সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা-৪, প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তব সমাধান চান ভোটাররা
ঢাকা-৪ নির্বাচনি আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা/ ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর শ্যামপুর কদমতলী থানা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ নির্বাচনি আসন। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এখানে সমস্যার শেষ নেই। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষের পাশাপাশি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাস। তবে নিত্যদিনের জীবন এখানে সংকটে ঘেরা। জলাবদ্ধতা, সংকীর্ণ সড়ক, বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব, মশার উপদ্রব, মাদক ও চাঁদাবাজি, গ্যাস ও প্রয়োজনীয় পানির সংকটসহ একের পর এক সমস্যায় জর্জরিত এলাকার বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থান করলেও এই জনপদের সমস্যা যেন দেখার কেউ নেই—অবহেলা আর বঞ্চনাই এখানে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্যামপুর–কদমতলী থানা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসনের মানুষ দেশের অন্যান্য এলাকার মতোই প্রায় সব ধরনের নাগরিক সমস্যার মধ্যেই বসবাস করছেন। তবুও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন তারা। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—এবার যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি যেন কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উন্নয়নে হাত দেন।
নির্বাচনি আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থীরা হলেন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ ফিরোজ আলম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের মোহাম্মদ জাকির হোসেন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের সাহেল আহমেদ সোহেল, জনতার দলের মো. আবুল কালাম আজাদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সৈয়দ মো. মোসাদ্দেক বিল্লাহ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির তানভীর আহমেদ রবিন ও বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামের সৈয়দ জয়নুল আবেদীন।
আরও পড়ুন
ইসির স্মার্ট অ্যাপে মিলবে ভোটকেন্দ্রের সব তথ্য
পুরান ঢাকায় তালা বিক্রি বেড়েছে, দখল-ভয়ের রাজনীতি ফিরে আসছে
কে জিতবে নির্বাচনে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০৬ জন। যা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৯টি বেশি ভোট। এবার ভোটারদের মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৮৬ হাজার ৪৬৭ এবং নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৪ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের ৫ জন।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে প্রার্থী এলাকার সমস্যার সমাধানে প্রতিশ্রুতি দেবেন তাকে জনগণ ভোট দেবেন বলে তাদের ধারণা।
এলাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এখানে প্রধার সমস্যা হলো গ্যাস সংকট। এছাড়া পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যাও আছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো নেই। সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমে থাকে। এগুলো দেখার কেউ নেই। এছাড়াও বাড়ছে মাদক ও চাঁদাবাজি। রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় উঠতি বয়সের যুবকদের আচার-আচরণ ও যখন তখন দলবেঁধে সমবয়সী বা অন্য কাউকে মারধরের ঘটনা ঘটে।
মুন্সীবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. আবুল হাসেম জাগো নিউজকে বলেন, শ্যামপুর ও কদমতলী এলাকায় সমস্যার শেষ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কম থাকায় এলাকার সন্তানদের অন্য এলাকায় গিয়ে লেখাপড়া করতে হচ্ছে।
জুরাইনের বাসিন্দা আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, এই এলাকায় খুবই ঘনবসতিপূর্ণ ও শ্রমজীবী মধ্যবিত্ত মানুষ থাকেন। এলাকার প্রধান সমস্যা, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা সংকীর্ণ রাস্তা, খাওয়ার পানি সংকট, মশার উপদ্রব, গ্যাস সংকট। এছাড়া মাদক ও চাঁদাবাজি।
তিনি বলেন, যে প্রার্থী এলাকার সমস্যা নিয়ে কাজ করবেন ও সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেবেন তাকেই মানুষ ভোট দেবেন বলে আমার ধারণা।
এখানকার আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির তানভীর আহমেদ রবিন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সৈয়দ জয়নুল আবেদীন।
এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলে বিএনপি নেতা তানভীর আহমেদ রবিন জাগো নিউজকে বলেন, এলাকায় আমি দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। গত ১৭ বছর ভালোভাবে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারিনি। তবে দলের নেতাকর্মীসহ অন্যদের পাশে ছিলাম। নির্বাচন সামনে রেখে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা-সমাবেশ করে জনসম্পৃক্ততা তৈরি করছি।
এই এলাকা সবচেয়ে অবহেলিত উল্লেখ করে তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, আমার বাবা এই এলাকায় ওয়াসার পানির ব্যবস্থা করেছিলেন। বেশ কিছু রাস্তাও তৈরি করেছিলেন। কিন্তু গত ১৮ বছরে এলাকার তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। আওয়ামী লীগ আমলে এলাকার উন্নয়নের চেয়ে লুটপাট বেশি হয়েছে।
তানভীর আহমেদ রবিন নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। ইশতেহারে জলাবদ্ধতা নিরসন, মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূল, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন, যুব কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তিনি বলেন, আমার বাবা সালাউদ্দিন আহমেদ এলাকার রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার ঘটিয়েছেন। আমিও নির্বাচিত হলে এলাকার জনগণের জন্য কাজ করবো।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা-৪ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচিত হলে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটা সমাজ গঠন করবো আমি।
তিনি বলেন, ঢাকার অবহেলিত সিটি করপোরেশন এলাকায় তরুণ ও শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, পার্ক, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠাগারও সমাজের সার্বিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হবে।
আরও পড়ুন
উৎসবের ভোটে মব আতঙ্ক
ভোটের মাঠে নারী ইস্যু: ক্ষমতায়ন নয়, বিতর্কের হাতিয়ার বলছেন বিশ্লেষকেরা
নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে দেশের মানুষের হতাশার শেষ থাকবে না
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির ফিরোজ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের, ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৮, ৫৯, ৬০ এবং ৬১ এই নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত আসনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হলো- মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে বুড়িগঙ্গা সেতু, পোস্তগোলা সেনানিবাস, পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট, জুরাইন কবরস্থান ধোলাইরপাড় ও শ্যামপুর শিল্প এলাকা।
তিনি বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ ও মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী মানুষের সংমিশ্রণে গঠিত এলাকায় পরিবেশ দূষণ জলাবদ্ধতা সংকীর্ণ রাস্তা মাদক চাঁদাবাজি গ্যাস ও পানি সংকট রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে এই এলাকার মানুষ মশার প্রকোপের শিকার হচ্ছেন। সম্ভবত গত বছর মশার কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন এই এলাকায়।
ফিরোজ আলম বলেন, এলাকার এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি কলকারখানাগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ সার্বিক উন্নয়নে কাজ করা হবে।
ময়লার ভাগাড়ে বসে ইশতেহার ঘোষণা করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান। এলাকার দখল দূষণ আর নাগরিক অবহেলার চিত্র তুলে ধরে এমপি হটলাইন চালু, টেকসই জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, ওয়াসা ও তিতাসকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং খেলাধুলাও সাংস্কৃতিক জায়গা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এফএইচ/এমআইএইচএস