বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১১৯ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২ শতাধিক সাংবাদিক
ছবি: বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে অন্তত ১১৯টি ঘটনায় ২৪৩ জনের অধিক সাংবাদিক বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মিডিয়া ওয়াচডগ ও থিংকট্যাক বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর। তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, গত দেড় বছরে একদিকে অনলাইন নিউজপোর্টালগুলোকে লাগামহীন নিবন্ধন প্রদান করা হয়েছে; অন্যদিকে, সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসা নিপীড়নের খড়গ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ড. ইউনূসের সরকার।
বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর ‘সেইফটি ট্র্যাকারের’ মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটা ঘটনাগুলো নিয়মিত রেকর্ড করে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও (৮ আগস্ট, ২০২৪ - ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) কাজটি চলমান ছিল। সেই সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে মিডিয়া মনিটরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে যাওয়া ও দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার অনধিক ১০ ঘটনায় ৩২ জন সাংবাদিককে কারাবরণ ও জবাবদিহি করানো হয়। আরও চারটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, পাঁচজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সংবাদ করার কারণে মামলা দায়ের হয় ও মামলার হুমকি প্রদান করা হয়।
এ সরকারের আমলে হত্যা, আত্মহত্যা ও মরদেহ উদ্ধার হয় সাতজন সাংবাদিকের। তারা হলেন, আলী মাহমুদ, রানা প্রতাপ বৈরাগী, ইমদাদুল হক মিলন, আ.স.ম. হায়াত উদ্দীন, বিভুরঞ্জন সরকার, স্বর্ণময়ী বিশ্বাস ও মো. আসাদুজ্জামান তুহিন। এরমধ্যে বিভুরঞ্জন সরকার ও স্বর্ণময়ী বিশ্বাস আলাদা আলাদা কারণে আত্মহত্যা করেছেন। আর জাতীয় প্রেস ক্লাবের শৌচাগার থেকে দৈনিক দিনকালের সাংবাদিক আলী মাহমুদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাকিরা হত্যার শিকার।
পর্যবেক্ষণ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক আক্রান্তের হার দেখা যায় হামলার ঘটনায়। সংবাদ সংগ্রহ, প্রচার ও প্রকাশের কারণে ৩৮টি হামলার ঘটনায় ৭৯ জনের অধিক সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ সরকারের শাসনামলেই ঢাকাস্থ প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর এ হামলার ঘটনায় অন্তত ২৮ থেকে ৩০ জন সাংবাদিক ও কর্মী আটকা পড়েছিলেন। হামলাকারীরা ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করলে সংবাদকর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে ছাদের ওপর আশ্রয় নেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও দমকল বাহিনীর সহায়তায় দীর্ঘ চার ঘণ্টা পর উদ্ধার হন। নিউ এইজ পত্রিকার বর্ষীয়ান সাংবাদিক নুরুল কবিরের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়। হামলার পর ডেইলি স্টার তাদের ৩৫ বছরের ইতিহাসে এবং প্রথম আলো তাদের ২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার (নির্ধারিত ছুটি ছাড়া) প্রকাশনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। সেদিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ রাখা হয়েছিল।
সবচেয়ে বেশি হামলায় আক্রান্ত সাংবাদিকদের চিহ্নিত করা হয় গত ২৬ জানুয়ারি ও ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় নরসিংদীর পাঁচদোনা এলাকায় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলায় অন্তত ১০জন সাংবাদিক আহত হন ২৬ জানুয়ারি। এছাড়া, ৬ ফেব্রুয়ারি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানের সংবাদ সংগ্রহের সময় ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এদিনে অন্তত ১০ জন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হামলার প্রমাণ নথিভুক্ত করে বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর।
সংবাদ সংগ্রহকালীন সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনাও কম নয়। এই সরকারের আমলে অন্তত ৩২টি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আক্রোশে অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এতে শারীরিকভাবে আহত হওয়া ছাড়াও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ‘ভার্বাল অ্যাবিউজ’ করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম ১০ দিনে সংঘটিত তিনটি ঘটনায় অন্তত নয়জন সাংবাদিক আক্রমণের শিকার হন। এছাড়াও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অন্তত নয়জন সাংবাদিক এ দিন আক্রমণের শিকার হন।
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের কারণে অনলাইন অফলাইন সর্বত্রই সাংবাদিকদের হুমকির শিকার হতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৫টি ঘটনায় ৩৫ জনের অধিক সাংবাদিককে হুমকির মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে মৃত্যুর হুমকি ও আগুনে পুড়িয়ে মারার হুমকিও রয়েছে।
এই সরকারের আমলেই ‘ওপর মহলের চাপ’ ও কিছু ক্ষেত্রে কারণ দর্শানো ছাড়াই সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তিনটি ঘটনায় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যান্য আরও আটটি ঘটনায় ১৫ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্টস বক্সে ছবি তোলার কারণে ডেইলি সানের ফটোসাংবাদিক তানভিন তামিমের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করার হুমকি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ইমেইলের মাধ্যমে প্রদান করে। এই ঘটনায় ক্রীড়া-সাংবাদিকরা অদম্য কাপের ফাইনাল ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন।
এছাড়াও সংবাদমাধ্যমের ওপর নানা ধরনের চাপ লক্ষ্য করা যায়। গত ১৭ জানুয়ারি ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা দ্য ডিসেন্টের ফেসবুক পেজ মিথ্যা কপিরাইটের কারণে আনপাবলিশড হয়ে যায়। এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসন ১১টি স্থানীয় পত্রিকার সংবাদ প্রকাশের ক্ষমতা রহিত করেন। নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছিল বাংলা এডিশনের। ইন্টারনেট ব্লক করে রাখা হয়েছিল বিডি টুডে ডট নেট নামে একটি পোর্টালও।
যদিও, শুরুর দিকে দিগন্ত টেলিভিশন পুনঃপ্রচার ও আমার দেশ পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের অনুমতি প্রদান করে সংবাদমাধ্যমের অবাধ ও সুষ্ঠু স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় সরকার। শাসনামলের বিভিন্ন সময় অনেকগুলো অনলাইন নিউজ পোর্টালকে অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টাশাসিত তথ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: দ্য নিউজ , ভয়েজ অব লিডার্স, দেশকাল নিউজ, বিডিক্রিকটাইম, ঢাকা মেইল, খেলা ডট কম, মিরর নিউজ ও অন্যান্য অনলাইন পত্রিকা। এর বাইরে বাকি অনুমোদন পাওয়া অনেক পোর্টালের সংবাদ ও সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কেএএ/