ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. সাহিত্য

তৃতীয় বিশ্বের কবিতায় উত্তর ঔপনিবেশিক ভাবনা ও ঐতিহ্য সচেতনতা

সাহিত্য ডেস্ক | প্রকাশিত: ১২:১৯ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬

মাসুমুর রহমান মাসুদ

তৃতীয় বিশ্বের কবিতা আলোচনার প্রারম্ভে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা গ্রহণ করা আবশ্যক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) শেষে বিশ্বব্যাপী শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ। এ যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ওয়ারশ জোট গঠিত হয়। ন্যাটো সহযোগী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন তথা পশ্চিম ইউরোপ এসব দেশকে বলা হয় প্রথম বিশ্ব। আর সোভিয়েতের পক্ষে থাকা চীন, কিউবা ও তাদের সহযোগী দেশগুলো হলো দ্বিতীয় বিশ্ব। কোনো পক্ষে অংশ না নেওয়া আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া এবং ওশেনিয়ার দেশগুলো হলো তৃতীয় বিশ্ব।

এ সময় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো গড়ে তোলে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন। যার নেতৃত্বে ছিলেন জওহরলাল নেহেরু, সুহার্তো ও টিটো। তৃতীয় বিশ্বের এই দেশগুলোর মধ্যে কিছু দেশ শিল্প উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ, ভারত ও ব্রাজিল। ১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন অবলুপ্তির মধ্য দিয়ে এ স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে।

২.
তৃতীয় বিশ্ব শব্দটি ইংরেজি ‘Third World’-এর বাংলা অনুবাদ। ফরাসি পণ্ডিতেরা তাঁদের নির্মিত অভিধায় ‘Terminology’ সংজ্ঞা জুগিয়েছিলেন যে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ হলো সেইসব দেশ; যেগুলো একদা উপনিবেশ ছিল, বর্তামানে সেই দশা থেকে মুক্ত, কিন্তু হতদরিদ্র, অনুন্নত, অজস্র সমস্যায় লাঞ্ছিত এবং লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এর কাল্পনিক সীমারেখা অন্তর্ভুক্ত।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রথম বিশ্ব নাগরিক। তিনি লিখেছেন যে, এক কোরিয় যুবক তাঁকে তার দেশ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে—তাদের দুঃখই তাদের মেলাবে ক্ষুদ্র বিভেদ ঘুচিয়ে অনড় সংহতি এনে দেবে। তৃতীয় বিশ্বের মিল ওই এক জায়গায়, দুঃখের ভেতরে। ওই দুঃখ ঘোচানোর প্রতিজ্ঞাতেই তৃতীয় দুনিয়ার সমস্ত দেশ নিজেদের একই গোত্রে শনাক্ত করে। অন্যথায় তৃতীয় বিশ্বের মতো পারস্পরিক এত অচেনা দেশ ও মানুষ আর কোথায়?

আফ্রিকার মানুষের শিল্পধারণায় অন্য মাত্রা এসে সংযোজিত হয়। আমরা বুঝতে পারি ইংরেজি, ফরাসি এবং ওলন্দাজ উপনিবেশের খাত বেয়ে আসা ইউরোপীয় শিল্পতত্ত্ব অবিসংবাদী ও চূড়ান্ত নয়। বুঝতে শিখি, সাহিত্যের মতো শিল্পতত্ত্বও স্বদেশের মাটিতে জন্মায়। বিদেশ থেকে আমদানি করলে ভিন্ন ধরনের এক উপনিবেশ চৈতন্যের উপনিবেশের স্বখাত সলিলে ডুবে মরা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

৩.
উত্তর উপনিবেশবাদ তত্ত্বের উদ্ভব ও যাত্রা সাধারণ রাজনৈতিক পরিবেশের বিরোধিতা থেকে। যাকে সর্বপ্রথম কেতাবি রূপ দেন ‘ফ্রঁৎস ফ্যানন’ (১৯২৫-১৯৬১)। তাঁর ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস’ ১৯৫২ সালে এবং ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। দুটি বই প্রকাশের মাধ্যমে তিনি দেখান, উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এগোয়।
প্রথম পর্যায়: উপনিবেশিক জাতি রাজনৈতিক চেতনা লাভ করে।
দ্বিতীয় পর্যায়: জাতি তার আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে চায় নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনরাবিষ্কার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
তৃতীয় পর্যায়: সরাসরি সংঘর্ষের মধ্যদিয়ে।

ভারতবর্ষে ‘সাঁওতাল ও মুন্ডা আন্দোলন’কে বৃটিশরা ‘বিদ্রোহ’ বলে আখ্যায়িত করলেও তা মূলত ছিল একধরনের স্বাধীনতা আন্দোলন। কেবল অরণ্যের অধিকার ফিরে পাওয়ার প্রতিবাদ নয়, তাদের আদি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লড়াইও ছিল ওই আন্দোলন। আত্ম ঐতিহ্য চেতনা উদ্ভাবন ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রাখেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, এডওয়ার্ড উইলিয়াম সাঈদ, হোমি ভাবা, স্টুয়ার্ট হল, অনিয়া লুম্বা, জ্ঞান প্রকাশসহ আরও অনেকে।

অস্তিত্বের সংকট আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে নাইজেরিয়ান লেখক ‘আলবার্ট চিনুয়ালুমোগু আচিবে’র নিকট। তিনি পশ্চিমা লেখকদের সান্নিধ্যে থেকে বুঝতে পারেন এসব লেখক আফ্রিকাকে ‘অন্ধকার মহাদেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। যেখানে মানুষকে চিহ্নিত করা হচ্ছে অসভ্য, বর্বর ও নির্বোধ। পশ্চিমা সাহিত্যে আফ্রিকার মানুষকে ‘অমানবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার গভীর সাংস্কৃতিক রাজনীতি চালাচ্ছে। এই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘থিঙ্কস ফল এপার্ট’ (১৯৫৮); যা শুধু সাহিত্যিক নয়, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধের এক দলিল।

৪.
এভাবে তৃতীয় বিশ্বের কবিরাও এগিয়ে আসেন আত্মজাগরণ ও ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারের নিমিত্তে। কবিতার মধ্যদিয়ে নিজ দেশের ও জাতির আত্মপরিচয় উদ্ঘাটনের একটি সাহিত্যিক প্রতিরোধ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলে তাদের লেখনীতে।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরিকোস্ট ১৮৪২ সালে ফরাসি প্রটেক্টরেট (সুরক্ষিত অঞ্চল) হিসেবে শুরু হয় এবং ১৮৯৩ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরাসি উপনিবেশে পরিণত হয়। ফরাসি উপনিবেশ হিসেবে এর শাসনকাল ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত চলে, যখন এটি ফরাসি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। আইভরিকোস্টের লেখক বানার্ড বিনলিন দোদি (১৯১৬-২০১৯) শৈশবে উপনিবেশবাদের অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত হন। দোদি তার লেখায় আফ্রিকান লোককাহিনির বার্তাগুলোকে সমসাময়িক বিশ্বের সাথে সংযুক্ত করার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হন। তার ‘হাতের রেখাগুলো’ কবিতায় তিনি অস্তিত্বের সংকট ও ঐহিত্যের জাগরণ তুলে ধরেন—
‘আমাদের হাতে যে সকল রেখা
সেই রেখাগুলো কি জীবনের
নিয়তির
হৃদয়ের
ভালোবাসার?’

তিনি সুদূর অতীতের সাথে বর্তমানের সাঁকো তৈরির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। লৌকিকতার স্রোতে গা না ভাসিয়ে ঐতিহ্যের প্রতি অম্লান রয়েছেন স্মৃতি গন্ধের দ্যোতনায়—
‘আমি সেই লোক যার বিপক্ষে নালিশ করে তারা
কারণ লৌকিকতার বিরোধী বলে’

বাতাসের সাথে তিনি উড়ে যেতে চান পুরোনো দিনের জীবনের স্তূপে, যেখানে তাঁর আদি পুরুষরা দিনাতিপাত করেছিলো—
‘তাকে তোমরা স্পর্শ করতে পারবে না
তোমাদের বাতাস স্পর্শ করে এবং বিলীন হয়ে যায়
বাতাসে পাতা ওড়ে, আমি উড়ে যাই সেই স্তূপস্বপ্নের ভিতর।’
(অনুবাদ: হামিদ রায়হান)

৫.
এঙ্গোলা ছিল পর্তুগালের একটি উপনিবেশ, যা প্রায় ৫শ বছর ধরে পর্তুগিজ শাসনের অধীন ছিল। বিভিন্ন খনিজ যেমন- বক্সাইট, হীরা, সোনা এবং তেলের বিশাল মজুতের কারণে এঙ্গোলা পর্তুগালের উপনিবেশ হিসেবে শাসিত হচ্ছিল। ১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর পর্তুগালের কাছ থেকে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু ততদিনে সব মূল্যবান সম্পত্তি লুট হয়ে যায়। প্রাচুর্যের এঙ্গোলা ও তার মানুষ হয়ে যায় নিঃস্ব।

আগাস্তিনো নেতা (১৯২২-১৯৭৯) দেশটির স্বাধীনতা যুদ্ধের আন্দোলন—এমপিএলএ’র নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হলে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি এঙ্গোলার প্রথম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একাধারে একজন কবি, চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। সাহিত্যকীর্তির জন্য এঙ্গোলার প্রধান কবি হিসেবে গণ্য হন। তাঁর ‘প্রাচীন কালো মানুষ’ কবিতায় এঙ্গোলার মানুষের অস্তিত্বে সংকট চিত্রিত হয়। উঠে আসে সর্বস্ব লুট হয়ে যাওয়ার চিত্র—
‘বেঁচে দিয়েছে
চালান হয়ে গেছে জাহাজে
চাবুক খেয়েছে মানুষের
থেঁতলে গুঁড়িয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে
বড় বড় শহরগুলিতে’

অস্তিত্বের এই সংকট চরম আকার ধারণ করেছে এতটাই, যেখানে এঙ্গোলার মানুষ তার ন্যাংটি পর্যন্ত হারিয়েছে বলে কবি উল্লেখ করেন—
‘প্রাচীন কালো মানুষ
ন্যাংটো
কালের গর্ভে বিলীন
স্থানের বিস্তারে নিঃসঙ্গ!
কোমর জড়ানো তার নেংটি যখন সামনে দিয়ে চলে যায়
ওরা তখন গুঞ্জন করে ওঠে’
(অনুবাদ: কবীর চৌধুরী)

ঐতিহ্যের প্রতি তার সচেতনতা উপলব্ধ হয় কবিতার পঙক্তিতে। তখন বসতি কম ছিল, মানুষ ছিল স্বনির্ভর। প্রাচুর্যে ভরা এঙ্গোলার ঐতিহ্য ছিল ঐক্যবদ্ধতার। যেসব মানুষকে বলা হয় বর্বর; তারাই মূলত এঙ্গোলাকে আলো দেখিয়েছেন। ‘ছায়ামিছিল’ কবিতায় উঠে এসেছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি—
‘আমার মনে পড়ছে সেইসব পথ
যাতে কোনো মানুষ চলেনি
মনে পড়ছে দূরাগত কণ্ঠস্বর
সেইসব লোকের যাদের কণ্ঠে গান ছিল না
সেইসব সুখী দিন মনে আসছে আমার
যাদের অস্তিত্ব ছিল স্বল্পায়ু
কায়াহীন প্রাণকে শরীরী রূপ দেব আমি
যেখানে শুধু অন্ধকার সেখানে আমি আলো দেখি।’
(অনুবাদ: হায়াৎ মামুদ)

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা ও গবেষণা শিক্ষার্থী, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়।

এসইউ

আরও পড়ুন