খামেনি হত্যাকাণ্ড
বাংলাদেশের বিবৃতি ঘিরে সমালোচনা, সরকার বলছে ‘ব্যালেন্সিং কূটনীতি’
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিবৃতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চলছে নিন্দা ও শোক প্রকাশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরপর দুদিন দুটি বিবৃতি দিয়েছে। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
রোববার (১ মার্চ) সরকারের দেওয়া প্রথম বিবৃতিতে ইরানে হামলার কোনো নিন্দা না জানানো এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করে কেবল ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করায় দেশের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিশ্লেষক ও নেটিজেনদের একাংশ।
সমালোচনার মুখে সোমবার (২ মার্চ) তিন লাইনের আরেকটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। তবে নতুন বিবৃতিতেও হামলাকারী দেশগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমালোচনার পর সরকার শোক প্রকাশ করায় ইতিবাচক বার্তা গেলেও হামলাকারী দেশের নাম এড়িয়ে যাওয়ায় নীতি ও ন্যায়নীতির প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আমরা হয়তো বড় শক্তির বিরুদ্ধে কিছু করতে পারি না, কিন্তু অন্তত নিন্দা জানানো তো সম্ভব। নতুন সরকার—তাই ভুলভ্রান্তি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।-সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ
সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার রোববার যে বিবৃতি দিয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সব সময় বাংলাদেশ মোটামুটি একটি নীতি অনুসরণ করে এসেছে। বাংলাদেশ নৈতিকতার পক্ষে ও ন্যায়নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’
আরও পড়ুন
খামেনি হত্যা আন্তর্জাতিক আইন-নীতির সরাসরি লঙ্ঘন: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
জরুরি বৈঠক ডেকে যেসব পদক্ষেপ নিলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
তিনি বলেন, ‘কিন্তু এবার আমরা যা দেখলাম, তা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালিয়েছে। প্রথম সারির নেতাদের হত্যা করেছে। বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করেছে। এমনকি স্কুলে বহু শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এসব ঘটনার কোনো উল্লেখই সরকারি বিবৃতিতে নেই।’
মুন্সি ফয়েজ বলেন, ‘ইরান তার আত্মরক্ষার স্বার্থে পাল্টা জবাব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ইরানের পাল্টা হামলাকে পুরোপুরি পরিপন্থি বলা কঠিন। বরং প্রাথমিক হামলাই আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি ছিল।’
বাংলাদেশের অবস্থানকে ব্যালেন্সিং কূটনীতি বলা যায়। বিভিন্ন দেশ নিজেদের কূটনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেয়, আমাদের বিবৃতিও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এসব হামলার নিন্দা না করে আমরা তখন নিন্দা জানাই, যখন আক্রান্ত দেশ পাল্টা প্রতিরোধ করে। সরকারের দেওয়া বিবৃতিটি আমার কাছে অত্যন্ত হতাশাজনক মনে হয়েছে।’
মুন্সি ফয়েজ মন্তব্য করেন, ‘আমরা হয়তো বড় শক্তির বিরুদ্ধে কিছু করতে পারি না, কিন্তু অন্তত নিন্দা জানানো তো সম্ভব। নতুন সরকার—তাই ভুলভ্রান্তি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।’
তবে সোমবারের বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার দ্রুত নতুন বিবৃতিতে অন্তত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেছে—এটি ইতিবাচক দিক।
রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া লেখেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকা নিয়ে গেছে। প্রেস রিলিজের শুধু লোগোটা বদলে দিলেই মনে হবে হোয়াইট হাউজ থেকে এসেছে, মাশাআল্লাহ। পররাষ্ট্রনীতিতে মাথা উঁচু করে বাঁচার দিন শেষ।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থানকে ব্যালেন্সিং কূটনীতি বলা যায়। বিভিন্ন দেশ নিজেদের কূটনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেয়, আমাদের বিবৃতিও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।’
তিনি বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্ব খামেনিকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন চোখে দেখে—ডিক্টেটর বা ফ্যাসিস্ট হিসেবে আখ্যা দেয়। অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের অনেকেই ধর্মীয় বা ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অবস্থান ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে। তাই বাংলাদেশের বিবৃতিও মূলত রাজনৈতিক বিবৃতি।’
রোববারের বিবৃতি নিয়ে নিজের দ্বিমত তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘কূটনীতিতে সাধারণত কৌশলী ভাষা ব্যবহার করা হয়—‘কনসার্ন’ বা ‘কনডেম’—এ ধরনের শব্দ পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োগ করা হয়। তবে আদর্শগতভাবে সব ধরনের সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেই অবস্থান থাকা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘যদি আমরা সত্যিকারের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চাই, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও নন-ইন্টারফেরেন্স নীতির ওপর ভিত্তি করে অবস্থান নিতে হবে। নিজের ক্ষেত্রে যেমন নীতি চাই, অন্য ক্ষেত্রেও একইভাবে বলতে হবে।’
সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে দুটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও বিবৃতি দেওয়া হবে।
গত শনিবার গভীর রাতে (রোববার ভোরে) ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চপর্যায়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানানো হয়। পাশাপাশি শিশুসহ বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শোক ও নিন্দা জানিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনি হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও একে আন্তর্জাতিক আইনের ‘লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে ইরানের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান।
হামলার জবাবে ইরান পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অঞ্চলে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলে নিন্দা জানায়। তবে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং ইরানে প্রাথমিক হামলারও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।
বিবৃতিটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সতর্ক করে জানায়, চলমান সংঘাত আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এর আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় শনিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরে দেওয়া এক বিবৃতিতে অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফেরার আহ্বান জানানো হয়।
খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে। বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার প্রতিবাদ দেখা যায়। ঢাকায় বিক্ষোভের ঘোষণা দেয় জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও এক ফেসবুক বার্তায় শোক প্রকাশ করেন, যদিও তিনিও হামলাকারী দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেননি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরেকটি বিবৃতি দিয়ে ইরানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সব পক্ষকে উত্তেজনা পরিহার ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানায়।
জেপিআই/এএসএ