পারস্যের আগুন ও পশ্চিমা তৃষ্ণা: তেলের রাজনীতিতে দহনকাল, জলপথের যুদ্ধ
এআই
মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় চাকা আবিষ্কারের সুফল ষোলো আনা উসুল হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর পেট্রোল-ডিজেল ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর। জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন (১৭৬৯) ছাড়াও তেলচালিত এসব ইঞ্জিনের আবিষ্কারের সঙ্গে বদলে গেছে বিশ্ব মোড়লদের চাহিদাও। তাদের চাহিদার শীর্ষে উঠে এসেছে সভ্যতার চালিকাশক্তি ইঞ্জিনের ‘তেল’, যা আধুনিক শিল্পায়নের বিস্তারে অনিবার্য উপাদান।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধের মূলেও রয়েছে সভ্যতার এই চালিকাশক্তি তেল। যদিও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নসহ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি এবং মিত্রদের ওপর হামলা- হুমকির অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ ও তেলের মালিকানা হরণ এবং বণ্টনের দিক লক্ষ্য করলে সাম্রাজ্যবাদীদের নিগূঢ় অভিলাস স্পষ্ট হয়ে যায়।
এদিকে দেশ হিসেবে ইরান বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মজুত তেলের মালিক। ২০০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল মজুত আছে দেশটিতে। এই দেশটির তেলের ওপর নজর ছিল সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রের। যৌথবাহিনীর হামলায় এখন তা ইউরোপ ও এশিয়ার ৬০টির বেশি দেশের জন্য দীর্ঘশ্বাসে রূপ নিচ্ছে।
পারস্য সভ্যতা থেকে বর্তমান: এক ‘অজেয়’ ইরান
বর্তমান ইরান মূলত পারস্য সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। আড়াই হাজার বছর আগে সাইরাস দ্য গ্রেট এর ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন। এরপর দারিয়ুসের আমলে জরথ্রুস্টবাদ ধর্মীয় বিশ্বাসে একত্রিত হয়ে এ জাতি বেশ উন্নতি করেছিল। বিশেষত, অষ্টম শতকে ইসলাম বিজয়ের পর জ্যোতির্বিজ্ঞান-চিকিৎসা-গণিত শাস্ত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। আধুনিক সভ্যতার কারিগরদের মধ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা থেকে গণিতবিদ ওমর খৈয়াম বা আল খোরাজমি কিংবা কবি, সুফি দার্শনিক ফেরদৌস, হাফিজ, রুমিসহ অনেকেই ইরানের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
উল্লেখ্য, তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্যের আমলেও পারস্য স্বাধীন ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে ‘কাসরে শিরিন’ (জুহাব) চুক্তির মাধ্যমে দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি স্থায়ী সীমানা নির্ধারিত হয়, যা বর্তমান ইরান, তুরস্ক এবং ইরাকের সীমানার ভিত্তি রেখা টেনেছিল। ইরান কখনোই পরাধীন না হলেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে পরাশক্তিদের ছায়াযুদ্ধ তথা দ্য গ্রেট গেম’র অন্তর্ভুক্ত হয় পারস্য।
এই গেমের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ছায়াযুদ্ধে পশ্চিমা পরাশক্তিদের পালাবদল হলেও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া এককভাবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
আরও পড়ুন>>
‘দ্য গ্রেট গেম’: যখন থেকে পরাশক্তিদের ‘ছায়াযুদ্ধে’র ময়দান মধ্যপ্রাচ্য
এরপর মোটা দাগে বলতে গেলে, গত শতাব্দীর প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর রেজা শাহ পাহলভি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইরানের রাজা হন। তিনিই ১৯৩৫ সালে পারস্য থেকে বর্তমান ইরান নামকরণ করেন। তার আমলে পশ্চিমা ভাবধারা-সংস্কৃতির বিস্তার ও তেলের ওপর এংলো ইরানিয়ান ব্রিটিশ কোম্পানির আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ইরানের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক হোসেন।
তেলকেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াই: পরাশক্তিদের প্রভাব
মোসাদ্দেক হোসেন ১৯৪৯ সালে ২২ জন নেতাকে নিয়ে ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ রাজনৈতিক দল গঠন করে ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক পন্থায় ইরানের প্রধানমন্ত্রী হন। তবে ইরানের তেল জাতীয়করণের কারণে পশ্চিমা শক্তিদের রোষানলে পড়েন মোসাদ্দেক। মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনীর ইন্ধনে জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মোসাদ্দেকের পতন ঘটান এবং নিজে প্রধানমন্ত্রী হন।
তবে রেজা শাহ পাহলভির পুত্র মোহাম্মদ শাহ ১৯৫৩ সালে জাহেদিকে সরিয়ে নিজেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন।
‘হোয়াইট রেভ্যুলেশন’ থেকে ‘ইসলামিক বিপ্লব’(১৯৭৯)
১৯৫৫ সাল থেকে পুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর আমলে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম আবার ইরানের তেলের মালিকানা ফিরে পায়। এরপর পশ্চিমাদের ইন্ধনে ইরানে হোয়াইট রেভল্যুশন বা শ্বেত বিপ্লব শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। এটি ছিল মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর নেওয়া এক বিশাল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি।
ওই সময় মার্কিন অর্থায়নে ইরানে চোখ ধাধালো হোয়াইট রেভ্যুলেশন দেখা যায়। এসময় পশ্চিমা সংস্কৃতির বিস্তার, নারীদের হিজাব- চলাফেরা বিষয়ে দেশটির ইসলামি অনুভূতিতে আঘাত আসতে থাকে। একই সঙ্গে কৃষি-শিল্প খাতে উন্নতির নামে ব্যাপক দুর্নীতির ফলে জনঅসন্তোষ তীব্র হতে থাকে। এই দ্রোহ ও বিরোধীদের দমনে বিদেশিদের সহায়তায় সাভাক নামে একটি গোপন বাহিনী গঠন করেন মোহাম্মদ শাহ। এই সাভাক বাহিনীর হাতে হাজার হাজার ইরানি গুপ্ত হত্যার শিকার হয়।
এমন অবস্থায় ১৯৭৯ সালে ইসলামি আদর্শ ধারণ করে তেল জাতীয়করণ করার অঙ্গীকার নিয়ে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতায় আসেন ইমাম (ধর্মীয় নেতা) আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ আলি খোমেনি।
ইরানের জিম্মি সংকট
ঘটনাটি শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর। তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ইরানি ছাত্ররা হামলা চালিয়ে কর্মীদের জিম্মি করে। এই সংকট টানা ৪৪৪ দিন স্থায়ী হয়েছিল এবং ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি জিম্মিরা মুক্তি পান। ইরানি বিপ্লবীরা দাবি করেছিলেন যে, শাহকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ইরানে ফেরত পাঠাতে হবে তাহলেই জিম্মিরা মুক্তি পাবে।
এটি ছিল আধুনিক কূটনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং নাটকীয় ঘটনা। এরপর ইরানের তেল জাতীয়করণ করা হলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পেট্রোডলার কৌশলের কারণে ইরান এই খনিজ সম্পদের সুফল পুরোপুরি পায়নি।
বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: পরমাণু নাকি তেল?
ইরানে বর্তমান যে যুদ্ধ তার সূত্রপাত হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। পরমাণু সমৃদ্ধ করা নিয়ে বারাক ওবামার আমলে ২০১৫ সালে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পারমাণবিক চুক্তি হয়। তবে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইরানে হামলা করে ট্রাম্প প্রশাসন। ১২ দিনের মাথায় মার্কিন বি-২ বোম্বার বিমান থেকে পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার মাধ্যমে সে যুদ্ধের ইতি টানা হলেও তা আবার শুরু হয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের ৪৪০ কেজি ইউরোনিয়াম। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- ৪৪০ কিলো ইউরোনিয়াম ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে; তবে প্রয়োজনে তারা তা উদ্ধার করার পরিকল্পনা নেবে।
আরও পড়ুন>>
‘কল্পনানির্ভর’ হামলা ইসরায়েলের, ফের আলোচনায় ৪৪০ কেজি ইউরোনিয়াম
তবে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের বেশকিছু তেলের স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। ফলে তেলনির্ভর ইরানের অর্থনীতি আবারও ধাক্কা খায়। এতে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ১৪২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। এতে বিরোধীরা যোগ দিলে বিক্ষোভ তীব্র হয়। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানে যায় ইরানের ইসলামিক প্রশাসন।
আইআরজিসি ও বাশিজ আধাসামরিক বাহিনীর সাহায্যে ৩ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যার মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করতে সমর্থ হয় খামেনি প্রশাসন। এই বিক্ষোভ পুঁজি করে সরকার পতনে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের আশা ছিল, ইমাম আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সরিয়ে দিয়ে ইসলামিক শাসনের অবসান ও নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
বর্তমানে রণকৌশলে কে এগিয়ে?
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান বর্তমান যুদ্ধের কৌশল একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়।
মনে করুন, দুজন খেলোয়াড় একটি দাবা ম্যাচ খেলতে উদ্যত হয়েছে। এই ম্যাচে একজন খেলোয়াড়ের (যুক্তরাষ্ট্রের) পরিকল্পনা ছিল- প্রতিপক্ষকে চার চালে স্কলার চেকমেট বা সর্বোচ্চ ১২-১৪ চালে মডার্ন স্কলার মেট করে খুব সহজেই কাঙ্ক্ষিত জয় পাওয়া।
তবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় (ইরানের) পরিকল্পনা হচ্ছে- এই ম্যাচ অন্তত ৪০ চাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে আরও অতিরিক্ত সময় নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল স্কয়ারে আঘাত হেনে জয় না পেলেও পরাজয় যেন না হয় তা (ড্র) নিশ্চিত করা। এদিক থেকে ইরান যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগের যে কৌশল অবলম্বন করেছিল তাতে বেশ সফল হয়েছে বলা যায়।
আরও পড়ুন>>
ইরানের কৌশল: যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্পকে হটানো
এছাড়া ইরানের আরেকটি কৌশল হচ্ছে ত্রিমাত্রিক দাবার মতো যুদ্ধকে বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন দেশকে এর সঙ্গে যুক্ত করা। তেলের সংকট সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
আরও পড়ুন>>
স্টার ট্রেক থেকে হোয়াইট হাউজ: ত্রিমাত্রিক দাবার গল্প
এছাড়া ইরানের যুদ্ধ কৌশলের (অপ্রচলিত পদ্ধতি) আরও কিছু দিক হচ্ছে-
১.সীমান্ত সংযুক্ত না থাকায় ইরান সরাসরি বড় যুদ্ধ না করে-প্রক্সি ওয়ার তথা হিজবুল্লাহ-হামাসের মাধ্যমে আক্রমণ।
২. প্রথমে সস্তা ড্রোন আক্রমণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার।
৩. ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে নৌপথে স্পিডবোর্ডের মাধ্যমে গেরিলা আক্রমণ। এছাড়া যুদ্ধবিমান বহকারী রণতরী আক্রমণের ক্ষেত্রে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন>>
এক দেশ, ৩১ যুদ্ধক্ষেত্র: ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল
হতাহতের বিবেচনায়, এখন পর্যন্ত ইরানের মোট মৃত্যু ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষ। ইরানের ভাষ্য মতে, দেশটির ৩৮ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল-মার্কিন যৌথবাহিনী, যার মধ্যে মিনাব শহরের শারজাহ তায়্যিবাহ স্কুলে হামলা ও ভারত মহাসাগরে ইরানের যুদ্ধজাহাজে হামলা অন্তর্ভুক্ত। স্কুলে মার্কিন হামলায় অন্তত ১৬৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে এবং ভারত মহাসাগরে নৌবাহিনীর ৭৯ জন নিহত হয়েছে।
হতাহত সংখ্যার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এগিয়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ১২ জন মার্কিন সেনা নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের এ সংখ্যা ২০ ছাড়িয়েছে। তবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি ও তেল সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি সপ্তাহে অন্তত সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। জর্দান ও কাতারে মার্কিন রাডার ধ্বংস, যুদ্ধ-ট্যাংকার বিমান হারানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সবগুলো ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এবং দূতাবাস বন্ধ করে ৪৫ হাজারের বেশি মার্কিনিকে ফেরত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
হরমুজ প্রণালি ও চীনের বন্দর ব্যবস্থাপনা: তেলের যুদ্ধ পানিতে
যুদ্ধের অন্যতম কৌশল হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তেল ট্যাংকার চলাচল বন্ধ করে দেয়। এমনকি সরু এই প্রণালির ১০টি কেন্দ্রে মাইন স্থাপন করেছে। ফলে এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহের এই নৌপথে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের তেল পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সর্বোপরি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এশিয়া ও ইউরোপে তেলের সংকট তীব্র হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে পৌঁছেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্য মতে, ইরানের হরমুজ প্রণালি ও এর বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চীনকে দেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে চীন তার ইউয়ান মুদ্রায় টোল তুলবে বলেও জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি যুদ্ধ শুরুর আগে পানামা খালের ব্যবস্থাপনায় থাকা চীনা কোম্পানির কার্যক্রম স্থগিত করে পানামা সরকার। ইরান এই প্রণালির দায়িত্ব পেলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কপালে দীর্ঘ ভাঁজ ফেলবে বলে মত দিয়েছেন বন্দর পরিচালনায় নিয়োজিত বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া ইরানের সমর্থনে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীরা। এমন পরিস্থিতিতে তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
একই সঙ্গে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মজুত করা তেল বাজারে ছাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন ট্রাম্প।
কূটনীতিক সমাধান কি সম্ভব?
চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনে নানামুখী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের পথ পরিহার করে কূটনীতিক পন্থায় সমাধান চাইছেন বিশ্ব নেতারা। এজন্য দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ব নেতারা। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ নেই বলে নিশ্চিত করেছে তেহরান। সব দিক বিবেচনায় এই যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ যে বেশি তা স্পষ্ট হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে দুই স্তরে আলোচনা চলছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য মতে, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য স্তরে তুরস্ক, মিশর এবং পাকিস্তান সরাসরি মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই যুদ্ধ বন্ধে শুরু থেকে সমঝোতার কথা বলে আসছে তুরস্ক ও মিশর।
আরও পড়ুন>>
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধান ‘সম্ভব’: এরদোয়ান
তবে দুই পক্ষ সমঝোতায় না আসার মূল কারণ একে অপরের দাবি দাওয়া। যুদ্ধে নেমে পথ হারানো ট্রাম্প বিভিন্ন সময় উদ্ভট আলটিমেটাম দিলেও সর্বশেষ ১৫ দফা চুক্তি প্রস্তাব দিয়েছে। এই ১৫ দফার বিপরীতে ইরানের শর্ত স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালির একচ্ছত্র মালিকানা এবং ভবিষ্যতে আর কোনো মার্কিন হামলা যেন না হয় তার নিশ্চয়তা চাচ্ছে ইরান।
তবে ইরানের এসব শর্ত বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সিংহাসন হারানোর মতো। তাই এই শর্ত মেনে যুদ্ধ বিরতি হবে কি না তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সূত্র: বিবিসি/ আল-জাজিরা/ দ্য গার্ডিয়ান
কেএম
সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক
- ১ দুবাইয়ে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার দাবি ইরানের
- ২ ইরানের প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী
- ৩ ড্রোন হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার ক্ষতিগ্রস্ত
- ৪ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে এমআরআই স্ক্যানে
- ৫ পারস্যের আগুন ও পশ্চিমা তৃষ্ণা: তেলের রাজনীতিতে দহনকাল, জলপথের যুদ্ধ