বিবিসির প্রতিবেদন
বিএনপিশাসিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারবে ভারত?
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান/ ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল
বাংলাদেশে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস জয় পাওয়ার পর নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া ছিল পরিমিত, কিন্তু উষ্ণ। বাংলা ভাষায় দেওয়া এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘চূড়ান্ত বিজয়’-এর জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রতিবেশী বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। পাশাপা, দুই দেশের ‘বহুমাত্রিক সম্পর্ক’ আরও জোরদারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী।
বার্তাটি ছিল ভবিষ্যতমুখী এবং সতর্ক।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেন–জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে। তার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা হাসিনাকে দিল্লি সমর্থন দিয়েছিল। এটি সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা ও উত্তেজক বক্তব্যের পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশিদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। বর্তমানে ভিসা সেবা প্রায় স্থগিত, বাস-ট্রেন চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা–দিল্লি ফ্লাইটও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দিল্লির সামনে চ্যালেঞ্জ
ভারতের কাছে এখন প্রশ্নটি ‘সম্পর্ক করবে কি না’—তা নয়; বরং ‘কীভাবে করবে’। একদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহ ও উগ্রবাদ দমনে নিজেদের ‘রেড লাইন’ সুরক্ষিত রাখা, অন্যদিকে উত্তপ্ত রাজনৈতিক বক্তব্য প্রশমিত করা—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই নয়াদিল্লির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব—তবে তার জন্য উভয় পক্ষের সংযম ও পারস্পরিক আস্থার প্রয়োজন।
আরও পড়ুন>>
তারেক রহমানকে মোদীর অভিনন্দন
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে ভারত: মোদী
বাংলাদেশে বিএনপির জয়, আশার আলো দেখছেন কলকাতার ব্যবসায়ীরা
লন্ডনের এসওএএস ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ ও তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি দল। তবে প্রশ্ন হলো, তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন। তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছেন। কিন্তু এটি বলা যত সহজ, করা ততটা নয়।
অতীতের ছায়া
দিল্লির কাছে বিএনপি অপরিচিত নয়।
২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি–জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত শীতল হয়ে পড়ে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের সহায়তা বন্ধ করা এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা—এই দুই বিষয় ছিল নয়াদিল্লির প্রধান উদ্বেগ।
২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনা সম্পর্কে বড় ধাক্কা দেয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও টাটা গ্রুপের তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্যাসমূল্য নিয়ে জটিলতায় আটকে যায়।
সম্পর্কের অবনতি ক্রমশ বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে খালেদা জিয়া যখন বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন, তখন নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে একটি পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন। এই ঘটনা দিল্লির প্রতি ব্যাপক অবজ্ঞা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটই ব্যাখ্যা করে ভারত পরে কেন শেখ হাসিনার ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। তার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে দিল্লি পায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, সংযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চীন-প্রভাবের ভারসাম্য।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর
হাসিনার পতনের পর ঢাকা দ্রুত ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। ১৪ বছর পর ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর হয়েছে ১৩ বছর পর। সামরিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগও বেড়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই পারে। তবে ভারসাম্য হারালে তা নতুন সন্দেহ তৈরি করতে পারে।
দিল্লি-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের স্মৃতি পট্টনায়েক বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক থাকা আমাদের উদ্বেগের বিষয় নয়। একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে তাদের সেই অধিকার আছে। হাসিনার আমলে যা অস্বাভাবিক ছিল তা হলো, সংশ্লিষ্টতার প্রায় অনুপস্থিতি। পেন্ডুলাম একদিকে অনেক বেশি ঘুরে গিয়েছিল; এখন অন্য দিকেও অনেক বেশি ঘুরে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখাও করেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে বিএনপি নেতা ঘোষণা করেছেন: ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়- সবার আগে বাংলাদেশ’। তার এই বক্তব্য ভারত ও পাকিস্তানের প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকার ইঙ্গিত দেয়।
হাসিনার নির্বাসন: বড় বাধা
বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সহিংস দমন-পীড়নে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন তিনি। তবে ভারত তাকে প্রত্যর্পণ না করা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হাসিনার উপস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের ভারতে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি দিল্লির জন্য স্পর্শকাতর হয়ে থাকবে।
‘দিল্লি যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করতে চায়, তাহলে তা হবে কঠিন। হাসিনার নির্বাচন-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনগুলো বিভ্রান্তিকর ছিল। তিনি যদি অনুশোচনার ইঙ্গিত না দেন বা নেতৃত্বের পরিবর্তনের জন্য সরে না যান, তাহলে তার অব্যাহত উপস্থিতি সম্পর্ককে জটিল করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করবে,’ বলেন ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত।
বাকযুদ্ধ ও উসকানি
দুই পক্ষের বাকযুদ্ধও একটি বড় বিষয়। ভারতের কিছু রাজনীতিক ও টেলিভিশন স্টুডিও থেকে আসা উসকানিমূলক মন্তব্যগুলো বাংলাদেশে এমন একটি বিস্তৃত ধারণা জোরদার করেছে যে, দিল্লি দেশটিকে সমমর্যাদার সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং প্রভাবাধীন ‘পেছনের উঠোন’ হিসেবে দেখে।
অবিনাশ পালিওয়াল উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতের ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ নির্ভর করবে ঢাকার নতুন নেতৃত্ব কতটা ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং দিল্লি নিজেও কতটা উত্তেজনাপূর্ণ বার্তা কমাতে সক্ষম হয় তার ওপর। সম্প্রতি এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি এ ধরনের বার্তার উদাহরণ হিসেবে দেখান।
পালিওয়ালের কথায, দুই পক্ষ যদি সচেতনভাবে বা অসচেতনভাবে ব্যর্থ হয়, তবে পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র পর্যায়েই থেকে যাবে।
পুরোনো সম্পর্ক, নতুন বাস্তবতা
সব ধরনের অস্থিরতা সত্ত্বেও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, গভীর নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক—এসব বন্ধন অটুট। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, আর এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হয়ে উঠেছে ভারত।
সম্পর্কে দূরত্ব টেকসই নয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক নতুন করে পুনর্গঠনের দাবি রাখে।
অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, বিএনপির সঙ্গে ভারতের অতীত সম্পর্ক জটিল এবং বোঝাপড়ার চেয়ে অবিশ্বাসই ছিল বেশি। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমান অতীতকে ভবিষ্যতের বাধা হতে দেননি—এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ। পাশাপাশি দিল্লিও বাস্তববাদী সম্পৃক্ততায় আগ্রহী, যা ইতিবাচক সংকেত।
প্রশ্ন হলো—প্রথম পদক্ষেপ কে নেবে?
শ্রীরাধা দত্ত বলেন, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ভারতেরই এগিয়ে এসে সংলাপ শুরু করা দরকার। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী নির্বাচন সম্পন্ন করেছে; এখন সম্পৃক্ত হোক, কোথায় সহযোগিতা করা যায় দেখুক। আমি আশাবাদী, বিএনপি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে।
অর্থাৎ, সম্পর্ক পুনর্গঠন নির্ভর করবে কথার চেয়ে কাজে—বিশেষ করে বড় প্রতিবেশী আত্মবিশ্বাস দেখাবে, নাকি অতিরিক্ত সতর্কতাই বেছে নেবে তার ওপর।
সূত্র: বিবিসি
কেএএ/
সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক
- ১ তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে আসছেন না মোদী: রিপোর্ট
- ২ ভারতকেই বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে
- ৩ ৩ বছরের মধ্যেই চলে যাবেন ট্রাম্প, ইউরোপকে শীর্ষ ডেমোক্র্যাটদের আশ্বাস
- ৪ বিএনপিশাসিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারবে ভারত?
- ৫ ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রকে রেজা পাহলভির আহ্বান