নির্বাচন পেছানোর জন্যই কি ট্রাম্পের এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’?
ভেনেজুয়েলায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করা, ইরানে ধ্বংসাত্মক হামলার হুমকি দেওয়া এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে ‘যে কোনো উপায়ে’ দখলের ঘোষণা— গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। তার এই যুদ্ধংদেহী মূর্তির আড়ালে কি আসলে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কোনো নীলনকশা কাজ করছে? খোদ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনেই এখন বড় প্রশ্ন— আসন্ন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া বা বাতিলের পথ তৈরি করতেই কি ট্রাম্প এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ শুরু করেছেন?
ভেনেজুয়েলা: সামরিক অভিযান ও তেলের নিয়ন্ত্রণ
গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর এক ঝটিকা অভিযানে কারাকাস থেকে বন্দি করা হয় মাদুরো ও তার স্ত্রীকে। এরপরই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘যতদিন না একটি বিচারিক উত্তরণ ঘটছে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা চালাবে।’ এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে বলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো তীব্র সমালোচনা করলেও ট্রাম্প তাতে কর্ণপাত করছেন না। বরং তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এখন মার্কিন স্বার্থেই ব্যবহৃত হবে।
গ্রিনল্যান্ড ও ইরান: নতুন ফ্রন্ট
ভেনেজুয়েলা অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের নজর পড়েছে গ্রিনল্যান্ডের দিকে। গত ১২ জানুয়ারি তিনি সরাসরি হুমকি দিয়েছেন, রাশিয়া বা চীনের হাত থেকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো উপায়ে গ্রিনল্যান্ড দখলে নেবে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব’ ও ‘ন্যাটো ধ্বংসকারী’ বলে অভিহিত করলেও হোয়াইট হাউজ শুল্ক আরোপের পাল্টা হুমকি দিয়ে রেখেছে।
আরও পড়ুন>>
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে অনড় ট্রাম্প, বললেন পিছু হটার সুযোগ নেই
ট্রাম্পের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে পারবে ইউরোপ?
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের এত আগ্রহ কেন?
অন্যদিকে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে ট্রাম্প তেহরানকে ‘কঠোর আঘাত’ করার হুমকি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ আরও চড়িয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও অস্থিরতা
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ক্যালিফোর্নিয়া, মিনেসোটা এবং ইলিনয়ের মতো ডেমোক্র্যাটশাসিত রাজ্যগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন এবং শুল্ক প্রয়োগকারী বাহিনী আইসিই’র তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। একে তিনি ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ ও ‘অপারেশন মিডওয়ে ব্লিৎজ’ নামে অভিহিত করছেন। তবে এই অভিযানের ধরনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি দেখছেন বিশ্লেষকরা:
সামরিক কায়দায় অভিযান: মিনিয়াপোলিস ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরগুলোতে মাস্ক পরা ফেডারেল এজেন্টরা টিয়ারগ্যাস এবং অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের এলাকায় ভীতি ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি মিনিয়াপোলিসে রেনে গুডস নামে এক মার্কিন নারী আইসিই এজেন্টের গুলিতে নিহত হন। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভকে ট্রাম্প ‘ইনসারেকশন’ বা বিদ্রোহ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইনসারেকশন অ্যাক্ট-এর হুমকি: রাজ্য গভর্নরদের আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ‘শান্তি ফিরিয়ে আনতে’ তিনি ওইসব রাজ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য ১৮০৭ সালের ‘ইনসারেকশন অ্যাক্ট’ প্রয়োগ করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরাসরি ডেমোক্র্যাট গভর্নরদের ক্ষমতা খর্ব করার একটি চেষ্টা।
ভোটকেন্দ্রে ভীতি প্রদর্শন: শিকাগো ও পোর্টল্যান্ডের মতো শহরগুলোতে আইসিই এজেন্টদের এই ব্যাপক উপস্থিতি আসলে ২০২৬-এর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট সমর্থক ও অভিবাসী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রাখার একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক কৌশল’ বলে মনে করছে বিশ্লেষকদের একাংশ।
আরও পড়ুন>>
ইরানকে ‘সামলাতে’ রওয়ানা দিয়েছে মার্কিন রণতরী
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ/ ইরান ভেনেজুয়েলা নয় যে সহজে জিতবেন ট্রাম্প
ট্রাম্প হুমকি দিলেও ইরানে হামলা চালানো যে কারণে কঠিন
নির্বাচন পেছানোর জন্যই এত কিছু?
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে জানুয়ারির শুরুতেই হাউজ অব রিপাবলিকানদের এক সভায় ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ‘ডেমোক্র্যাটদের পলিসি এতই খারাপ যে তাদের বিরুদ্ধে ভোট হওয়ারই দরকার নেই, নির্বাচন বাতিল করা উচিত।’ যদিও পরে তিনি একে ‘কৌতুক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু রাজনৈতিক বোদ্ধারা একে হালকাভাবে নিচ্ছেন না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এসএসআরএস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেই নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এ জরিপ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ঘনিষ্ঠ মহলে নিজের হতাশা প্রকাশ করেন। এমনকি, নির্বাচনে হারলে অভিশংসনের মুখে পড়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
চলতি মাসের শুরুতে হাউজ রিপাবলিকান সভায় এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বুঝতেই পারছি না—জনগণের মনে আসলে কী চলছে।’ পরে তিনি যোগ করেন, ‘‘আমি বলবো না—‘নির্বাচন বাতিল করে দাও’। কারণ তখন ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলো বলবে, আমি নির্বাচন বাতিল করতে চাই, আমি স্বৈরশাসক।’’
তবে এই মন্তব্যের পরও রয়টার্সকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, রিপাবলিকানরা এতটাই সফল যে, ‘ভাবলে দেখা যায়, আমাদের তো নির্বাচনই করা উচিত নয়।’
হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট পরে দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট ‘মজা করে’ ও ‘ব্যঙ্গাত্মকভাবে’ এই মন্তব্য করেছেন।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এটি নতুন কিছু নয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক যৌথ উপস্থিতিতে ট্রাম্প ইউক্রেনে যুদ্ধকালীন সামরিক আইন থাকায় নির্বাচন না হওয়ার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ চললে যদি নির্বাচন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদেরও যদি যুদ্ধ হয়—তাহলে কি নির্বাচন হবে না? ওটা তো ভালোই।’
সে সময় তার এই কথায় উপস্থিত অনেকে হেসে ওঠেন।
কী চান ট্রাম্প?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আগ্রাসী কৌশলের পেছনে তিনটি মূল কারণ থাকতে পারে:
১. জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি: যুদ্ধ বা মারাত্মক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ট্রাম্প দেশে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতে পারেন, যা তাকে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সাহায্য করবে।
২. জনগণের নজর ঘোরানো: দেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি এবং ডেমোক্র্যাটদের ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন থেকে ভোটারদের দৃষ্টি সরিয়ে ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘বৈশ্বিক আধিপত্যের’ দিকে নিতেই এই রণকৌশল।
৩. ইলেকটোরাল ইন্টিগ্রিটির প্রশ্ন: ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন যে মেইল-ইন ব্যালট বা বর্তমান পদ্ধতিতে ভোট হলে তা ‘চুরি’ হবে। যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে তিনি ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া নিজের অনুকূলে ঢেলে সাজাতে পারেন।
ডেমোক্র্যাট ও মিত্রদের উদ্বেগ
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতারা ট্রাম্পকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিয়ে বলছেন, তিনি আসলে নির্বাচনের ভয় পাচ্ছেন। ওদিকে ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোও আতঙ্কিত। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন হামলা হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার সমাপ্তি।
আরও পড়ুন>>
অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে নারী নিহত, বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র
২০২৬ সালে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হবে ট্রাম্প প্রশাসন
যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশি সরকারি সহায়তা নেয়: ট্রাম্প
নির্বাচন বাতিল সম্ভব?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত করার কোনো ক্ষমতা নেই। আইন অনুসারে, নতুন কংগ্রেসকে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নিতে হবে। নির্বাচন দিবস আইন দিয়ে নির্ধারিত। কংগ্রেস চাইলে তাত্ত্বিকভাবে তারিখ পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু নির্বাচন বাতিলের সুযোগ নেই।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। বড় কোনো দুর্যোগের ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্য সরকার নিজ নিজ নির্বাচনের সময়সূচি পরিবর্তন করতে পারে—এমন তাত্ত্বিক সম্ভাবনা থাকলেও। তবে জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচন বাতিলের কোনো নজির নেই।
ফলে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলেই কোনো বড় যুদ্ধের দিকে পা বাড়াচ্ছেন, নাকি এই সবকিছুই কেবল ২০২৬-এর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কোণঠাসা করার একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান’, তা নিয়ে বিতর্ক আপাতত থামছে না। ওয়াশিংটনের অলিন্দে এখন একটাই গুঞ্জন—যুদ্ধে জয় আসুক বা না আসুক, ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য সম্ভবত হোয়াইট হাউজের গদি ও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণকে দীর্ঘস্থায়ী করা। তার কারণে পরিস্থিতি যদি আরও উত্তপ্ত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র এক অভূতপূর্ব সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, টাইম, ইউএসএ টুডে, এনবিসি নিউজ
কেএএ/