EN
  1. Home/
  2. আইন-আদালত

৩৫ বছর পর এক বছর সাজার মামলা নিষ্পত্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৭:৫৮ পিএম, ০২ মার্চ ২০২১

১৯৮৬ সালে গাজীপুরে তুচ্ছ ঘটনার জেরে প্রতিবেশীর মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এর জেরে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার শেষে অর্থদণ্ডসহ এক বছরের সাজা হয় আসামির। এর বিরুদ্ধে আপিলের ধারাবাহিকতায় মামলাটি সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আসে।

চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি মামলাটি নিষ্পত্তি করে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট বলেছেন- এই ঘটনা ঘটেছিল দুই প্রতিবেশীর মধ্যে তুচ্ছ একটা ঘটনার জেরে। এইসব ক্ষেত্রে আসামিকে এক বছরের জন্য জেলে না পাঠিয়ে প্রবেশনে রাখা সমীচিন ছিল।

আপিল বিভাগ আরও বলেছেন, যেহেতু দন্ডবিধির ৩২৩ এবং ৩২৫ ধারা আপোষযোগ্য অপরাধ এবং যেহেতু দুই পক্ষ হচ্ছে পরস্পর আত্মীয়/প্রতিবেশী কাজেই মামলাটি আপোষ মিমাংসা করা যুক্তিযুক্ত ছিল।

‘প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ এর বিধানাবলী বিচারিক আদালত, আপিল আদালত এবং হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক প্রয়োগযোগ্য। অথচ আগের আদালতসমূহের তিনটি রায় থেকে বোঝা যাচ্ছে না যে, বিচারকগণ এই আইনের বিষয়ে আদৌ অবগত আছেন কিনা। যদি এই আইন প্রয়োগের বিষয়ে ধারণা থাকতো তাহলে রায়ের মধ্যে বলা থাকতো কেন এই আইন প্রয়োগ করা সমীচিন নয় এবং যদি এই আইন সঠিকভাবে বিচারিক আদালতে প্রয়োগ করা হতো তাহলে এই ধরনের মামলা দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত আসতো না- বলে রায়ে মন্তব্য করেন সার্বোচ্চ আদালত।

আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এমন রায় দেন। রায়ের তথ্য ও রায়ের অনুলিপি মঙ্গলবার (২ মার্চ) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মো. সাইফুর রহমান।

রায়ে আদালত বলেন, বাংলাদেশের শতকরা ৬২ ভাগের অধিক লোক গ্রামাঞ্চলে বাস করে। যেখানে মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক শহরের তুলনায় বেশি এবং তাদের মধ্যে ছোট-খাটো ঝগড়া-বিবাদও বেশি হয়। এই মামলার ঘটনা শুরু হয়েছিল খুব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। ১৯৮৬ সালের ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় আসামি আব্দুল মতিনের সঙ্গে বাদী আহমদ আলীর ১০/১২ বছরের নাতি আব্দুল বাকির কথা কাটাকাটি হয়। ওইদিনই সন্ধ্যায় এই ব্যাপারে সালিশ হয় এবং মতিনকে সালিশে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

ফলে আসামিপক্ষ প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দেয় এবং পরের দিন সকাল ৬টায় আসামি মতিনের ভাই আসামি নুর মোহাম্মদ বাদীর ছেলে আব্দুল জব্বারকে আক্রমণ করে এবং একটি ফালার চ্যাপ্টা অংশ দিয়ে মাথায় আঘাত করে এবং শরীরের একাধিক স্থানে জখম করে। এসময় তার বাম হাতের কব্জি ভেঙ্গে দেয়। মোট ছয়জন আসামি বাদীপক্ষের চারজনের শরীরে বিভিন্ন আকারের জখম করে। এর মধ্যে আব্দুল জব্বার সবচেয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়।

বিচার শেষে ১৯৯৪ সালের ৩১ জানুয়ারি বিচারক বর্তমান আবেদনকারী নুর মোহাম্মদকে দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারার অপরাধের জন্য এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩২৩ ধারার অপরাধের জন্য দুই হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিনমাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। অন্যান্য আসামিদেরকে দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারার অপরাধের জন্য যথাক্রমে দুই হাজার টাকা এবং পাঁচশত টাকা জরিমানা করেন।

এর বিরুদ্ধে আসামিরা অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন। যেটি ২০০৫ সালের ৭ জুলাই খারিজ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আসামিরা হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করেন। শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২ মার্চ আবেদনটি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট বিভাগের ওই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আসামি নুর মোহাম্মদ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন। ওই আবেদন শুনানি নিয়ে রায় দেন আদালত।

রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি- বিচারিক আদালতের বিচারক ও আপিল আদালতের বিচারক সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছেন যে, আমাদের দেশে ‘প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ নামে একটি আইন আছে এবং বর্তমান মামলার প্রেক্ষাপটে সেই আইনের ৫ ধারা প্রয়োগযোগ্য। যখনই বিচারক ৩২৫ ধারার অপরাধে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করলেন তখনই উনার উচিত ছিল ‘প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ এর ৫ ধারা বিবেচনা করা।

মামলার বিষয়বস্তু থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই ঘটনা ঘটেছিল দুই প্রতিবেশীর মধ্যে তুচ্ছ একটা ঘটনার জের ধরে। এইসব ক্ষেত্রে আসামিকে এক বছরের জন্য জেলে না পাঠিয়ে প্রবেশনে রাখা সমীচিন ছিল। এমনকি যেহেতু দন্ডবিধির ৩২৩ এবং ৩২৫ ধারা আপোষযোগ্য আপরাধ এবং যেহেতু দুইপক্ষ হচ্ছে পরস্পর আত্মীয়/প্রতিবেশী কাজেই মামলাটি আপোষ মীমাংসা করা যুক্তিযুক্ত ছিল।

আমরা আরও দুঃখের সঙ্গে বলতে চাচ্ছি যে, এ ধরনের মামলার ‘প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ প্রয়োগ না করা শুধু দুঃখজনকই নয় প্রচলিত আইনের পরিপন্থী।

নিম্ন আদালতের দুইজন বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক কেউই ‘প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ অথবা আপোষ মীমাংসার ব্যাপারে চিন্তা করেননি এবং দন্ড ও সাজা বহাল রাখেন। ইতোমধ্যে আবেদনকারী নুর মোহাম্মদ ৩১ দিন কারাদন্ড ভোগ করেছেন।

আবেদনকারী নুর মোহাম্মদের দোষী সাব্যস্তের আদেশ এবং জরিমানা বহাল থাকবে। তবে তিনি যতদিন কারাদণ্ড ভোগ করেছেন ততদিনই তার দণ্ড হিসেবে গণ্য হবে উল্লেখ করে নুর মোহাম্মদের আবেদন নিষ্পত্তি করে দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে সংশোধন করে দেন হাইকোর্ট বিভাগের রায় ও আদেশ।

এফএইচ/এএএইচ/এমএস