জয়েন্টের ব্যথা কি স্বাভাবিক? যা বলছেন চিকিৎসক

জান্নাত শ্রাবণী
জান্নাত শ্রাবণী জান্নাত শ্রাবণী , সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৪:২৮ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের রিউমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ

হাঁটু, কোমর, আঙুল বা ঘাড়ে ব্যথা এগুলোকে আমরা প্রায়ই হালকাভাবে নেই। অনেকেই ভাবি, বয়স বাড়লে এমন হবেই, কাজের চাপ বেশি বলেই ব্যথা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এসব ব্যথার পেছনে থাকতে পারে গুরুতর রিউমাটিক রোগ, যা সময়মতো ধরা না পড়লে আজীবনের কষ্ট ডেকে আনতে পারে।

রিউমাটিক রোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের নানান প্রশ্ন, ভুল ধারণা ও ভয় সবকিছু পরিষ্কার করতেই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের রিউমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ। প্রশ্ন–উত্তরের ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছে রিউমাটোলজি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও বাস্তব তথ্য।

জাগো নিউজ: রিউমাটোলজি বলতে ঠিক কী বোঝায়? কোন কোন রোগ এই শাখার আওতায় পড়ে?

ডা. আবুল কালাম আজাদ: রিউমাটোলজি হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা, যেখানে মূলত জয়েন্ট, হাড়, পেশি ও শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাজনিত নানান জটিল রোগের চিকিৎসা করা হয়। এই শাখার আওতায় বাত, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস, অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস, গাউটসহ শতাধিক রোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব রোগ শরীরের কিডনি, ফুসফুস, চোখ বা ত্বকেও প্রভাবিত করে।

ছবি: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের রিউমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদছবি: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের রিউমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ

জাগো নিউজ: সাধারণ মানুষ অনেক সময় বাত বা জয়েন্টের ব্যথাকে আলাদা রোগ মনে করেন না। এটা কতটা ভুল ধারণা?

ডা. আবুল কালাম আজাদ: এটি খুবই ভুল এবং বিপজ্জনক ধারণা। জয়েন্টের ব্যথা কোনো রোগ নয় এটি একটি লক্ষণ। এর পেছনে রিউমাটিক রোগ, সংক্রমণ বা অন্য জটিল কারণ থাকতে পারে। ব্যথাকে অবহেলা করে শুধু ব্যথানাশক খেলে মূল রোগ ধরা পড়ে না, বরং রোগ আরও জটিল আকার ধারণ করে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে রিউমাটোলজিক্যাল রোগের হার কেমন? কোন বয়সী মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: বাংলাদেশে রিউমাটিক রোগের হার কম নয়। সব বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হচ্ছে—এমনকি শিশু ও তরুণরাও বাদ যাচ্ছে না। তবে মধ্যবয়সী ও বয়স্কদের মধ্যে রোগের হার তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস ও দেরিতে চিকিৎসা নেওয়াও এর বড় কারণ।

জাগো নিউজ: বাত, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও লুপাস এই রোগগুলোর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

ডা. আবুল কালাম আজাদ: বাত সাধারণত বয়সজনিত বা জয়েন্ট ক্ষয়ের কারণে হয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হলো অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের জয়েন্টকেই আক্রমণ করে। লুপাস আরও জটিল; এটি জয়েন্টের পাশাপাশি কিডনি, ত্বক, হৃদ্‌যন্ত্রসহ শরীরের নানান অঙ্গকে আক্রান্ত করতে পারে।

জাগো নিউজ: কোন কোন লক্ষণ দেখলে অবশ্যই রিউমাটোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: সকালে ঘুম থেকে উঠে দীর্ঘক্ষণ জয়েন্ট শক্ত থাকা, একাধিক জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা, দীর্ঘদিন ব্যথা থাকা, অকারণে জ্বর বা ওজন কমে যাওয়া, ত্বকে র‍্যাশ এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে।

জাগো নিউজ: দীর্ঘদিন জয়েন্টে ব্যথা থাকলে সেটাকে ‘স্বাভাবিক’ ধরে নেওয়া কি বিপজ্জনক?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: অবশ্যই বিপজ্জনক। দীর্ঘদিন ব্যথা মানে ভেতরে কোনো রোগ কাজ করছে। একে স্বাভাবিক ভেবে কাজ করলে জয়েন্ট স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি কর্মক্ষমতাও হারাতে পারে।

জাগো নিউজ: দৈনন্দিন জীবনযাপন রিউমাটিক রোগে কীভাবে প্রভাব ফেলে?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করা এসবই জয়েন্টের ওপর চাপ বাড়ায়। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য ও সঠিক বিশ্রাম রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।

জাগো নিউজ: নারীদের মধ্যে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা লুপাস বেশি দেখা যায় কেন?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: হরমোনজনিত কারণ, জেনেটিক প্রভাব এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে নারীদের মধ্যে এসব অটোইমিউন রোগ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

জাগো নিউজ: মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কি এই রোগগুলো বাড়িয়ে দিতে পারে?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: হ্যাঁ। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে, ফলে রোগের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে বা নতুন করে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

জাগো নিউজ: নিয়মিত ব্যথানাশক খাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক খেলে কিডনি, লিভার ও পাকস্থলীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এটি সাময়িক আরাম দিলেও রোগ সারায় না।

জাগো নিউজ: রিউমাটিক রোগ কি পুরোপুরি ভালো হয়?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: অনেক রোগ পুরোপুরি ভালো না হলেও নিয়মিত চিকিৎসা ও জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এতে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

জাগো নিউজ: ভেষজ বা লোকজ চিকিৎসা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া এসব চিকিৎসা অনেক সময় ক্ষতিকর হয় এবং মূল রোগ ঢেকে রাখে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব এড়িয়ে চলাই ভালো।

জাগো নিউজ: চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে কী জটিলতা হতে পারে?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: জয়েন্ট বিকৃত হয়ে যাওয়া, চলাফেরায় অক্ষমতা, কিডনি বা ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ স্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে এই চিকিৎসা কতটা সহজলভ্য ও ব্যয়বহুল?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: এখন আগের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে এই চিকিৎসা সহজলভ্য হয়েছে। ব্যয় রোগভেদে ভিন্ন হলেও শুরুতেই চিকিৎসা নিলে খরচ ও জটিলতা দুটোই কমে।

আরও পড়ুন:

জাগো নিউজ: নিয়মিত ফলোআপ কতটা জরুরি?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: খুবই জরুরি। নিয়মিত ফলোআপ না করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে না এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ধরা পড়ে না।

জাগো নিউজ: খাদ্যাভ্যাসে কী পরিবর্তন আনলে উপকার পাওয়া যায়?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: সুষম খাবার, শাক-সবজি, ফল, পর্যাপ্ত পানি পান এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উপকারী।

জাগো নিউজ: রিউমাটিক রোগ নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা কী?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: এটি শুধু বয়সজনিত রোগ এই ধারণাটিই সবচেয়ে বড় ভুল।

জাগো নিউজ: সাধারণ মানুষের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা কী?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: ব্যথা অবহেলা করবেন না। সময়মতো সঠিক চিকিৎসাই পারে আপনাকে আজীবন জটিলতা থেকে বাঁচাতে।

জাগো নিউজ: এ রোগগুলো নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: গণমাধ্যমকে ভুল ধারণা ভেঙে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে, যেন মানুষ সচেতন হয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হয়।

জাগো নিউজ: দারুণ সব তথ্য দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সবশেষে পাঠকের উদ্দেশ্যে কি কোনো বার্তা দেবেন?
ডা. আবুল কালাম আজাদ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ সুন্দর আয়োজনের জন্য। সবশেষে পাঠকদের বলবো জয়েন্টের ব্যথা সহ্য করা শক্তির পরিচয় নয়, বরং সচেতনতার অভাবের ফল। সময়মতো বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হলেই রিউমাটিক রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।

জেএস/এমএমএআর/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।