চৈত্রসংক্রান্তি: মর্মান্তিক ইতিহাস-হারিয়ে যাওয়া বাংলার উৎসব
গ্রামাঞ্চলে এখনো কিছু জায়গায় চৈত্রসংক্রান্তির ঐতিহ্য টিকে আছে
একসময় বাংলা বছরের শেষ দিন মানেই ছিল এক গভীর আবেগ ও লোকজ উৎসবের রঙিন আয়োজন। বাংলা বছরের শেষদিন পালন করা চৈত্রসংক্রান্তি। আবহমান বাংলার চিরায়িত বিভিন্ন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আসছে এই চৈত্র সংক্রান্তি। বছরের শেষ দিন হিসেবে পুরাতনকে বিদায় ও নতুন বর্ষকে বরণ করার জন্য প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন। মনে করা হয়, চৈত্রসংক্রান্তিকে অনুসরণ করেই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এত আয়োজন।
চৈত্রসংক্রান্তি এলেই গ্রামবাংলায় শুরু হতো পুরোনো বছরকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, মাঠ-ঘাট সাজানো, আগুন জ্বালানো, আর নানা লোকাচারের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন বছরের জন্য নিজেদের শুদ্ধ করে তুলত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসবের অনেক কিছুই এখন হারিয়ে যেতে বসেছে, বিশেষ করে শহুরে জীবনে।

গ্রামাঞ্চলে কিছু জায়গায় টিকে আছে চৈত্রসংক্রান্তির ঐতিহ্য
গ্রামাঞ্চলে এখনো কিছু জায়গায় চৈত্রসংক্রান্তির ঐতিহ্য টিকে আছে। ১৪ শাক রান্না, পান্তা-ভাত, শুটকি মাছ, আর ছোট ছোট গ্রামীণ মেলা এসবই ছিল এই সময়ের প্রধান আকর্ষণ। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় শরীর ও মনকে শুদ্ধ করার জন্য বিশেষ খাবার ও আচার পালন করা হতো। কিন্তু শহরে এই উৎসব এখন প্রায় অদৃশ্য। এখানে চৈত্রসংক্রান্তি অনেকের কাছে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র।
পুরাণমতে, এ দিনের নামকরণ করা হয়েছিল ‘চিত্রা’ নক্ষত্রের নামানুসারে। আদিগ্রন্থ পুরাণে বর্ণিত আছে, সাতাশটি নক্ষত্র; যা রাজা প্রজাপতি দক্ষের সুন্দরীকন্যার নামানুসারে নামকরণ করা হয়। সে সময় প্রবাদতুল্য সুন্দরী এ কন্যাদের বিয়ে দেওয়ার চিন্তায় উৎকণ্ঠিত রাজা দক্ষ। উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে লাগলেন তিনি। বহুদিন খুঁজেও কন্যাদের যোগ্য পাত্র পাচ্ছিলেন না প্রজাপতি দক্ষ। শেষমেষ একদিন মহা ধুমধামে চন্দ্রদেবের সঙ্গে বিয়ে হলো দক্ষের সাতাশ কন্যার। দক্ষের এক কন্যা চিত্রার নামানুসারে চিত্রা নক্ষত্র এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়। রাজা দক্ষের আরেক অনন্য সুন্দরী কন্যা বিশখার নামানুসারে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র এবং ‘বিশাখা’ নক্ষত্রের নামানুসারে বৈশাখ মাসের নামকরণ করা হয়।
বাঙালি ঐতিহ্যে দিনটি পালন করা হয় নানা উৎসব আয়োজনে। মূলত খাজনা পরিশোধের দিনটিকে পরবর্তীতে উৎসবের দিন ধার্য করা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালিরা গাজন, নীল পূজা বা চড়ক পূজা পালন করেন। এছাড়াও চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও শেষ প্রস্তুতি চলে হালখাতার।

চৈত্রসংক্রান্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মর্মান্তিক ইতিহাস চড়ক পূজা
চৈত্রসংক্রান্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল চড়ক পূজা, যা একসময় চৈত্রসংক্রান্তির সবচেয়ে আলোচিত ও নাটকীয় লোকজ আচার ছিল। এই পূজাকে ঘিরে ভক্তরা কঠোর ব্রত পালন করতেন এবং শিবের সন্তুষ্টির জন্য শরীরকে কষ্ট দেওয়ার নানা আচার সম্পন্ন করতেন। ঐতিহ্যগতভাবে এই পূজায় কিছু অংশে শরীর বিদ্ধ করা, আগুনের উপর দিয়ে হাঁটা বা শরীরের চামড়ার সঙ্গে হুক গেথে ঝুলন্ত অবস্থায় ঘোরানোর মতো ভয়াবহ ও শারীরিকভাবে কষ্টকর আচার দেখা যেত, যা বিশ্বাস করা হতো আত্মশুদ্ধি ও পাপ মোচনের মাধ্যম হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গায় এই আচারগুলো কমে এসেছে বা পরিবর্তিত হয়েছে, তবে ইতিহাসে এর প্রভাব এখনো গভীরভাবে আলোচিত।
তবে এই চড়ক পূজার পেছনের কাহিনি মর্মান্তিক। যা শুনলে মানুষের মন আজও ভার হয়ে যায়। মূলত চৈত্র্যের শেষ দিনে জমিদার বাড়ির উঠানে আয়োজন করা হতো কবিগান, লাঠিখেলা ও হরিনাম সংকীর্তনের। যা কৃষিদেবতা হিসেবে লোকপালের লৌকিক খ্যাত। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মূল শিবের গাজনের সঙ্গে এর কোনো মিলই ছিল না। প্রজাদের আকৃষ্ট করতেই এসব আয়োজন করা হতো।
কারণ এ সময় সব প্রজার আসতেই হতো এখানে খাজনা দিতে। জমিদার বাড়ি থেকে আগেই ঘোষণা করা হতো যে, সালতামামির খাজনা সবটুকু শোধ করলে আলাদা করে কোনো সুদ লাগবে না। তাই দলে দলে মানুষ সেখানে উপস্থিত হতো। এ সুযোগে জমিদাররা একদিনে পুরো বছরের খাজনা আদায় করে ফেলতেন। অন্যদিকে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রজাদেরও দর্শন দিতেন বছরের ওই একটি দিনই।

পুরো খাজনা দিতে পারতেন না বেশিরভাগ প্রজা
তবে কতজন প্রজা দিতে পারতেন পুরো খাজনা। বেশিরভাগ প্রজা পুরোটা তো দূরে থাক অর্ধেক খাজনাও পরিশোধ করতে পারতেন না। তাদের কপালে ছিল ভয়াবহ শাস্তি। বাংলায় শুধু ব্রিটিশরাই শাসন আর শোষণ করেনি। পরবর্তীতে বাঙালি জমিদাররাও যেন ব্রিটিশদের ওই গুণ ধারণ করেছিলেন মনে-প্রাণে। সেই শাস্তিও ছিল ভয়ানক কঠিন।
ঋণে জর্জরিত কৃষক ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে চৈত্রের শেষ দিনে বড়শিতে বেঁধে চড়কে ঘোরানো হতো। যাকে এখন চড়ক পূজাও বলা হয়। লেখক আখতার উল আলম পূর্ববঙ্গের গ্রামে গ্রামে পেয়েছিলেন এ নিষ্ঠুরতার বর্ণনাগুলো। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও বরিশালের জমিদাররা তার মধ্যে অন্যতম। যদিও চড়ক সংক্রান্তিতে বড়শি ফোঁড়া বা বাণ ফোঁড়া ছিল প্রথমে অপেক্ষাকৃত নীচু সম্প্রদায়ের প্রথা। ব্রাহ্মণরা এতে অংশগ্রহণ করতেন না।
যেভাবে বন্ধ হয় এই চড়ক পূজা
কিন্তু খাজনা আদায় করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাস হওয়ার পর জমিদাররা এ প্রথা বাজেভাবে ব্যবহার করেন। ১৮০০ সালের দিকে শুরু হওয়া এ ভয়ানক শাস্তির প্রথা চলেছিল শতাব্দীর শেষ নাগাদ। ১৮৯০ সালের পর থেকে এ শাস্তি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৮৬৫ সালের দিকে ইংরেজরা এমন নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে চেয়েছিল। তবে তা সম্ভব হয়নি।
যদিও জনশ্রুতি আছে, বাংলায় এটা শুরু হয়েছিল ১৪৮৫ সালে, রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুরের আমলে। তখন তাদের রাজপরিবারেই এটি পালন করা হতো। পরে তা ছড়িয়ে যায় পূর্ববঙ্গের সব প্রদেশে। মহা ধুমধামে চৈত্রের শেষ দিনে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বৈশাখের প্রথম দু-তিন দিনব্যাপী চড়ক পূজার উৎসব চলতে থাকে।
খাজনার ভয়ে বহু প্রান্তিক কৃষক বাধ্য হতেন আত্মহত্যা করতেন
এমনিতেই চৈত্র মাস রুক্ষ্ম শুষ্ক মাস। এ সময় মানুষের বিশেষ কোনো কাজ থাকে না। মাঠ-ঘাট পানির অভাবে ফেটে চৌচির। সেখানে ফসল ফলানো অসম্ভব ছিল। আবার সারাবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা দুর্যোগ ছিল বাংলার সঙ্গী। তিন বেলা খাওয়ার মতো ফসল থাকত না ঘরে। সেখানে জমিদারের খাজনা পরিশোধ করা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে চেপে বসত কৃষকের পিঠে।
কিন্তু জমিদাররা প্রজাদের খাজনা জমা দেওয়ার শেষ দিন স্থির করেছিলেন সেই চৈত্রের ৩০ তারিখ। খাজনা দেওয়ার ভয়ে বহু প্রান্তিক কৃষক বাধ্য হতেন আত্মহত্যা করতেন। তবে পরবর্তীতে এই দিনটি বাংলার মানুষ উদযাপন করতেন আনন্দের দিন হিসেবেই। বছরের শেষ দিনটিতে তাদের প্রার্থনা থাকত সামনের বছর যেন ভালো যায়। সেজন্যই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নানান পূজার আয়োজন করতেন।
যে চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বাঙালির এত আয়োজন সেই চৈত্রের রয়েছে এক মর্মান্তিক ইতিহাস। শহরাঞ্চলে এখন চড়ক পূজা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। পহেলা বৈশাখ নিয়ে সবার আয়োজন থাকলেও চৈত্রসংক্রান্তি নিয়ে তেমন আয়োজন চোখে পড়ে না কোথাও। নিরাপত্তা, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের আচার অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। ফলে চৈত্রসংক্রান্তির সেই তীব্র লোকজ আবহও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
শহুরে জীবনে চৈত্রসংক্রান্তির তেমন আয়োজন নেই
শহুরে জীবনের ব্যস্ততা এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। কর্মদিবস, অফিস, ট্রাফিক জ্যাম, কাজের চাপ আর আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে মানুষ এখন লোকজ উৎসবের জন্য সময় বের করতে পারে না। আগে যে উৎসব পরিবারকে একত্র করত, এখন তা অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না চৈত্রসংক্রান্তির গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব।
তবে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি সবকিছু। কিছু গ্রামীণ এলাকায় এখনও সীমিত আকারে এই উৎসব পালিত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গবেষকরা চৈত্রসংক্রান্তি ও চড়ক পূজার ঐতিহ্য সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। তারা চাইছেন, এই উৎসবের মূল রূপ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও লোকবিশ্বাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে।
চৈত্রসংক্রান্তি তাই শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাংলার লোকজ ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়। আর চড়ক পূজা সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বিতর্কিত অংশ। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কিন্তু এই ঐতিহ্যের স্মৃতি এখনো আমাদের সংস্কৃতির গভীরে বেঁচে আছে।
কেএসকে