শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় চ্যালেঞ্জ ব্রিটিশ আইনি সেবা প্রতিষ্ঠানের
শেখ হাসিনাকে গত ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়/ফাইল ছবি
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়কে চ্যালেঞ্জ করেছে ব্রিটিশ আইনি সেবা প্রতিষ্ঠান কিংসলে ন্যাপলি এলএলপি।
প্রতিষ্ঠানটি গত সোমবার (৩০ মার্চ) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটির) পাঠানো এক ইমেইলে এ চ্যালেঞ্জ জানায়। তারা বিচার কার্যক্রমটিকে বেআইনি এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থি হিসেবে আখ্যায়িত করে।
আইসিটি বরাবর পাঠানো এ ইমেইলে নির্দিষ্ট কাউকে সম্বোধন করা হয়নি। এমনকি স্বাক্ষরের স্থানেও কোনো আইনজীবী বা ব্যক্তির বদলে শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে। এটি পাঠিয়েছেন কিংসলে ন্যাপলির অংশীদার রেবেকা নিবলক।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউশন কার্যালয় কিংবা ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। তবে স্বীকার করেছেন যে তারা সাংবাদিকদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানতে পেরেছেন।
গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবি জানানো হয় লন্ডনভিত্তিক কিংসলে ন্যাপলির চিঠিতে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া জানান, কোনো রায় সম্পর্কে যে কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান বা আইনজীবী মতামত জানাতে পারেন। কিন্তু রায়কে চ্যালেঞ্জ করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা করতে হবে। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকেও আদালতে হাজির হয়ে আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রায় চ্যালেঞ্জ অর্থাৎ আপিল করতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকালে চালানো দমন-পীড়নের ঘটনায় বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করা কিংসলে ন্যাপলি দাবি করে, এই বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মৌলিক আইনি অধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে বিচার সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং আইনি দলের সদস্যদের ওপর ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তোলা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে যে সাজা দেওয়া হয়েছে তা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। তারা এই বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতাকেও স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। এই আপত্তির একটি প্রধান দিক হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব।
আইনি প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের সময় এমন বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ট্রাইব্যুনালে যোগ দেওয়ার মাত্র ছয় দিন আগে হাইকোর্টে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
আইনজীবীদের অভিযোগ, বিচার চলাকালেই তিনি শেখ হাসিনার অপরাধ সম্পর্কে পূর্বনির্ধারিত ধারণা পোষণ করতেন। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের আগস্টে আদালতকক্ষে তার একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে তিনি রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীকে বলেছিলেন, ‘আপনার মক্কেলদের ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে বাঁচাতে আপনি আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন’। কিংসলে ন্যাপলির মতে, এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে রায়ের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।
তদন্ত ও প্রসিকিউশন দলের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে লন্ডনের এই প্রতিষ্ঠানটি। তারা সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের ভূমিকার সমালোচনা করে বলে, তিনি অতীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া বিচার চলাকালীন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিভিন্ন সমাবেশে তার অংশগ্রহণকে পক্ষপাতমূলক বলে অভিহিত করা হয়।
চিঠিতে একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়েও আইনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। কিংসলে ন্যাপলি বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে ট্রাইব্যুনালের আইনে যে সংশোধনী এনে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বাইরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা একটি আইনি অসম্ভব এবং বেআইনি সম্প্রসারণ।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এই ধরনের মামলাগুলো নিয়মিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হওয়া উচিত ছিল। তারা সতর্ক করে বলে, ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমান।
কিংসলে ন্যাপলি এই রায়কে অবিলম্বে বাতিল ও আইনত অকার্যকর ঘোষণার দাবি জানিয়েছে এবং আগামী ১৪ দিনের মধ্যে এর ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে। অন্যথায় শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে প্রতিকার চাইতে পারেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এফএইচ/একিউএফ
সর্বশেষ - আইন-আদালত
- ১ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে কিংসলে ন্যাপলির চিঠি আদালত অবমাননা
- ২ হাদি হত্যা মামলার প্রতিবেদন জমার তারিখ ফের পেছাল
- ৩ হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্রের জামিন
- ৪ শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় চ্যালেঞ্জ ব্রিটিশ আইনি সেবা প্রতিষ্ঠানের
- ৫ হত্যাচেষ্টার মামলায় সুব্রত বাইনের মেয়ে বিথীকে গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ