শিশুদের মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানোর ভয়াবহ ফল
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো
খাবার টেবিলে বসলেই একটাই দাবি মোবাইল চাই। গান, কার্টুন বা রিল চললেই মুখে খাবার ওঠে আর স্ক্রিন বন্ধ হলেই কান্না, চিৎকার, বায়না। এমন দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং প্রায় প্রতিটি ঘরেই পরিচিত ছবি। প্রশ্ন উঠছেই এই প্রজন্মের শিশুরা কেন খাওয়ার সময় মোবাইল ছাড়া থাকতে পারছে না? আর এই অভ্যাস কি আদৌ নিরাপদ?
চিকিৎসক, মনোবিদ ও মনো-সমাজকর্মীদের মতে, মোবাইল দেখিয়ে সন্তানকে খাওয়ানোর প্রবণতা ধীরে ধীরে ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। বাহ্যিকভাবে কাজটি সহজ মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
খাওয়ার অভ্যাস না কি কেবল গিলতে শেখা?
পেরেন্টিং বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এ ভাবে খাওয়ালে কি শিশু সত্যিই খেতে শেখে? না কি শুধু মুখ খুলে খাবার গিলতে অভ্যস্ত হয়?
ভারতীয় মনো-সমাজকর্মী মোহিত রণদীপের ভাষায়, ‘মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ আটকে থাকলে শিশু না খাবারের স্বাদ বুঝতে পারে, না তার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। অভিভাবকেরা কার্যত তাকে খাওয়াচ্ছেন, শিশুটি নিজে খাচ্ছে না।’
সমস্যার শিকড় কোথায়?
শিশু খেতে না চাইলে তার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন- খিদে না থাকা, শারীরিক অস্বস্তি বা অসুস্থতা, খাবারের স্বাদ বা গন্ধ অপছন্দ হওয়া, জোর করে খাওয়ানোর বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিবাদ। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু খাবার মুখে দীর্ঘ সময় ধরে রেখে দেয়, চিবোয় না এটাই তার প্রতিরোধের ভাষা।
এ ছাড়া অনেক মা-বাবা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার না খেলে চিন্তিত হয়ে পড়েন। মনে হয়, কম খেলে পুষ্টির ঘাটতি হবে। মোবাইল দেখালে যতটা খাওয়ানো যায়, স্বাভাবিক ভাবে তা সম্ভব হয় না এই ধারণা থেকেই স্ক্রিনের উপর নির্ভরতা বাড়ে।
আরও পড়ুন:
সময় বাঁচাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি?
সন্তানের সঙ্গে গল্প করতে করতে, কথা বলতে বলতে খাওয়াতে সময় লাগে। ব্যস্ত জীবনে অনেকের কাছেই সেটি বিলাসিতা। সেখানে মোবাইলে প্রিয় কার্টুন চালিয়ে দিলে দুই ঘণ্টার কাজ আধ ঘণ্টাতেই শেষ করা যায়। কিন্তু এই ‘সহজ সমাধান’ এর খেসারত দিচ্ছে শিশুর শরীর ও মন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের হার আনুমানিক ২.৪ শতাংশ (অর্থাৎ ৫ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে প্রায় ২.৪ শতাংশ ওজন বেশি বা স্থূল)।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ৫ বছরের কম বয়সির স্থূল শিশু সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি বেশি রয়েছে।
স্ক্রিনে চোখ, খাবারে অচেতন মন
মনোবিদেরা বলছেন, মোবাইল দেখতে দেখতে খাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল শিশু বুঝতেই পারে না সে কী খাচ্ছে, কতটা খাচ্ছে। পেট ভরে গেছে কি না, সেই সংকেতও তার মস্তিষ্কে পৌঁছয় না। ফলে অভিভাবকেরা ‘খেয়ে নিচ্ছে’ ভেবে খাওয়াতে থাকেন। এই অভ্যাস থেকেই অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যার পরিণতি স্থূলত্ব।
তাহলে বাস্তবসম্মত সমাধান কী?
অনেকে বলেন, খাওয়ার সময়ে স্ক্রিন টাইম বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা মানা কঠিন এমন যুক্তিও শোনা যায় বহু মায়ের কাছ থেকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একটু বেশি খাওয়ানোর চেয়ে মোবাইল আসক্তির ক্ষতি অনেক বেশি। সেই ক্ষতির দিকটি যদি অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন, সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে।
মনো-সমাজকর্মীদের পরামর্শ
খাওয়ানোর সময় মোবাইল বা টিভি দেওয়া কোনও সমাধান নয়। শিশু যদি কমও খায়, সেটুকু মেনে নেওয়া জরুরি।
অন্যায় বায়নায় প্রশ্রয় দিলে ভবিষ্যতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চিকিৎসকেরা বলেন, খিদে পেলে শিশু নিজেই খাবে, অপেক্ষা করাটাও অভিভাবকের দায়িত্ব।
- খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। রংচঙে, আকর্ষণীয় পরিবেশন শিশুদের আগ্রহ বাড়ায়। ডিমের অমলেট বা পোঁচে গাজর–আঙুর দিয়ে চোখ-নাক বানানো, পালংশাক বা ধনেপাতা দিয়ে সবুজ রুটি তৈরি করা যেতে পারে।
- রান্নার সময় শিশুকে পাশে রাখুন। কী রান্না হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে দেখতে দিলে তার কৌতূহল বাড়ে।
- বইয়ের ছবি বা বাস্তব সবজি দেখিয়ে খাবারটির পরিচয় করান। তার ভাষায় পুষ্টিগুণ বোঝালে আগ্রহ তৈরি হয়।
- একা খাওয়ানোর বদলে পরিবারের বড়দের সঙ্গে বসিয়ে খাওয়ান। অন্যদের খাবারের প্রশংসা শুনলেও শিশুর আগ্রহ বাড়ে।
খাওয়াকে যদি শিশুর কাছে আনন্দের অভিজ্ঞতা করে তোলা যায়, তবে মোবাইলের প্রয়োজন পড়ে না। একটু সময়, একটু ধৈর্য আর সচেতন অভ্যাসই পারে শিশুদের এই নীরব আসক্তি থেকে দূরে রাখতে।
জেএস/