হালিম রান্না করে মাস্টারশেফের বিচারকদের মন জিতলেন ইসমাইল
‘মাস্টারশেফ: দ্য প্রফেশনালস ২০২৬’ আসরে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন ইসমাইল
উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার হালিম দিয়েই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নজর কাড়লেন বাংলাদেশের শেফ ইসমাইল। জনপ্রিয় রান্নার প্রতিযোগিতা ‘মাস্টারশেফ: দ্য প্রফেশনালস ২০২৬’ আসরে নিজের সৃজনশীলতা আর স্বাদের জাদুতে বিচারকদের মুগ্ধ করে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
ধীর আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা এই ক্লাসিক পদটিকে নিজের মতো করে পরিবেশন করে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন বিচারক রন্ধনশিল্পের কিংবদন্তি মার্কাস ওয়্যারিং, প্রখ্যাত শেফ মনিকা গ্যালেটি এবং ম্যাট টেবাটকের কাছ থেকে।
বাংলাদেশের রাজশাহীর সন্তান ৩৩ বছর বয়সী ইসমাইল বর্তমানে স্ত্রী সারা ও ছোট মেয়েকে নিয়ে পশ্চিম লন্ডনে বসবাস করছেন। প্রতিযোগিতার মঞ্চে তিনি তুলে ধরেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার হালিম। গম, মসুর ডাল, বার্লি এবং নরম মাংস দিয়ে তৈরি পুষ্টিকর ও মশলাদার এক ঐতিহ্যবাহী খাবার।
দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে বহুল জনপ্রিয় এই পদটি বিশেষ করে রমজান মাসে ইফতারের সময় পরিবারের মিলনমেলায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। ইসমাইলের উপস্থাপনায় এই পরিচিত খাবারই নতুনভাবে প্রাণ পায় এবং আন্তর্জাতিক বিচারকদের সামনে দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির গভীরতা তুলে ধরে।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের লাখো মানুষের কাছে হালিম শুধু খাবার নয় এটি ধৈর্য, ঐতিহ্য এবং একতার প্রতীক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধীরে রান্না করে এর মসৃণ টেক্সচার তৈরি করা হয়। ঢাকাসহ হায়দ্রাবাদ ও করাচির মতো শহরে রমজান এলেই হালিমের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। সেই ঐতিহ্যকেই মাস্টারশেফের রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে ইসমাইল প্রমাণ করেছেন স্থানীয় স্বাদও বিশ্বমঞ্চে সমানভাবে সমাদৃত হতে পারে।
ইসমাইলের এই সাফল্যের পেছনের গল্পটাও অনুপ্রেরণাদায়ক। যুক্তরাজ্যে এসে তিনি প্রথমে লন্ডনের একটি স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় কিচেন পোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। থালাবাসন ধোয়া থেকে শুরু করে রান্নাঘরের প্রতিটি বিভাগে কাজ শিখে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং উপকরণের প্রতি সম্মান এই তিনটি বিষয়ই তার ক্যারিয়ারের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। পরবর্তীতে তিনি ধাপে ধাপে উন্নতি করে হেড শেফ পদে পৌঁছান।
রন্ধনশিল্পের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি থেমে থাকেননি। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছেন, পরে নিয়োগকর্তার সহায়তায় লেভেল ২ অ্যাডভান্সড শেফিং কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর লেভেল ৩ ফুড সেফটি ও হাইজিন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলেন। লন্ডনের বিভিন্ন নামকরা রেস্তোরাঁয় কাজ করে তিনি তার পেশার ভিত্তি আরও দৃঢ় করে গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তিনি আর্চওয়ের সেন্ট জন’স ট্যাভার্নে হেড শেফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে ইসমাইলের রান্নার প্রতি ভালোবাসার শুরু অনেক আগেই বাংলাদেশে তার নিজের ঘর থেকেই। মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে সময় কাটাতে কাটাতেই খাবারের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে যুক্তরাজ্যে এসে তার এক হেড শেফ জেমস নাইটের কাছ থেকে তিনি শিখেছেন কীভাবে সাধারণ উপকরণ দিয়েও অসাধারণ খাবার তৈরি করা যায়। সেখান থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন খাবার মানুষের মনে আনন্দ এনে দিতে পারে।
নিজের রান্নার ধরন সম্পর্কে ইসমাইল জানান, তিনি সরলতা, উপকরণের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ধৈর্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। ধীরে রান্না করা এবং খোলা আগুনে রান্না তার বিশেষ পছন্দ, যা খাবারে গভীর স্বাদ ও স্বকীয়তা এনে দেয়। তার মতে, লবণ, মরিচ এবং রসুন এই তিনটি উপাদান ছাড়া কোনো রান্নাই সম্পূর্ণ নয়।
বর্তমানে মাস্টারশেফের ১৮তম সিরিজে অংশ নিয়ে তিনি ৩২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। কঠিন চ্যালেঞ্জ আর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা এই যাত্রা তার কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয় বরং নিজের দক্ষতা প্রমাণের একটি মঞ্চ।
রান্নাঘরের বাইরে ইসমাইল একজন পারিবারিক মানুষ। অবসর সময়ে তিনি স্ত্রী, মেয়ে ও পোষা কুকুরের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন, ঘুরতে যান এবং নতুন নতুন খাবারের স্বাদ নেন। তবে আপাতত তার পুরো মনোযোগ মাস্টারশেফের রান্নাঘরে যেখানে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হালিম তাকে বিশ্বজয়ের পথে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন
বাংলায় ইফতারে ছোলা-মুড়ি খাওয়ার প্রচলন শুরু হলো কীভাবে?
মাঝরাতে জমে ওঠে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বেনারসির হাট
কেএসকে