ইরানের সাথে যুদ্ধের আগেই টয়লেট নষ্ট মার্কিন রণতরীর, বিপাকে হাজারও সেনা
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড/ ছবি: ইউএস নেভি
টয়লেট অকেজো হয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের। এমনিতেই টানা মোতায়েন, পরিবার থেকে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা, তার ওপরে টয়লেট নষ্ট হওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন রণতরীটির নাবিক তথা সেনারা।
মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, ৬৫০টি টয়লেটের বর্জ্য অপসারণে ব্যবহৃত ভ্যাকুয়াম সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিয়েছে। গড়ে প্রতিদিন একটি করে মেরামতের কল আসছে। তবে পরিস্থিতি এখন উন্নতির দিকে এবং এতে জাহাজের দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা হয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের নাবিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে একের পর এক মানবিক সংকটের চিত্র।
পেনসিলভানিয়ার জেমি প্রসার জানান, তার ছেলে ফোর্ডের ফ্লাইট ডেক কন্ট্রোলার। চলতি মোতায়েনে তার ছেলেকে দাদার মৃত্যু, বোনের বিবাহবিচ্ছেদ, ভাইয়ের অসুস্থতা- সবকিছুই দূর থেকে জানতে হয়েছে। বাড়ির বাইরে রং করার মতো কাজও আটকে আছে।
তিনি জানান, ছেলে জাহাজের টয়লেটে সমস্যার কথা বললেও বিস্তারিত বলেনি। জানুয়ারিতে জানতে পেরেছিলাম, ফোর্ডে কয়েকটি টয়লেট অচল হয়ে গেছে।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাক্ষাৎকারে এক নাবিক জানিয়েছেন, তিনি তার দাদার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে পারেননি। আরেক নাবিক প্রায় এক বছর ধরে নিজের ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিতে না পেরে নৌবাহিনী ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন। আরও দুজন বলেছেন, জাহাজে টয়লেটের সমস্যা ভয়াবহ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো এই বিশাল রণতরী মোতায়েনকাল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নাবিকদের পরিবারে চাপ আরও বেড়েছে। চলতি সময়ে বাড়ি ফিরে গেলে নৌবাহিনী ছেড়ে দিতে চান- এমন ভাবনাও দেখা যাচ্ছে অনেকের মধ্যে।
ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ, যা গত জুন থেকে চলছে। গত অক্টোবরে পেন্টাগন পরিকল্পনা বদলে ভূমধ্যসাগরের বদলে জাহাজটি ক্যারিবীয় সাগরে পাঠায়। সে সময় জাহাজটির দায়িত্ব ছিল- তেলবাহী ট্যাংকার আটকানো ও সর্বশেষ ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে সহায়তা করা।
এরপর চলতি বছরের শুরুতে ক্রুদের জানানো হয়, মোতায়েনের মেয়াদ আরও বাড়ছে। এবার আটলান্টিক পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) জিব্রাল্টার প্রণালি পেরিয়ে পূর্বমুখী হয়েছে ফোর্ড।
সাধারণত শান্তিকালে রণতরীগুলোর মোতায়েন মেয়াদ থাকে ছয় মাসের মতো। পরিকল্পনা মতো কয়েক মাস বাড়তে পারে, জানান অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি। কিন্তু ফোর্ডের নাবিকরা এরই মধ্যে বাড়ি থেকে আট মাসের বেশি সময় ধরে দূরে রয়েছেন। আবার ১১ মাস পর্যন্ত টানা মোতায়েনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মার্ক মন্টগোমারি বলেন, এটি হলে মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মোতায়েন হবে।
মার্কিন নৌবাহিনীর মোট ১১টি রণতরী নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে দায়িত্ব, প্রশিক্ষণ বা মেরামতের কাজ করছে। ফোর্ডের পাশাপাশি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকেও পাঠানো হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে।
এদিকে, অতিরিক্ত চাপ শুধু ফোর্ডে নয়, সম্পূর্ণ নৌবহরেই দেখা যায়। ২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে আট মাসের টানা দায়িত্ব পালনের শেষদিকে লাল সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা ঠেকাতে গিয়ে ইউএসএস হ্যারি এস. ট্রুম্যান কয়েকটি যুদ্ধবিমান হারায়। তদন্তে দেখা যায়, অতিরিক্ত অপারেশনাল চাপই এর মূল কারণ।
ফোর্ডে থাকা এক নাবিক জানান, অনেকেই ক্ষুব্ধ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। অনেকেই বলেন, দায়িত্ব শেষে নৌবাহিনী ছেড়ে দেবেন। তিনি নিজেও নৌবাহিনী ছাড়ার কথা ভাবছেন। ছোট্ট মেয়েকে খুব মনে পড়ে, কিন্তু সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক, কবে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন, সেটাই অনিশ্চিত।
এ ধরনের অতিরিক্ত মোতায়েনের ফলে জন্মদিন কিংবা বিয়ের আয়োজন, জানাজা, এমনকি সন্তানের জন্মের সময় থাকতে না পারাটাও স্বাভাবিক ঘটনা।
ফোর্ডের ক্যাপ্টেন ডেভিড স্কারোসি স্বীকার করেন, এই অতিরিক্ত মোতায়েন তাকেও অবাক করেছে। দ্বিতীয় দফায় মোতায়েন বাড়ানোর ঘোষণার পর ১৪ ফেব্রুয়ারি পরিবারের উদ্দেশ্যে পাঠানো চিঠিতে তিনি লেখেন, ডিজনি ওয়ার্ল্ডে যাওয়া, বিয়ের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া, বসন্তের ছুটির ট্রিপ- সব পরিকল্পনাই ভেস্তে গেছে ক্রুদের। দেশ ডাকলে সাড়া দিতেই হয়।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
এসএএইচ