দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
ইরানের কাছে কী চায় যুক্তরাষ্ট্র?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি আলোচনার টেবিলে না আসে, তবে দেশটির বিরুদ্ধে বিমান হামলা কিংবা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। গত এক মাসে ট্রাম্পের একের পর এক আগ্রাসী বক্তব্য ও হঠাৎ অবস্থান বদল যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ককে আবারও উত্তেজনার চূড়ায় নিয়ে গেছে।
মাত্র এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এই সম্পর্ক কখনো সমঝোতার পথে গেছে, কখনো চুক্তি ভেঙেছে, ঘটেছে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড ও নজিরবিহীন বিমান হামলা। গত ৩১ দিনের ঘটনাপ্রবাহ সেই অস্থিরতারই প্রতিফলন। দেখে নেওয়া যাক গত এক মাসে ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে কী কী বলেছেন-
২৯ ডিসেম্বর
ফ্লোরিডায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান আবার অস্ত্র তৈরি শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভয়াবহভাবে আঘাত হানবে’। তার কথায়, এর পরিণতি আগের চেয়েও শক্তিশালী হবে। এ বক্তব্যের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার আহ্বান জানান।
আরও পড়ুন>>
সময় ফুরিয়ে আসছে: ইরানকে সতর্ক করলেন ট্রাম্প
বন্দুকের ট্রিগারে আঙুল রেখে প্রস্তুত ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতন, ১ ডলারে মিলছে ১৫ লাখ
২ জানুয়ারি
ইরানে সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ শুরু হলে ট্রাম্প বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে’। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। ইরানি মুদ্রার নজিরবিহীন অবমূল্যায়ন থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।
৬ জানুয়ারি
‘মেক ইরান গ্রেট এগেইন’ লেখা একটি টুপি পরে ট্রাম্পের ছবি প্রকাশ করা হয়। তিনি আবারও বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। একই সময়ে ইরানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষের মৃত্যুর খবর আসে।
১০ জানুয়ারি
বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাওয়ার খবরের মধ্যে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত। এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার সতর্ক করে দেন, হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ সশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।
১৩ জানুয়ারি
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প, যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ পায়নি। তিনি এক পর্যায়ে দাবি করেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহী, আবার পরে জানান সব বৈঠক বাতিল করেছেন। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাহায্য আসছে।
১৪ জানুয়ারি
হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর ও মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার মধ্যেও ট্রাম্প বলেন, ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে এবং মৃত্যুদণ্ডের পরিকল্পনা নেই। জানা যায়, ইরানে হামলার বিভিন্ন বিকল্প তিনি পর্যালোচনা করলেও কোনো একক পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হননি। মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের চাপেও তখন হামলা থেকে বিরত থাকে ওয়াশিংটন। পরে কঠোর দমননীতির কারণে বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে যায়।
২২ জানুয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর কথা জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য’ এগুলো সেখানে যাচ্ছে। বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা তখন পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
২৮ জানুয়ারি
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহর মোতায়েনের পর ট্রাম্প সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে ইরানকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ইরানকে অবশ্যই চুক্তি করতে হবে এবং দেশটি কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। এই বক্তব্যে বিক্ষোভ বা মানবাধিকার প্রসঙ্গ আর উল্লেখ করা হয়নি; বরং পুরোপুরি পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি একটাই—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন চুক্তিতে সম্মত হয়। আর সেই লক্ষ্য পূরণে ওয়াশিংটন সামরিক চাপসহ সব বিকল্প খোলা রাখছে বলেই স্পষ্ট হচ্ছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/