বেড়েছে নববর্ষের আনন্দ, কমেছে বাংলা ক্যালেন্ডারের চাহিদা
ছবি: এআই
বাংলা নববর্ষ এলেই বাঙালির জীবনে আনন্দের জোয়ার যেন উপচে পড়ে। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সাজসজ্জা, মেলা, শোভাযাত্রা সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর আবহ তৈরি হয় চারদিকে। কিন্তু এই একদিনের উচ্ছ্বাসের বাইরে বছরের বাকি সময়গুলোতে বাংলা তারিখের খবর রাখেন এমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ঘরে ঘরে একসময় যে বাংলা ক্যালেন্ডার ছিল অপরিহার্য, আজ তা প্রায় বিলুপ্তির পথে।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাত্র তিন-চার দশক আগেও প্রায় প্রতিটি বাঙালি পরিবারের দেয়ালে ঝুলত বাংলা দিনলিপি। দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজ বিয়ে, পূজা, ফসল তোলা কিংবা ভ্রমণ সবকিছুর সময় নির্ধারণে বাংলা তারিখ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ব্যবহার থাকলেও তা এতটা বিস্তৃত ছিল না। বরং বাংলা দিনপঞ্জিই ছিল সময় গণনার প্রধান ভরসা।
বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। ধারণা করা হয়, পনেরো শতকে হোসেন শাহী আমলে বাংলা তারিখের প্রাথমিক চর্চা শুরু হয়। সে সময় ইসলামি চন্দ্রপঞ্জিকার সঙ্গে সংস্কৃত পণ্ডিতদের সূর্যভিত্তিক গণনা পদ্ধতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি স্বতন্ত্র দিনলিপি। ফলে এতে যেমন চাঁদের গতিবিধির প্রভাব ছিল, তেমনি সূর্যের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এই দ্বৈত পদ্ধতির কারণে বাংলা ক্যালেন্ডার হয়ে ওঠে এক অনন্য সময় গণনার মাধ্যম।
গ্রামীণ জীবনে আজকের মতো মুদ্রিত বা রঙিন ক্যালেন্ডার ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির দেয়ালে দাগ কেটে দিন গোনা হতো। লোকজ সংস্কৃতিতে ‘একে চন্দ্র, দুয়ে পক্ষ, ছয়ে ঋতু, নয়ে নবগ্রহ’ এ ধরনের ছড়াও প্রচলিত ছিল, যা সময় ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের পরিচয় বহন করে। সূর্যের ছায়া দেখে দিন গণনার প্রথাও ছিল, যা প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক সরল প্রয়োগ।
পরবর্তীতে মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা ক্যালেন্ডার নতুন রূপ পায়। মূলত কৃষিজমি থেকে কর আদায়ের সুবিধার্থে তিনি একটি সুশৃঙ্খল পঞ্জিকা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। তার আমলে প্রবর্তিত ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ বাংলা সনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সম্রাটের জ্যোতির্বিদ ফতুল্লাহ সিরাজির তত্ত্বাবধানে তৈরি এই ক্যালেন্ডারে ইসলামি ও সংস্কৃত উভয় ধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়। মাস ও দিনের নামকরণে যেমন সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি ইসলামি ঐতিহ্যের ছোঁয়াও ছিল স্পষ্ট।
বাংলা ক্যালেন্ডারের গঠনেও রয়েছে প্রকৃতিনির্ভর বৈশিষ্ট্য। বছরে ছয়টি ঋতু গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত প্রতিটির জন্য নির্ধারিত হয়েছে দুইটি করে মাস। মাসগুলোর নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রের নাম অনুসারে, যেমন বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ইত্যাদি। এই নামগুলো শুধু সময়ের নির্দেশক নয়, বরং কৃষিকাজ, আবহাওয়া এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সপ্তাহের সাতটি দিনের নামও এসেছে জ্যোতিষশাস্ত্রের নবগ্রহ ধারণা থেকে, যদিও রাহু ও কেতুকে বাদ দিয়ে বাকি সাতটি গ্রহের নামে দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে বাংলা ক্যালেন্ডার শুধু একটি সময় মাপার পদ্ধতি নয়, বরং এটি জ্যোতির্বিজ্ঞান, কৃষি ও সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রতিফলন।
একসময় বাংলা ক্যালেন্ডার ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পঞ্জিকায় শুধু তারিখ নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, শুভ দিন-ক্ষণ, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবিও স্থান পেত। ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ এই প্রবাদটির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যেত এসব ক্যালেন্ডারে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্যালেন্ডারের রূপও বদলেছে। সাদাকালো দিনলিপি জায়গা করে দিয়েছে রঙিন ছবির ক্যালেন্ডারকে। ব্যবসায়ীরা হালখাতার সময় নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে ক্যালেন্ডার ছাপিয়ে বিতরণ করতে শুরু করেন যে প্রথা এখনো কিছুটা টিকে আছে।
তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ক্যালেন্ডারের ব্যবহার ক্রমেই কমে গেছে। আজকের ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন, ঘড়ি ও কম্পিউটার সহজেই তারিখ ও সময় জানিয়ে দেয়, কিন্তু তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইংরেজি ক্যালেন্ডারভিত্তিক। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাংলা তারিখ সম্পর্কে অবগত নয়।
বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, গত দুই দশকে বাংলা ক্যালেন্ডারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গ্রাম ও শহর উভয় জায়গাতেই এর ব্যবহার কমে এসেছে। নববর্ষ উদযাপন যতটা জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে, বাংলা দিনলিপির ব্যবহার ততটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিবর্তন আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা হয়তো অনেক সুবিধা অর্জন করেছি, কিন্তু হারিয়েছি আমাদের নিজস্ব সময় গণনার ঐতিহ্য। বাংলা ক্যালেন্ডার শুধু একটি দিনপঞ্জি নয়, এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার এক জীবন্ত দলিল।
তাই প্রয়োজন নতুন করে এই ঐতিহ্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। ডিজিটাল মাধ্যমেও বাংলা ক্যালেন্ডারের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে এ বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। কারণ, বাংলা তারিখের সঙ্গে আমাদের শিকড়ের সম্পর্ক গভীর এটি হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- আরও পড়ুন
৩২ বছর ধরে ডাকটিকিট সংগ্রহ করছেন চিকিৎসক মশিউর
হাজার বছর আগের মহামারি হাম, বছরে লাখ লাখ প্রাণহানি
কেএসকে