ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

‘বাংলিশ’ ভাষার দূষণ নাকি সময়ের বিবর্তন?

ফিচার ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৮:৫৬ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তানজিদ শুভ্র
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের অহংকার, আমাদের অস্তিত্বের শিকড়। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলার রূপ কি পাল্টাচ্ছে? সোশ্যাল মিডিয়ার চ্যাটিং, স্ট্যাটাস কিংবা আড্ডায় রোমান হরফে বাংলা লেখা বা ইংরেজি-বাংলার অদ্ভুত মিশ্রণ যাকে আমরা ‘বাংলিশ’ বলছি তা কি ভাষার দূষণ, নাকি সময়ের স্বাভাবিক বিবর্তন? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এই সমসাময়িক বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের মতামত।

সচেতন ব্যবহারেই মুক্তি
মেহেদী হাসান জয়
শিক্ষার্থী, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর।
আধুনিক পৃথিবীতে যোগাযোগের বড় অংশটাই কিবোর্ড ও স্ক্রিন কেন্দ্রিক। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক সবখানেই দ্রুত টাইপ করার সুবিধা ও সহজতার অজুহাতে অনেকেই ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লেখা ব্যবহার করেন, যেটাকে আমরা বাংলিশ বলি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনা আমাদের শুদ্ধ বাংলার মর্যাদা শেখায়। তবে বাস্তবতা হলো, ভাষা কখনো স্থির থাকে না। প্রযুক্তি, পপ কালচার ও গ্লোবাল কানেক্টিভিটির প্রভাবে ভাষা বদলায়, নতুন রূপ নেয়। এটি তার স্বাভাবিক বিবর্তন। বাংলিশ ঠিক তেমনই একটি পরিবর্তনের উদাহরণ। তবে সমস্যা হয় যখন এটি অভ্যাসে পরিণত হয় এবং প্রমিত বাংলা লেখার দক্ষতা কমে যায়। অনেকেই দীর্ঘ বাংলা বাক্য লিখতে দ্বিধা বা বিরক্তি বোধ করেন এবং বানানের ক্ষেত্রে অসচেতন থাকেন। ফলে ভাষার গভীরতা ও সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলিশকে সম্পূর্ণ বর্জন নয়; বরং সচেতন ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করাই আমাদের কর্তব্য। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অঙ্গীকার হোক,আমরা সবাই আমাদের নিজ নিজ মাতৃভাষাকে সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে চলব।

ভাষার নিজস্ব সৌন্দর্য ব্যাহত হয়
তৈয়বা খানম
শিক্ষার্থী, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
প্রতিটা ভাষার আলাদা বৈচিত্র্য থাকে। এই বৈচিত্র্যের দ্বারাই আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও ভাবগুলো আমরা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারি। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই সময়ে আমরা বাংলা-ইংরেজি ভাষার মিশ্রণকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছি। কিন্তু বাংলা-ইংরেজি মিশ্রণে ভাষার নিজস্ব সৌন্দর্য ব্যাহত হয়। বাংলা ভাষার প্রতিটা শব্দচয়নে, শব্দের ভাঁজে যে অব্যক্ত অনুভূতি ব্যক্ত হয়, অন্য ভাষার মিশ্রণে সেই কার্যকারিতা হারায়। আমার কাছে মনে হয়, এটি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন নয় বরং বাংলাকে গ্রাস করা। বহু ত্যাগ, সংগ্রাম ও রক্তে অর্জিত এই বাংলা ভাষা। তাই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ভাষার এই বিকৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমাদের দায়বদ্ধতা
ফাহিমা আক্তার
শিক্ষার্থী, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা।
ভাষা আন্দোলনের সাত দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলা ভাষার যথাযথ মর্যাদা সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ সমাজের একটি অংশের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি সম্মানহীনতার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেক পরিবার ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে, ফলে শিক্ষার্থীরা শেকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বর্তমানে কোনো কোনো গণমাধ্যম বা বিজ্ঞাপনে ইংরেজি-বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষা তৈরি করা হচ্ছে। ইংরেজি, হিন্দি ও আঞ্চলিক ভাষার অহেতুক সংমিশ্রণে মূলত প্রমিত বাংলা ভাষাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আগে মাতৃভাষা, পরে অন্য ভাষা’। এই চরম সত্যকে ধারণ করে শুধু দিবসকেন্দ্রিক আবেগ নয়, বরং প্রমিত বাংলার চর্চা ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হোক আমাদের লক্ষ্য। ভাষার অস্বাভাবিক মৃত্যু বা দূষণ রোধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ভাষা দূষণ নদী দূষণের মতোই বিধ্বংসী
ফারনাজ মুক্তা
শিক্ষার্থী, নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ।
বর্তমানে তরুণরা যে ‘বাংলিশ’ ভাষা ব্যবহার করছে, তা আঞ্চলিকও না, প্রমিত বাংলাও না, আবার ইংরেজিও না বলা যেতে পারে জগাখিচুড়ি ভাষা। বাংলিশে অভ্যস্ত শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতা বা আনুষ্ঠানিক লেখায় শুদ্ধ ভাষা প্রয়োগে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা না শিখছে প্রমিত বাংলা, না অর্জন করছে শুদ্ধ ইংরেজি। দুই দিকেই তৈরি হচ্ছে শূন্যতা। ভাষার বিকৃতি ও অপব্যবহারের ফলে ভাষার দূষণ দ্রুত ছড়াচ্ছে, যা নদী দূষণের মতোই বিধ্বংসী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাষাকে মায়ের দুধের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা ছাড়া শিশুর পুষ্টি অসম্পূর্ণ। শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। ভাষা রক্ষার দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, এ দায় আমাদের সবার।

তরুণ প্রজন্মের আধুনিকতা ও ভাষার বিপর্যয়
রিকমা আক্তার
শিক্ষার্থী, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ।
ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা ভাষা শহীদদের স্মরণ করি এবং ভাষা নিয়ে গর্ববোধ করি। তবে আমাদের প্রতিদিনের ভাষার ব্যবহারে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। আমাদের কথাবার্তা, মেসেজ আদান-প্রদান কিংবা আড্ডায় বাংলা এবং ইংরেজির মিশ্রণ ঘটিয়ে সুন্দর ভাষার মর্যাদা নষ্ট করছি প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্ম কারণে-অকারণে বাংলিশ ব্যবহার করায়, অনেক ইংরেজি শব্দের বাংলা অর্থই তারা জানে না। প্রযুক্তির এই যুগে এসেও শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা করা সম্ভব। মেসেজ আদান-প্রদান, আনুষ্ঠানিক লেখালেখি ও দৈনন্দিন কথাবার্তায় শুদ্ধ বাংলা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলা শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ এবং ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা করতে হবে।

তরুণদের লেখনীতে একটি বিষয় স্পষ্ট ভাষার পরিবর্তনশীলতাকে তারা অস্বীকার করছেন না, কিন্তু ভাষার বিকৃতি বা ‘বাংলিশ’-এর আধিপত্য নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। প্রযুক্তি আমাদের এগিয়ে নেবে, কিন্তু তা যেন আমাদের শেকড়কে উপড়ে না ফেলে। একুশের চেতনার সার্থকতা তখনই আসবে, যখন আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, এবং ডিজিটাল পরিসরেও প্রমিত বাংলার সঠিক চর্চা অব্যাহত রাখব।

আরও পড়ুন
বাংলার নৃশংস গণহত্যার ইতিহাস জানেন কি?
বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কৃষক সংগ্রাম ‘তেভাগা আন্দোলন’

কেএসকে

আরও পড়ুন