ছিন্নমূলদের কথাও ভাবতে হবে
সারাদেশে শুধু পথশিশুর সংখ্যাই ১০ থেকে ১৫ লাখ
দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৯ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। নদী ভাঙ্গন, সিডর, জলোচ্ছ্বাসসহ যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের দেশের মানুষ প্রতিবছর সর্বস্ব হারায়। তখন তারা পেটের দায়ে ঢাকায় আসেন। এসব ছিন্নমূল পরিবার বা পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মহানগরীর ফুটপাত, ওভারব্রীজ, লঞ্চ স্টেশন, রেলস্টেশন, অফিসের বারান্দায় বসবাস করেন। ছিন্নমূল এসব মানুষের একদিন সবই ছিল ঘরবাড়ী, গরু, মহিষ। পুকুরভরা মাছ।
কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সর্বস্ব হারিয়ে তাদের এই পরিণতি হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এসব পরিবারের মানুষ আজ মানবেতর জীবন-যাপনে বাধ্য হচ্ছেন। এদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বিশ বছর আগেও এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে ছিল না। অতীতে এদের নিয়ে ভাবা প্রয়োজন ছিল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের সব ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি ছিন্নমূল এসব পরিবারকে পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিতে হবে। আপাতত ছাউনির ব্যবস্থা করে এদের একত্রিত করতে হবে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এরা হুমকিস্বরূপ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে এদের নিয়ে আগে ভাবতে হবে। এদের মানবেতর জীবন-যাপন থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে। আমরা যত গরীব হই না কেন উদ্যোগ নিলে সবকিছুই সম্ভব বলে আমাদের বিশ্বাস। মানবেতর অবস্থার বসবাসকারী একজন মানুষকে সন্ত্রাসী করে গড়ে তুলবে না একথা না ভাবার অবকাশ নাই। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি এদের বদৌলতে বেড়েই চলেছে। এদের কাজের ব্যবস্থা নাই। বসবাসের জায়গা নাই। এদের নির্দিষ্ট ঠিকানা নাই। প্রয়োজনে কাজ নাই। এদের এ ভয়াবহ পরিণতির জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দায়ী হলেও এদের এ জীবন থেকে পরিত্রাণ করার দায়িত্ব সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে সবার।
গভীর রাতে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে একটু দেখুন। একটু ভাবুন এদের জন্য কি ছাউনির প্রয়োজন নাই? ছাউনি নির্মাণ করে এদেরকে একত্রিত করে প্রত্যেকের ভোটার আইডি কার্ড করে দিতে হবে। এদের নিশ্চিন্তে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে এদের কাজের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে। ছিন্নমূল পরিবারদের পুনর্বাসিত করতে বেসরকারি ও সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কাজ করে যেতে হবে। এদের প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে সমাজের সক্ষম সব শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। এদের মধ্য থেকে বহুজন আছেন পাগল হয়ে রাস্তায় বছরের পর বছর ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাদেরও সরকারী আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে খবর দেওয়ার জন্য সমাজ সেবা অধিদপ্তরের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
অপরদিকে জনশুমারি ও জাতীয় গৃহগণনা-২০২২ অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটির জনসংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮২ জন। ঢাকা শহরের নিম্নআয়ের মানুষের ওপর পাওয়ার অ্যান্ড পারটিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় বলা হয়, নিম্নআয়ের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সরাসরি বস্তি বা বস্তির মতো পরিবেশে বাস করে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ, ২০২২) এ তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ড্যাপের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বেশিরভাগ মানুষের জন্য বাসস্থান এখনো সামর্থ্যরে সীমার বাইরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। বাংলাদেশের ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগবিষয়ক গবেষণায় এ কথা বলা হয়েছে।
গ্রামপর্যায়ে সরকার দুস্থ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ), কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি করছে; বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীরা সরকারি ভাতা পায়। শহরপর্যায়ে এসব সুবিধা চালু নেই। টিসিবি নগর/শহরপর্যায়ে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করলেও তাতে চরম অব্যবস্থা বিরাজমান। যাদের প্রয়োজন তারা সেসব পাচ্ছে না। অপেক্ষাকৃত সচ্ছলরা এ সুবিধা নিচ্ছে। হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী টিসিবি থেকে দেওয়া নির্ধারিত পরিমাণ পণ্যও কিনতে পারছে না। যা রোজগার হয় তা নিয়ে একত্রে এত পরিমাণ মালামাল সবাই কিনতে পারে না। আর টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে সবসময় মালামালও পাওয়া যায় না।
বিভিন্ন সংস্থার মতে, সারাদেশে শুধু পথশিশুর সংখ্যাই ১০ থেকে ১৫ লাখ। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, ছিন্নমূল মানুষদের সঠিক সংখ্যাটি আসলে কত, তা আমাদের জানা নেই। সেটা না জানা থাকলেও সংখ্যাটা যে বেশ বড়, সেটা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। পথশিশুরা শিক্ষাদীক্ষা থেকে বহু দূরে, প্রায় সবাই অপুষ্টিতে ভোগে, বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে, তাদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা সঞ্চারিত হয় না।
ছিন্নমূল মানুষদের মধ্যে অনেকে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র সংগ্রহ, ফুল বিক্রি, হকারি, ভিক্ষা করলেও অনেকে আবার চুরি, পকেটমারি, ডাকাতি, মাদক বিক্রিসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকলেই যে তাদের নিয়ে আমাদের সহানুভূতি থাকা উচিত না, তা নয়। তারা অভাবের তাড়নায় এসব অপকর্ম করে থাকে। এই অপরাধের আরেকটি কারণ হলো মানবেতর জীবনযাপনের ফলে তাদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতাবোধ সৃষ্টি না হওয়া। তারা কোনো অপরাধ করলে অবশ্যই শাস্তি পাবে, কিন্তু আমাদের এ বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে, তারা কেন অপরাধ করছে, তাদের অপরাধ করার পেছনের কারণগুলো আসলে কী।
আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের সব মানুষের মৌলিক চাহিদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে বিগত কোনো সরকারই সেটা করেনি। বর্তমান সরকার অবশ্যই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়াসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে বিগত কোনো সরকার ছিন্নমূল মানুষদের জন্য বিশেষভাবে কখনো চিন্তা করেনি।
বর্তমান সরকার ছিন্নমূল মানুষদের জন্য অন্ততপক্ষে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করেছে। আপাতত সারা দেশে ছিন্নমূল মানুষের সঠিক সংখ্যা হিসাব করা এবং সে অনুযায়ী বাসস্থানসহ জীবন ধারণের জন্য মৌলিক উপকরণ প্রদানের পাশাপাশি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের বিষয়ে কাজ শুরু করা। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ঢাকাসহ অন্যান্য যে বিভাগীয় শহরগুলোতে এতসংখ্যক মানুষের স্থান সংকুলান হবে না, সে ক্ষেত্রে কিছুসংখ্যক মানুষকে শহরে আবাসন ও কাজের ব্যবস্থা করে দিয়ে যেসব গ্রাম কম ঘনবসতিপূর্ণ সেখানে তাদের আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে সবাই এদের ব্যাপারে খবর নিতে পারবেন। ভাগ্য-বর্জিত এসব মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া জাতির জন্য কলঙ্কস্বরূপ।
আরও পড়ুন
রমজানে ভিন্ন ছন্দ মালিনীছড়া চা বাগানে
মাঝরাতে জমে ওঠে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বেনারসির হাট
কেএসকে