দেশে প্রথমবার প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব
প্রাণীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জীবিকা সুরক্ষা এবং জুনোটিক রোগের ঝুঁকি কমাতে দেশে প্রথমবারের মতো প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে ‘Together for Health: Stand with Science’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এক কর্মসূচিতে এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচির আয়োজন করে আইসিডিডিআর,বি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। অনুষ্ঠানে ‘Guidance for Effective Vaccination Management for Livestock, Poultry and Pets in Bangladesh’ শীর্ষক নির্দেশিকার চূড়ান্ত ধাপ উপস্থাপন করা হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (প্রশাসন) পরিচালক বয়জার রহমান বলেন, দেশে প্রাণীর টিকা উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ। টিকাদান ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।
দেশের প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও টিকাদানের হার এখনও কম। জানা গেছে, গ্রামের কৃষকদের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ নিয়মিতভাবে তাদের প্রাণীদের টিকা দিয়ে থাকেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, মানুষের জন্য সফল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও প্রাণীর জন্য এখনো সমন্বিত জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সচেতনতার অভাব, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ, শীতলীকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকার অনিয়মিত সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি জনবলের ঘাটতি—এসব কারণে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ওয়ান হেলথ ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাণীর টিকাদান শুধু প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নয়, বরং পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এ বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে।
বাংলাদেশকে উদীয়মান সংক্রামক রোগের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে তারা বলেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সংক্রামক রোগই জুনোটিক। উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্ব, মানুষ ও প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, জীবন্ত পশুপাখির বাজার এবং দ্রুত নগরায়ণ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, গবাদিপশু, পোলট্রি ও পোষা প্রাণীর জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ টিকাদান ব্যবস্থার অংশ হিসেবে টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কার্ডে প্রাণীর পরিচিতি, টিকাদানের ইতিহাস এবং সময়সূচি সংরক্ষণ করা হবে, যা টিকাদান কার্যক্রমের নজরদারি ও সমন্বয়কে আরও কার্যকর করবে।
আইসিডিডিআর,বি-এর ওয়ান হেলথ রিসার্চ ইউনিটের বিজ্ঞানী ডা. সুকান্ত চৌধুরী বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকরা সহজে টিকাদান ট্র্যাক করতে পারবেন, কাভারেজ বাড়বে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার হবে। এতে প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, টিকাদান ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে রোগের বোঝা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় সহায়তা করবে।
গোলটেবিল আলোচনার শেষে অংশগ্রহণকারীরা একটি সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক প্রাণী টিকাদান ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সম্মিলিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, যা ওয়ান হেলথ উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এসইউজে/এমআইএইচএস