ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. স্বাস্থ্য

বিশ্ব চিকিৎসক দিবস

ভরসার নাম চিকিৎসক, চ্যালেঞ্জেরও শেষ নেই

জান্নাত শ্রাবণী | প্রকাশিত: ০৮:০০ এএম, ৩০ মার্চ ২০২৬

মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে যে হাতটি ভরসা হয়ে ওঠে, সেটি একজন চিকিৎসকের হাত। সাদা অ্যাপ্রোনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নির্ঘুম রাত, দায়িত্বের চাপ আর অসংখ্য না বলা গল্প।

বিশ্ব চিকিৎসক দিবসের এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যখাতের বাস্তবতা, চিকিৎসকদের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান। তার অভিজ্ঞতার আলোকে উঠে এসেছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়, যেখানে আছে সাফল্যের গল্প, তেমনি রয়েছে সংকট আর সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনের কথাও।

জাগো নিউজ: আপনি দীর্ঘ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?

মো. সাইদুর রহমান: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের একটি হলো ইপিআই, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, যার মাধ্যমে শিশুদের যক্ষ্মা, পোলিও, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, নিউমোনিয়া, হাম ও রুবেলার মতো ১০টি সংক্রামক ও প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষায় বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হয়।

মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও আমাদের সফলতা আছে। যদিও অনেক দিন ধরে অর্জনের গতি স্থির হয়ে আছে। কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয় প্রয়োজন। গড় আয়ু বৃদ্ধি আমাদের আরেকটি সফলতা।

সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমানছবি: সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান

অন্যদিকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য যে চিকিৎসা ব্যবস্থা সরকারি খাতে থাকা দরকার, সেটা আমাদের নেই। অবকাঠামো, জনবল, চিকিৎসা যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে রোগীর অনেক চাপ। তাছাড়া আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেকটাই বড় শহর বিশেষত ঢাকাকেন্দ্রিক। এসব হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ, তিনগুণ। এই পরিস্থিতিতে সন্তোষজনক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব নয়।

জাগো নিউজ: বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। আপনি ভেতর থেকে এ খাতটি দেখেছেন; সমস্যার মূল কারণগুলো কী বলে মনে করেন?

মো. সাইদুর রহমান: সেবার মান অসন্তোষজনক হওয়ার একটা বড় কারণ সক্ষমতার ঘাটতি। অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং আবশ্যক জনবলের ঘাটতি একটা কমন চিত্র। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আরেকটি কমন সমস্যা। পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা যায় না। এ অবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে ২৫০ শয্যার বিপরীতে রোগী থাকে ৪০০-৫০০ জন। এসব হাসপাতালে সব রোগীকে খাবার দেওয়াও সম্ভব হয় না। সুতরাং অসন্তোষের অভিযোগ স্বাভাবিক।

জাগো নিউজ: স্বাস্থ্যখাতে অনেক ভালো নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখা যায়। এই ‘পলিসি-ইমপ্লিমেন্টেশন গ্যাপ’ কেন তৈরি হয় বলে আপনি মনে করেন?

মো. সাইদুর রহমান: অনেক ক্ষেত্রে আইন, নীতিমালা প্রণয়নের সময় আমরা যতটা আন্তরিক থাকি বাস্তবায়নের সময় ততটা থাকি না। বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়, বাস্তবায়নকারীদের যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয় না, বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা থাকে। ফলে আইন, নীতিমালার ফলাফল অসুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। সময়ের সাথে সাথে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকারের পরিবর্তন হয়। এটিও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার একটা কারণ হতে পারে।

জাগো নিউজ: বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি এখনও। আপনার মতে, সরকার কীভাবে একটি টেকসই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে?

মো. সাইদুর রহমান: আমাদের স্বাস্থ্যসেবার একটা বড় অংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। এখানে আমাদের সমন্বয়ের ঘাটতি আছে। যেমন-অনেক হাসপাতাল-ক্লিনিকের লাইসেন্স নেই। সরকারের অনুমোদন ছাড়াই চালানো হচ্ছে সব কার্যক্রম। লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া, লাইসেন্সের শর্ত, একাধিক মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণ- সার্বিকভাবে জটিল প্রক্রিয়া। ফলে বিপুল সংখ্যক হাসপাতাল-ক্লিনিক অনুমোদন ছাড়া রয়ে গেছে। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণ কোনোটাই সম্ভব নয়। আগে অনুমতি প্রদান, তারপর পর্যবেক্ষণ। তখন আর্থিক বিষয়সহ সবকিছু দেখার সুযোগ থাকবে।

জাগো নিউজ: গ্রাম ও শহরের মধ্যে চিকিৎসকের বৈষম্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। দায়িত্বে থাকাকালে এই সমস্যার সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং এখন কী করা উচিত?

মো. সাইদুর রহমান: ভালো সেবা দেওয়ার জন্য কাঙ্ক্ষিত পদায়ন গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক দায়বদ্ধতাসহ অনেক কিছু এর সাথে সংশ্লিষ্ট। সে কারণে বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য। ক্যারিয়ার বা সন্তানের পড়ালেখার জন্য ঢাকা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে পদায়নের ইচ্ছা অনেকেরই থাকে। কিন্তু একবার যিনি আসেন তিনি সেখানেই থেকে যাওয়ায়, দূরবর্তী স্থানে যিনি সেবা দেন তারপক্ষে আর কাঙ্ক্ষিত এসব কর্মক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ হয় না। তারা বঞ্চিতই থেকে যান। কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, বরগুনা, ভোলা কিংবা দুর্গম পার্বত্য এলাকায় একবার পোস্টিং হলে উঠে আসা কঠিন। ফলে রিমোট উপজেলাগুলোতে সব সময় জনবলের সংকট থাকে।

এসব ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া যেমন অতিরিক্ত ভাতা প্রদান, পদোন্নতি কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর পরবর্তী কাঙ্ক্ষিত পদায়নের বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া- এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। অটোমেশন প্রক্রিয়ায় পদায়নের একটা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা অনুসরণ করা হলে এ বঞ্চনা দূর হবে বলে আশা করা যায়।

জাগো নিউজ: চিকিৎসা তো একটি সেবাদানের প্রক্রিয়া, এক্ষেত্রে সেবাদানকারীরা কি করলে সেবাগ্রহীতারা সন্তুষ্ট হবে বলে আপনার মনে হয়?

মো. সাইদুর রহমান: সন্তুষ্টি আসলে দুই প্রান্তেই থাকতে হবে। সেবাদানকারী ও সেবাগ্রহীতা দুদিক থেকেই সন্তুষ্টি থাকা জরুরি। বিশ্ব চিকিৎসক দিবসে আমি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই চিকিৎসকদের, যারা কোভিডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে জীবন বাজি রেখে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। নিবেদিতভাবে সেবা দেওয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ, নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

একজন চিকিৎসক, নার্স বা সেবাদাতা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও অসুস্থ হন। তারাও তো কোথাও না কোথাও চিকিৎসা সেবা নিতে যান। নিজেরা সেবা নিতে গিয়ে যেমন সেবা আশা করেন, ঠিক সেভাবেই আপনার কাছে আসা রোগী বা সেবা গ্রহীতাকে সেবা দিন। তাহলেই প্রকৃত সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে। আশানুরূপ সেবা দেওয়া হবে।

সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির কাছ থেকে অসুস্থ মানুষের প্রত্যাশা ভালো চিকিৎসা, ভালো ব্যবহার তার কষ্টের কথাগুলো শোনা এবং তার অবস্থা অবহিত করা। কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির মিল থাকে না। আন্তরিকতার মাধ্যমে উভয় পক্ষের এ গ্যাপ কমিয়ে আনা সম্ভব।

আরও পড়ুন: 

জাগো নিউজ: ভুয়া ডাক্তার ও অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্তার রোধে অতীতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল? এ সমস্যা সমাধানে কী ধরনের কঠোর পদক্ষেপ জরুরি?

মো. সাইদুর রহমান: অনেক হাসপাতাল/ক্লিনিকের লাইসেন্সই নেই। লাইসেন্সবিহীন অর্থাৎ অনুমোদনবিহীন একটা ক্লিনিকের জনবল সঠিক না বেঠিক তা দেখার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আগে সব প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের আওতায় আনতে হবে। তারপর তার জনবলসহ অনেক বিষয়গুলো দেখা যেতে পারে। অনুমোদনের অনুপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সেবাপ্রদান কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।

ছবি: সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমানছবি: সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান

জাগো নিউজ: স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। আপনার অভিজ্ঞতায় এখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় বাধা কী এবং তা কাটিয়ে উঠতে কী করা দরকার?

মো. সাইদুর রহমান: সুশাসনের সবচেয়ে বড় বাধা হলো অসচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব। স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, প্রকল্প বাস্তবায়ন -এসব বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, ই-ডিজিটাল সিস্টেম চালু করতে হবে এবং অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ে পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেনাকাটা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন উপযুক্ত কর্মকর্তাকে পদায়ন এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে অভিযোগের সংখ্যা কমে আসবে।

জাগো নিউজ: বর্তমানে টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। আপনি কীভাবে দেখছেন এই পরিবর্তন? এটি বাস্তবিকভাবে কতটা কার্যকর হতে পারে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে?

মো. সাইদুর রহমান: আমাদের এখনো ১০ টাকার টিকিট কাটতে কিংবা প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার টাকা জমা দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অসুস্থ মানুষের হয়রানি লাঘবে এবং চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে রেফারাল হাসপাতাল পর্যন্ত সব পর্যায়ে ডিজিটালাইজেশন কার্যকর অগ্রাধিকারভিত্তিতে চালু করতে হবে।

বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী জিপি মডেল, ডিজিটালাইজেশন, হেলথ কার্ড প্রবর্তনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় বাস্তবায়ন হলে সব ধরনের পেমেন্ট সিস্টেম সহজীকরণ, ই-প্রেসক্রিপশন ও টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা চালু, সার্জারির জন্য রোগীর হাসপাতালে অবস্থানকালে হ্রাস, ক্রয় প্রক্রিয়া, পদায়ন ও পদোন্নতিসহ সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দেশে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

এসইউজে/জেএস/এমএমএআর/এমএফএ

আরও পড়ুন