ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. লাইফস্টাইল

হামের ঝুঁকি বাড়ছে, মোকাবিলায় করণীয় কী

আনিসুল ইসলাম নাঈম | প্রকাশিত: ১১:৫৫ এএম, ৩১ মার্চ ২০২৬

গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় প্রায় নির্মূলের পথে থাকা এই রোগটি কেন আবার ফিরে আসছে এবং কেন এতে মৃত্যুর হার বাড়ছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

এ বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার।

হাম বৃদ্ধির কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি

বর্তমানে দেশে ও বিশ্বে হাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো কোভিড-১৯ অতিমারির সময় টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যমতে, ওই সময়ে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একে বলা হয় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

বর্তমানে ইউরোপের কিছু দেশ, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বিশেষ করে দুর্গম এলাকা ও শহুরে বস্তিতে হামের প্রকোপ লক্ষ্য করা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রায় সব জেলাতেই হামের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘনবসতি এবং মানুষের অবাধ যাতায়াত ভাইরাসটি দ্রুত ছড়াতে সহায়তা করছে।

হামের ঝুঁকি বাড়ছে, মোকাবিলায় করণীয় কী

কেন এত মৃত্যু হচ্ছে?

হামকে সাধারণ রোগ মনে করা হলেও এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী হতে পারে। মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো হলো -

নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট: হামের ভাইরাসের প্রভাবে ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ হয়।

পুষ্টিহীনতা: ভিটামিন এ-এর অভাব থাকলে জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

দেরিতে রোগ নির্ণয়: জ্বর ও ফুসকুড়িকে সাধারণ সমস্যা ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করা হয়।

সেকেন্ডারি ইনফেকশন: হামের ফলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যায়, ফলে অন্য সংক্রমণ সহজে হয়।

৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি

ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। কিন্তু এর আগেই অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ -

১. মায়ের অ্যান্টিবডির অভাব: মায়ের টিকা না থাকলে বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে শিশু জন্মের পর পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায় না।

২. সুরক্ষা কমে যাওয়া: মায়ের থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি সাধারণত ৬ মাসের পর কমতে শুরু করে। ফলে ৬–৯ মাস সময়টায় শিশু বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

জটিলতা

হামের জটিলতা শিশু ও বয়স্ক উভয়ের জন্যই ভয়াবহ হতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে: কান পাকা (অটাইটিস মিডিয়া), দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)।

বড়দের ক্ষেত্রে: যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ বেশি তীব্র হয়। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অকাল প্রসব বা গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে এবং শিশুর জন্মগত হাম (কনজেনিটাল মিজেলস) হতে পারে। এছাড়া লিভারের সংক্রমণ ও তীব্র নিউমোনিয়াও হতে পারে।

কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে?

>> যাদের টিকা নেওয়া হয়নি
>> গর্ভবতী নারী
>> ৫ বছরের কম বয়সী শিশু
>> রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম (যেমন: ক্যানসার বা এইচআইভি আক্রান্ত) ব্যক্তি
>> তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভোগা মানুষ

প্রতিরোধ: বাচ্চা ও বড়দের করণীয়

হাম একটি বায়ুবাহিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এর প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা।

বাচ্চাদের জন্য: ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ এমআর টিকা নিশ্চিত করতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিয়মিত দেওয়া জরুরি।

বড়দের জন্য: যাদের ছোটবেলায় টিকা নেওয়া হয়নি বা কখনো হাম হয়নি, তাদের টিকা নেওয়া উচিত।

পরিবারে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে অন্তত ৪–৫ দিন আলাদা (আইসোলেশন) রাখতে হবে।

বুস্টার ডোজ

সাধারণত দুই ডোজ টিকা আজীবন সুরক্ষা দেয়। তবে প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে বুস্টার ডোজ দেওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য।

চিকিৎসা পদ্ধতি

হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক -

>> বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া জরুরি।

>> জ্বর নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যায়।

>> ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

>> অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে দিতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয়

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন -

১. ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন: টিকা মিস করা শিশুদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা।
২. জনসচেতনতা: জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া।
৩. পুষ্টি নিশ্চিতকরণ: শিশুদের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ জোরদার করা।
৪. নজরদারি জোরদার: দুর্গম ও চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম বাড়ানো।

হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ ও সচেতনতাই পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে। প্রতিটি অভিভাবকের উচিত শিশুর টিকাদান কার্ড নিয়মিত যাচাই করা এবং কোনো ডোজ বাকি থাকলে দ্রুত সম্পন্ন করা।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে হামমুক্ত দেশ গড়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

এএমপি/জেআইএম

আরও পড়ুন