ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. লাইফস্টাইল

ঈদ প্রস্তুতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ

জান্নাত শ্রাবণী | প্রকাশিত: ০৩:০০ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬

ঈদকে ঘিরে রমজানের শেষভাগে সবার ব্যস্ততা যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কেনাকাটা, ঘর গোছানো, রান্নার প্রস্তুতি, অতিথি আপ্যায়নের পরিকল্পনা সব মিলিয়ে দিনগুলো কাটে দৌড়ঝাঁপের মধ্যেই। এই ব্যস্ততার মাঝে অনেকেই নিজের শরীরের দিকে তেমন খেয়াল রাখতে পারেন না। ফলে ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা কিংবা হজমের সমস্যার মতো নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই ঈদের আনন্দ যেন অসুস্থতায় ম্লান না হয়ে যায়, সে জন্য আগে থেকেই কিছু স্বাস্থ্যসতর্কতা মেনে চলা জরুরি।

রমজানের শেষভাগে শরীরের যত্ন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. সাকিয়া হক। তিনি রমজানের শেষভাগে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।

ছবি: বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. সাকিয়া হকছবি: বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. সাকিয়া হক

জাগো নিউজ: রমজানের শেষ দিকে এসে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন বেশি দেখা যায়?
ডা. সাকিয়া হক: রোজার প্রায় তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলে শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে অনেকের দুর্বলতা, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা বা অবসাদ দেখা দিতে পারে। আবার ঘুমের সময়সূচি বদলে যাওয়ায় ক্লান্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দেয়। রমজানের শেষ দশকে রাত জাগা বাড়ে। ইবাদত, কেনাকাটা বা বিভিন্ন কাজে রাতের ঘুম কম হয়ে যায়। এতে শরীরের বিশ্রাম কমে যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কিছুটা দুর্বল হতে পারে।

জাগো নিউজ: এই সময় হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি কোন সমস্যাগুলো নিয়ে রোগীরা আসেন?
ডা. সাকিয়া হক: রমজানের শেষভাগে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি যেসব সমস্যা নিয়ে রোগীরা আসেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, অ্যাসিডিটি, মাথা ঘোরা, পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, পেটব্যথা বা ডায়রিয়া। অনেক সময় ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণে হজমের সমস্যা দেখা দেয়। আবার অনেকে দিনের বেলা পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ায় ডিহাইড্রেশনে ভোগেন।

জাগো নিউজ: রমজানের শেষভাগে ইফতার ও সেহরিতে কী ধরনের খাবার রাখা উচিত?
ডা. সাকিয়া হক: রমজানের শেষভাগে শরীর সুস্থ রাখতে ইফতার ও সেহরিতে সুষম খাবার রাখা খুবই জরুরি। ইফতারে প্রথমে পানি বা লেবুর শরবত দিয়ে রোজা ভাঙা ভালো। এরপর খেজুর, ফল, ছোলা, সালাদ ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়া উচিত। সেহরিতে ভাত, ডাল, সবজি, ডিম বা মাছের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা ভালো। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, যেন সারাদিন শরীর পানিশূন্য না হয়ে পড়ে।

জাগো নিউজ: যারা ঈদের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, খাবার সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে কী পরামর্শ দেবেন?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদ সামনে রেখে অনেকেই আগে থেকেই বিভিন্ন খাবার তৈরি বা সংরক্ষণ করেন। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা খুবই জরুরি। খাবার পরিষ্কার পরিবেশে তৈরি করতে হবে এবং রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত। দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে দেওয়া খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা করে রাখা উচিত, যাতে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

ছবি: বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. সাকিয়া হকছবি: বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. সাকিয়া হক

জাগো নিউজ: ঈদের কেনাকাটার ভিড়, দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা এসবের কারণে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের আগে বাজারে বা শপিংমলে অনেক ভিড় থাকে। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা, গরমে হাঁটাহাঁটি করা বা পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার কারণে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এ সময় পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, হিট এক্সহসশন বা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই বাইরে বের হলে সঙ্গে পানি রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: গরমে বাইরে বের হলে কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়?
ডা. সাকিয়া হক: গরমে বাইরে বের হলে হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা ভালো। ছাতা ব্যবহার করা যেতে পারে। যথাসম্ভব দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা উচিত। বাইরে গেলে নিয়মিত পানি পান করতে হবে এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে।

জাগো নিউজ: যারা সারাদিন বাজার বা রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকেন, তারা কীভাবে শক্তি ধরে রাখবেন?
ডা. সাকিয়া হক: যারা বাজার করা, রান্না বা ঘরের কাজে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন, তাদের জন্য শরীরের শক্তি ধরে রাখা জরুরি। সেহরিতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে শরীরের ক্লান্তি কমে।

জাগো নিউজ: পা ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি হলে কী করণীয়?
ডা. সাকিয়া হক: এ ধরনের সমস্যা হলে প্রথমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি বা ওরস্যালাইন পান করা যেতে পারে। যদি মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা বেশি হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জাগো নিউজ: রমজানের শেষ দশকে রাত জাগা বাড়ে এতে শরীরের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
ডা. সাকিয়া হক: রমজানের শেষ দশকে অনেকেই ইবাদত বা অন্যান্য কারণে রাত জাগেন। এতে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রে পরিবর্তন আসে। ঘুম কম হলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মনোযোগের ঘাটতি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ছবি: বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. সাকিয়া হকছবি: বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. সাকিয়া হক

জাগো নিউজ: ঈদের আগের ব্যস্ততায় ঘুমের ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা যায়?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের আগের ব্যস্ততায় ঘুম কম হলে দিনের বেলা সুযোগ পেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। রাতে অন্তত কয়েক ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করা শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগীরা ঈদের সময় কীভাবে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করবেন?
ডা. সাকিয়া হক: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঈদের সময় বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। মিষ্টি বা অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার সীমিত পরিমাণে খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা জরুরি।

জাগো নিউজ: ঈদের মিষ্টি ও ভারী খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের জন্য কী সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের দিনে অনেকেই মিষ্টি, সেমাই বা ভারী খাবার বেশি খেয়ে ফেলেন। এতে হজমের সমস্যা, রক্তে শর্করা বৃদ্ধি বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তাই এসব খাবার অল্প পরিমাণে খাওয়া এবং ফল বা হালকা খাবারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া ভালো।

জাগো নিউজ: ওষুধের নিয়ম যেন ব্যাহত না হয় এ জন্য কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের ব্যস্ততায় অনেক সময় ওষুধ খাওয়ার সময়সূচি বদলে যায়। তাই আগে থেকেই ওষুধ সঙ্গে রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার বিষয়টি মনে রাখা জরুরি।

জাগো নিউজ: ভ্রমণের সময় কোন কোন মেডিসিন সাথে রাখা উচিত?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের ছুটিতে অনেকে ভ্রমণে যান। ভ্রমণের সময় কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত। যেমন: প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড, ডায়রিয়ার ওষুধ, ওরস্যালাইন, অ্যালার্জির ওষুধ ইত্যাদি। একই সঙ্গে কিছু ইমার্জেন্সি কিট রাখা উচিত, যেন কোন দুর্ঘটনা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

জাগো নিউজ: ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের কী সতর্কতা নেওয়া দরকার?

ডা. সাকিয়া হক: যাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাদের ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন সঙ্গে রাখা উচিত।

জাগো নিউজ: গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য ঈদের প্রস্তুতির সময় কী সাবধানতা জরুরি?
ডা. সাকিয়া হক: গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিশ্রম করা ঠিক নয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জাগো নিউজ: এক মাস সংযমের পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে কী সমস্যা হতে পারে?
ডা. সাকিয়া হক: এক মাস সংযমের পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার খেলে হজমের সমস্যা, বমি, পেটব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে এবং পরিমিত খাবার খাওয়াই ভালো।

জাগো নিউজ: মানসিক চাপ কমিয়ে সুস্থভাবে ঈদ উদযাপনের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের প্রস্তুতির সময় অনেকেই অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন। কিন্তু ঈদ আনন্দের উৎসব, তাই অযথা চাপ না নিয়ে কাজগুলো ভাগ করে করা ভালো। পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিলে চাপ অনেকটাই কমে।

জাগো নিউজ: ঈদের দিন স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে দিনের খাবারের সুষম পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের দিন খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুষম পরিকল্পনা রাখা ভালো। সকালে হালকা নাশতা, দুপুরে পরিমিত খাবার এবং রাতে অপেক্ষাকৃত হালকা খাবার খেলে শরীর সুস্থ থাকে।

আরও পড়ুন: 

জাগো নিউজ: হঠাৎ বমি, পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হলে ঘরে বসে কী প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়?
ডা. সাকিয়া হক: ঈদের দিনে হঠাৎ বমি, পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হলে প্রথমে ওরস্যালাইন পান করা উচিত। হালকা খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। তবে সমস্যা বেশি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

জাগো নিউজ: রমজানের শেষভাগ ও ঈদকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের জন্য আপনার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবার্তা কী?
ডা. সাকিয়া হক: ইফতার ও সেহরিতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং পানিশূন্যতা এড়িয়ে চলতে হবে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাবার কম খেতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অসুস্থতা বা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সচেতনতা বজায় রাখলে রমজানের শেষভাগ এবং ঈদের আনন্দ দুটোই সুস্থভাবে উপভোগ করা সম্ভব।

জাগো নিউজ: আপনার দারুণ সব পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ।
ডা. সাকিয়া হক: আপনাকেও ধন্যবাদ সুন্দর এই আয়োজনের জন্য।

জেএস/

আরও পড়ুন