারে, তাই এসব বিষয়ে কঠোর নিয়ম রয়েছে।
ফলাফল শিট প্রস্তুত হলে তাতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও উপস্থিত পোলিং এজেন্টরা স্বাক্ষর করেন। এরপর ওই ফলাফলের একাধিক কপি তৈরি করা হয়। একটি কপি কেন্দ্রেই টানানো হয় যাতে সবাই দেখতে পারেন। বাকি কপিগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে সংরক্ষণ, প্রেরণ ও জমা দেওয়া হয় কিছু ব্যালটের বস্তায় সিল করে রাখা হয়, কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়, আবার একটি কপি কমিশনের জন্য পাঠানো হয়।
ফলাফল জমা ও ঘোষণার ধাপ
প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ফলাফল জমা দেন। সেখানে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল যাচাই করে কন্ট্রোল রুম থেকে তা মাইকে ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তথ্য নির্বাচন কমিশনের সার্ভারেও আপলোড করা হয়। এই বহুমাত্রিক যাচাই ব্যবস্থার কারণে একটি কেন্দ্রের ফলাফল ইচ্ছেমতো বদলে ফেলা সহজ নয়। কারণ একই তথ্য থাকে কেন্দ্রের নোটিশ বোর্ডে, এজেন্টদের কপিতে এবং কমিশনের ডাটাবেজে।
কারচুপির অভিযোগ কেন ওঠে
তবে বাস্তবে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বিশেষ করে এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, আগেভাগে ব্যালটে সিল দেওয়ার মতো অভিযোগ অতীতে আলোচিত হয়েছে। এসব ঘটনায় কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোট স্থগিত বা বাতিলও করা হয়েছে। যদি বাতিল কেন্দ্রগুলোর ভোট ফলাফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে পরে সেখানে পুনরায় ভোট নেওয়া হয়।
পোস্টাল ব্যালটের প্রভাব
এবার নতুন সংযোজন হলো পোস্টাল ব্যালট। প্রবাসী ভোটার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে এসব পোস্টাল ব্যালটও আলাদাভাবে খোলা ও গণনা করা হবে প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই। এরপর সব ভোট মিলিয়ে আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
আপত্তি বা পুনর্গণনার সুযোগ
কোনো প্রার্থী যদি ফলাফল নিয়ে সন্দেহ বা আপত্তি করেন, তাহলে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনর্গণনার আবেদন করতে পারেন। কমিশন অনুমতি দিলে পুনরায় গণনা করা হয়। এছাড়া ফলাফল নিয়ে আইনি আপত্তি থাকলে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সুযোগও রয়েছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল প্রস্তুত একটি বহুস্তর যাচাই-নির্ভর প্রক্রিয়া। কেন্দ্র থেকে শুরু করে কমিশনের সার্ভার পর্যন্ত একাধিক ধাপে তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। তাই ফলাফল প্রকাশে সময় লাগলেও এর উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভোটের ফল নিয়ে সন্দেহের সুযোগ কমিয়ে আনা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আরও পড়ুন
ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারের কাজ কি?
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে কীভাবে?
কেএসকে