ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. লাইফস্টাইল

লুসিড ড্রিম কি সাধারণ স্বপ্ন নয়?

লাইফস্টাইল ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৭:২৯ পিএম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

হাসান জাহিদ

অনেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে লুসিড ড্রিমের ভেতর দিয়ে গেছেন। কিন্তু এই স্বপ্ন সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে তারা এটিকে শুধু একটি সাধারণ স্বপ্ন ভেবেছেন।

লুসিড ড্রিমের পরিস্থিতি সাধারণত অপর্যাপ্ত ঘুম ও অতিরিক্ত স্ট্রেস নেওয়ার কারণে তৈরি হয়। পারিবারিক ভায়োলেন্সের কারণেও টিনএজ ছেলে-মেয়েরা লুসিড ড্রিমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অতিরিক্ত ব্রেনওয়ার্ক ও মনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের ফলেও লুসিড ড্রিমের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

লুসিড ড্রিম অনেকটা জীবনের অঙ্ক না মেলানোর মতো অভিজ্ঞতা। বিশেষত টিনএজারদের জন্য, যারা পারিবারিক কারণে বা বুলিংয়ের শিকার হয়ে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়। লুসিড ড্রিমিং হলো স্বপ্নের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জীবনের ঘটনার মধ্যে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়া। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ বাস্তব ও কল্পনার সংঘাতে তারা প্রায়ই অশান্তি, অস্থিরতা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।

লুসিড ড্রিম বা স্বচ্ছ স্বপ্ন শব্দটি ১৯১৩ সালে ডাচ লেখক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ফ্রেডেরিক ভ্যান তার নিবন্ধ আ স্টাডি অব ড্রিমস্-এ প্রবর্তন করেন। যদিও মানুষ স্বপ্ন দেখার সময় সচেতন থাকার বর্ণনা এই নিবন্ধের আগেও পাওয়া যায়।

মনোবিজ্ঞানী স্টিফেন লা-বার্জকে আধুনিক লুসিড ড্রিমিং গবেষণার মূল প্রবর্তক ও অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লুসিডিটি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা।

মনোবিজ্ঞানের ওনিরোলজি শাখায় স্বচ্ছ স্বপ্ন হলো এমন একটি স্বপ্ন, যেখানে স্বপ্নদ্রষ্টা জানেন যে তিনি স্বপ্ন দেখছেন, এবং তা জানার মধ্যেই তিনি স্বপ্নে অবস্থান করছেন। স্বচ্ছ স্বপ্ন দেখা ও তা ধরে রাখার ক্ষমতা একটি প্রশিক্ষণযোগ্য, অর্জিত দক্ষতা। স্বচ্ছ স্বপ্নের সময় স্বপ্নদ্রষ্টা স্বপ্নের চরিত্র, গল্প বা পরিবেশের ওপর কিছুটা ইচ্ছাকৃত নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে পারেন, যদিও এই নিয়ন্ত্রণই স্বচ্ছ স্বপ্নের প্রধান বৈশিষ্ট্য নয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, স্বচ্ছ স্বপ্ন অন্যান্য ধরনের স্বপ্ন - যেমন প্রি-লুসিড স্বপ্ন ও উজ্জ্বল স্বপ্ন - থেকে ভিন্ন। যদিও প্রি-লুসিড স্বপ্ন স্বচ্ছ স্বপ্নের পূর্বধাপ হতে পারে এবং স্বচ্ছ স্বপ্ন প্রায়ই উজ্জ্বল স্বপ্নের দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি করে।

স্বচ্ছ স্বপ্ন অন্যান্য স্বচ্ছ সীমানার ঘুমের অবস্থার থেকেও আলাদা, যেমন স্বচ্ছ হাইপনাগোগিয়া (জাগ্রত অবস্থা থেকে ঘুমে প্রবেশের মধ্যবর্তী অবস্থা) বা স্বচ্ছ হাইপনোপম্পিয়া (ঘুম থেকে জাগরণের মধ্যবর্তী অবস্থা)।

ফরমাল মনোবিজ্ঞানে স্বচ্ছ স্বপ্ন বহু বছর ধরে অধ্যয়ন ও গবেষণার বিষয়। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। পল থলি লুসিড ড্রিম গবেষণার জন্য জ্ঞাননির্ভর ভিত্তি স্থাপন করেন এবং প্রস্তাব করেন যে একটি স্বপ্নকে লুসিড ড্রিম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে সাতটি ভিন্ন স্পষ্টতার শর্ত পূরণ করতে হবে -

>> স্বপ্নের অবস্থার সচেতনতা (অভিমুখিকতা)

>> সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার সচেতনতা

>> স্মৃতি কার্যকারিতার সচেতনতা

>> সচেতনতার স্ব-পরিচয়

>> স্বপ্নের পরিবেশের সচেতনতা

>> স্বপ্নের অর্থের সচেতনতা

>> একাগ্রতা ও মনোযোগের সচেতনতা (অবস্থার বিষয়ভিত্তিক স্পষ্টতা)

আসলে এই জ্ঞান ও গবেষণানির্ভর ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে না বুঝেও, শুধুমাত্র লুসিড ড্রিমের সংজ্ঞা সঠিকভাবে বুঝে আমরা নিজেরা লুসিড ড্রিমের ভেতর দিয়ে যাই কি না, তা অনুধাবন করতে পারি।

১৯৯২ সালে ডিয়ার্দ্রে ব্যারেট একটি গবেষণা পরিচালনা করেন, যেখানে পরীক্ষা করা হয় স্বচ্ছ স্বপ্নে স্বচ্ছতার চারটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে কি না - স্বপ্নদ্রষ্টা জানেন যে তিনি স্বপ্ন দেখছেন; জানেন যে স্বপ্নের জিনিস জাগরণের পর থাকবে না; জানেন যে শারীরিক নিয়মাবলি প্রযোজ্য নয়; এবং জাগ্রত বিশ্বের স্পষ্ট স্মৃতি থাকে।

ব্যারেটের গবেষণা স্বচ্ছ স্বপ্নের সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানে প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। ড. ডিয়ার্দ্রে ব্যারেট একজন প্রখ্যাত আমেরিকান লেখিকা ও মনোবিজ্ঞানী। তার বহু গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

স্বচ্ছতার প্রভাবসমূহ

স্বপ্নদ্রষ্টা মনে রাখেন যে তিনি স্বপ্ন দেখছেন; তারা সচেতন থাকেন যে জাগরণের পর স্বপ্নের কাজগুলো প্রভাব ফেলবে না; শরীরবৃত্তীয় আইন স্বপ্নে প্রযোজ্য নাও হতে পারে; এবং জাগ্রত বিশ্বের একটি স্পষ্ট স্মৃতি থাকে।

পরে স্টিফেন লা-বার্জ স্বপ্নের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করেন এবং দেখেন যে স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ ও স্বপ্ন সচেতনতা সম্পর্কিত হলেও, একটির উপস্থিতি অন্যটির জন্য আবশ্যক নয়। তিনি এমন স্বপ্নের কথাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে স্বপ্নদ্রষ্টা সচেতন থাকলেও নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল পর্যবেক্ষণ করতে পছন্দ করেন।

এভাবেই লুসিড ড্রিমের সংজ্ঞা, পরিধি ও প্রভাব ধাপে ধাপে মানুষের আগ্রহকে প্রসারিত করেছে।

লুসিড ড্রিম বা স্বচ্ছ স্বপ্ন হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে স্বপ্নদ্রষ্টা স্বপ্নের মধ্যে সচেতন থাকেন এবং বুঝতে পারেন যে তিনি স্বপ্ন দেখছেন। এই অবস্থায় অনেক সময় স্বপ্নদ্রষ্টা স্বপ্নের ঘটনা, পরিবেশ ও চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। এটি একটি প্রাচীন ধারণা, যা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছে।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

লুসিড ড্রিম সাধারণত আরইএম ঘুমের সময় ঘটে, যখন মস্তিষ্ক অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে স্বপ্নের ঘটনা বেশি প্রাণবন্ত ও বাস্তবসম্মত হয়। গবেষকদের মতে, লুসিড ড্রিমিংয়ের সময় সচেতন ও অবচেতন মনের মধ্যে একটি বিরল সংমিশ্রণ ঘটে, যা স্বপ্নদ্রষ্টাকে স্বপ্নের মধ্যে সচেতন থাকতে সহায়তা করে।

লুসিড ড্রিমিংয়ের সুবিধা

লুসিড ড্রিমিংয়ের মাধ্যমে স্বপ্নদ্রষ্টা তাদের দুঃস্বপ্নকে সুন্দর স্বপ্নে রূপান্তরিত করতে পারেন। যেমন - কেউ যদি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেন, তবে তিনি সেই স্বপ্নের পরিস্থিতি পরিবর্তন করে মানসিক চাপ কমাতে পারেন। এটি সৃজনশীলতা বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও সহায়ক হতে পারে।

লুসিড ড্রিমিং কীভাবে অর্জন করবেন

লুসিড ড্রিমিং অর্জনের জন্য কিছু পদ্ধতি রয়েছে -

১. স্বপ্নের ডায়েরি রাখা: প্রতিদিন সকালে উঠে স্বপ্নগুলো লিখে রাখুন। এটি স্বপ্ন মনে রাখতে সাহায্য করবে এবং লুসিড ড্রিমিংয়ের সম্ভাবনা বাড়াবে।

২. বাস্তবতা পরীক্ষা করা: দিনে কয়েকবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘এটা কি স্বপ্ন, নাকি বাস্তব?’ এটি মস্তিষ্ককে সচেতন থাকতে সহায়তা করবে।

৩. মেডিটেশন: নিয়মিত মেডিটেশন করলে মন শান্ত হবে এবং লুসিড ড্রিমিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে।

লুসিড ড্রিমিং একটি আকর্ষণীয় ও রহস্যময় অভিজ্ঞতা, যা অনেকের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এটি কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং এক নতুন বাস্তবতার অভিজ্ঞতা তৈরির সুযোগ।

পৃথিবীতে অনেকেই আছেন, যারা স্বপ্ন দেখছেন - এটা বুঝতে পারার পরেও স্বপ্ন দেখা চালিয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ সচেতন অবস্থাতেও স্বপ্নজগতে থাকতে পারেন। এই ‘সচেতন স্বপ্ন’ কেই ইংরেজিতে লুসিড ড্রিমিং বলা হয়। চেতন ও অবচেতন মনের একটি বিরল সংমিশ্রণে এমনটি ঘটে। সাধারণত লুসিড ড্রিমিংয়ের সময় স্বপ্ন বেশ পরিষ্কারভাবে দেখা যায় এবং অনুভূতিগুলো অত্যন্ত তীব্র হয় - প্রায় বাস্তবের মতো। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো স্বপ্নের দৃশ্য পরিবর্তনও করা যায়।

স্বপ্ন হলো ধারাবাহিক কিছু ছবি ও আবেগের সমষ্টি, যা ঘুমের সময় মানুষের মনের মধ্যে আসে। এগুলো কল্পনা, অবচেতন মনের প্রকাশ কিংবা অন্য কোনো মানসিক প্রক্রিয়ার ফল হতে পারে। এর শ্রেণিবিন্যাস করা বেশ কঠিন।

সাধারণত মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখে, তবে সবগুলো মনে রাখতে পারে না। স্বপ্নের অর্থ সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন, যা সময় ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে। অনেকেই ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব সমর্থন করেন, যেখানে বলা হয় স্বপ্ন মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ। অন্য তত্ত্বে বলা হয়েছে, স্বপ্ন স্মৃতি গঠন, সমস্যা সমাধান এবং মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে।

মনোবিজ্ঞানের একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো লুসিড ড্রিমিং। এটি এমন এক ধরনের স্বপ্ন, যেখানে চেতনা সক্রিয় থাকে। স্বপ্নের মধ্যেই বোঝা যায় যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, কিন্তু ঘুম ভাঙে না।

মনোবিদদের কাছে লুসিড ড্রিমিং একটি রহস্যময় কিন্তু লোভনীয় গবেষণার বিষয়। প্রায় সবাই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে লুসিড ড্রিমিং অনুভব করলেও এর ঘনত্ব তুলনামূলক কম। তবে কিছু মানুষ আছেন, যারা অন্যদের তুলনায় বেশি ঘনঘন লুসিড ড্রিমিং করেন। লুসিড ড্রিমিংয়ের সময় যেহেতু মন সচেতন থাকে, তাই বাস্তব ঘটনার মতোই স্বপ্নটি স্পষ্টভাবে মনে থাকে।

স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায় হলো লুসিড ড্রিম। যখন স্বপ্নের মাঝেই বুঝতে পারেন যে এটি বাস্তব নয় এবং নিজের ইচ্ছামতো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তখন সেটিই লুসিড ড্রিম। প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত, অর্থাৎ গড়ে মাসে একবার, লুসিড ড্রিমের অভিজ্ঞতা পান।

এএমপি/এএসএম

আরও পড়ুন