নববর্ষের রঙে মুখর দোয়েল চত্বর
দোয়েল চত্বর এখন যেন রঙের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে, ছবি: মাহবুব আলম
বাংলা নববর্ষ মানেই নতুন সূচনা, নতুন স্বপ্ন আর বাঙালির চিরচেনা উৎসবের আবহ। আর সেই আবহকে সামনে রেখে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র দোয়েল চত্বর এখন যেন রঙের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে। নববর্ষ ১৪৩৩ কে ঘিরে এখানে জমে উঠেছে উৎসবের প্রস্তুতি। যেখানে প্রতিটি তুলির আঁচড়, প্রতিটি কারুকাজ যেন বাঙালির ঐতিহ্যের কথা বলে।
দোয়েল চত্বরে পা রাখলেই চোখে পড়ে রঙিন হাড়ির সারি। লাল, সাদা, হলুদ, নীল বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙে সাজানো এসব হাড়ি যেন একেকটি শিল্পকর্ম।
কারিগররা মনোযোগ দিয়ে তুলির আঁচড়ে হাড়ির গায়ে ফুটিয়ে তুলছেন নকশা; কখনো ফুল, কখনো পাখি, আবার কখনো গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। এই হাড়িগুলো শুধু সাজসজ্জার উপকরণ নয়, বরং বাঙালির শিকড়ের সঙ্গে এক গভীর সংযোগের প্রতীক।
একটু এগোলেই চোখে পড়ে ট্যাপা মুখোশ তৈরির ব্যস্ততা। কাগজ, মাটি আর রঙের মিশেলে তৈরি এই মুখোশগুলো বাঙালির লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারিগরদের দক্ষ হাতে মুখোশগুলো পেয়ে যাচ্ছে জীবন্ত রূপ; কখনো হাস্যোজ্জ্বল, কখনো রহস্যময় আবার কখনো পৌরাণিক চরিত্রের আদলে।
আরও পড়ুন:
এসব মুখোশের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। তরুণ-তরুণীরা নিজেদের পছন্দের মুখোশ বেছে নিচ্ছেন, কেউবা আবার দল বেঁধে কিনছেন একই ধরনের মুখোশ, নববর্ষের শোভাযাত্রায় একসঙ্গে অংশ নেওয়ার জন্য।
নববর্ষ উদযাপনকে আরও বর্ণিল করে তুলতে প্ল্যাকার্ড, মাথাল এবং একতারার বিক্রিও চলছে জমজমাট। প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকছে নানা স্লোগান ‘এসো হে বৈশাখ’, ‘শুভ নববর্ষ’ কিংবা সামাজিক সচেতনতার বার্তা। মাথাল, যা একসময় গ্রামীণ জীবনের অংশ ছিল, এখন শহুরে উৎসবেরও অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে একতারা-যা বাউল সংস্কৃতির প্রতীক, তা কিনছেন অনেকেই, শুধুমাত্র সাজসজ্জার জন্য নয়; বরং ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার এক অনন্য প্রয়াস হিসেবে।
এই পুরো আয়োজনের পেছনে রয়েছেন শত শত কারিগর। তাদের হাতের পরিশ্রম আর সৃজনশীলতা ছাড়া এই উৎসবের রঙিন চিত্র কল্পনা করা যায় না। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন, কিন্তু ক্লান্তির মাঝেও মুখে লেগে আছে তৃপ্তির হাসি। কারণ, তাঁদের তৈরি করা প্রতিটি সামগ্রীই হয়ে উঠছে মানুষের আনন্দের অংশ।
নববর্ষের মূল দিন আসার আগেই দোয়েল চত্বরে শুরু হয়ে গেছে উৎসব। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে মানুষজন ঘুরতে আসছেন, কেনাকাটা করছেন, ছবি তুলছেন-সব মিলিয়ে যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তারা শুধু কেনাকাটাই করছে না, বরং এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বাঙালি সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
দোয়েল চত্বরে এই আয়োজন শুধু একটি বাজার নয়, বরং এটি ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অনন্য মিলনস্থল। এখানে যেমন পাওয়া যায় গ্রামীণ শিল্পের ছোঁয়া, তেমনি আধুনিক চিন্তার প্রতিফলনও দেখা যায় প্ল্যাকার্ড বা ডিজাইনে।
বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ কে ঘিরে দোয়েল চত্বর আজ যেন শুধুই একটি স্থান নয়, বরং এক জীবন্ত সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। যেখানে প্রতিটি রঙ, প্রতিটি শব্দ আর প্রতিটি মানুষের হাসি মিলে তৈরি করছে এক অমলিন উৎসবের গল্প, যা বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
জেএস/