কর্মক্ষেত্রে ‘না’ বলছে জেন-জি, এটা কি দায়িত্বহীনতা নাকি সচেতনতা
অফিসে প্রশংসার আশায় অতিরিক্ত সময় থাকা, ছুটি চাইলে ভ্রূ কুঁচকে তাকানো, মানসিক চাপকে প্রফেশনালিজমের অংশ বলে মেনে নেওয়া - এই সংস্কৃতির সঙ্গেই বড় হয়েছে আগের প্রজন্মের অনেক কর্মী।
কিন্তু নতুন প্রজন্ম, অর্থাৎ জেন-জি, এই বাস্তবতাকে আর স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে নারাজ। বরং তারা স্পষ্টভাবে ‘না’ বলতে শিখছে। প্রশ্ন হচ্ছে - এটা কি দায়িত্বহীনতা, নাকি সুস্থ কর্মপরিবেশের দাবিতে সচেতন অবস্থান?
জেন-জি কারা?
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে জেন-জি বলা হয়। এরা ডিজিটাল যুগে বড় হয়েছে, তথ্যপ্রবাহে অভ্যস্ত, এবং কাজের জায়গায় স্বচ্ছতা ও সম্মানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
টক্সিক কর্মসংস্কৃতি বলতে কী বোঝায়?
টক্সিক কর্মসংস্কৃতি বলতে এমন পরিবেশকে বোঝায় যেখানে কর্মীদের প্রতি অসম্মান, অতিরিক্ত কাজের চাপ, ভয়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, বৈষম্য বা মানসিক নিপীড়ন স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষেত্রের চাপ উদ্বেগ, অবসাদ ও শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে।

জেন-জি কেন ‘না’ বলছে?
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট-এর ২০২৩ সালের গ্লোবাল জরিপে দেখা যায়, জেন-জি কর্মীদের বড় একটি অংশ কাজের জায়গায় মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেয়। তারা বিশ্বাস করে, কাজ জীবনের একটি অংশ - পুরো জীবন নয়।
আরেকটি গবেষণায়, যা প্রকাশ করেছে ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানি, দেখা গেছে তরুণ কর্মীরা এমন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদে থাকতে চায় যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি, ফিডব্যাকের সুযোগ এবং কাজ-জীবনের ভারসাম্য নিশ্চিত করা হয়।
সমালোচনা কোথা থেকে আসছে?
অনেক প্রবীণ কর্মী ও নিয়োগকর্তার মতে, জেন-জি ধৈর্যহীন এবং দ্রুত সাফল্য চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো - আগের প্রজন্ম যে চাপ সহ্য করেছে, সেটিই কি আদর্শ মানদণ্ড? নাকি সেটি ছিল কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা?
বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক একাধিক আচরণগত গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক নিরাপত্তা থাকলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। কাজের জায়গায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সীমারেখা নির্ধারণের সুযোগ থাকলে কর্মী ধরে রাখার হারও বৃদ্ধি পায়।

‘না’ বলা কি বিদ্রোহ?
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি কর্মক্ষেত্রে সুস্থ সীমারেখা নির্ধারণের অংশ। অতিরিক্ত কাজের চাপ বা অসম্মানজনক আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক - দুই পর্যায়েই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত হলে প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়।
জেন-জির এই অবস্থান হয়তো অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। কিন্তু এটি একইসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিচ্ছে - কাজের জায়গা শুধু আয় করার স্থান নয়, এটি মানুষের মানসিক ও সামাজিক জীবনেরও অংশ। সেই জায়গাটি যদি সুস্থ না হয়, তবে ‘না’ বলা কখনও কখনও সাহসেরই আরেক নাম।
সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টার, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন, ডেলয়েট গ্লোবাল সার্ভে ২০২৩, ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানি রিপোর্ট
এএমপি/জেআইএম