হাতিরঝিলে রহস্যময় বৃদ্ধ
হাতিরঝিল পুলিশ প্লাজার অদূরে গুদারাঘাট অভিমুখী চৌরাস্তার গোল চত্বরের একটি গাছের ছায়ার নিচে বসে রয়েছেন সাধক/ছবি: মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মঙ্গলবার দুপুরে হাতিরঝিল পুলিশ প্লাজার অদূরে গুদারাঘাট অভিমুখী চৌরাস্তার গোল চত্বরের একটি গাছের ছায়ায় কমলা রঙের পোশাক পরিহিত এক বৃদ্ধ দুই চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন। এ সময় একজন মধ্যবয়সী নারী তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলেন। যানবাহনের শব্দ ও মানুষের তাড়াহুড়া থাকলেও এই দৃশ্য পথচারীসহ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল।
রহস্যময় উপস্থিতি
বৃদ্ধের পরিচয় এখনও অজানা। কেউ তাকে সাধক বলেন, কেউ দরবেশ বা ফকির। তবে নিজে কোনো স্পষ্ট উত্তর দেন না। নাম বা পরিচয় জানতে চাইলে আকাশের দিকে তাকিয়ে নীরবভাবে ইশারা করেন। কখনও ঝোলা থেকে বের করে দেন তবারক। অনেকেই শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করেন, আবার কেউ এড়িয়ে যান।
স্থানীয় চায়ের দোকানদার হাসান জানান, গত দু-তিন মাস ধরে এই বৃদ্ধ এখানে বসছেন। যারা পীর-ফকির বা মাজারে বিশ্বাস করেন, তারা বেশি আসেন। কেউ খাবার কিনে দেন, কেউ সেবা করেন। যারা আসেন, তাদের বেশিরভাগই গরিব মানুষ।
রিকশাচালক সেলিম বলেন, ‘প্রথমে শুধু কৌতূহলবশত দেখতে থেমেছিলাম। পরে মনে হলো লোকটা আলাদা। মাঝে মাঝে খাবার দিয়ে যাই।’

পাশের এক দোকানকর্মী যোগ করেন, অনেকে মনে করে উনি আধ্যাত্মিক মানুষ, আবার কেউ মনে করে মানসিক ভারসাম্যহীন অথবা মাজার ভক্ত। কিন্তু যাই হোক, মানুষ তাকে সম্মান করেই দেখে।
ধ্যানমগ্ন এক নীরবতা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দিনের বেশিরভাগ সময়ই বৃদ্ধকে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে দেখা যায়। মুখে প্রশান্তির ছাপ, শরীর স্থির—যেন গভীর ধ্যানে নিমগ্ন। চারপাশে হর্ন, ভিড়, শব্দ থাকলেও সবকিছুই যেন তার চিন্তার বাইরে।
তার ভক্তরা কখনও তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, কেউ পানি বা খাবার এগিয়ে দেন। তিনি নীরবে তা গ্রহণ করেন এবং খুব কম কথা বলেন। এই নীরব উপস্থিতিই মানুষের মধ্যে এক অদৃশ্য টান তৈরি করেছে।
বৃদ্ধের পরিচয় জানতে টহলরত দুই পুলিশ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, অন্যদের মতো আমরা তাকে এখানে বসে থাকতে দেখেছি। তার সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানি না। কোনো অভিযোগ পেলে তখন খোঁজ নেব।
মানবিকতার এক ক্ষুদ্র বলয়
যে শহরে প্রতিদিনের ব্যস্ততায় মানুষ মানুষের খোঁজ নিতে ভুলে যায়, সেই শহরের এক কোণে প্রতিদিন গড়ে উঠছে ছোট্ট মানবিক বলয়। এখানে নেই কোনো সংগঠন, নেই প্রচার—শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সহমর্মিতা। কেউ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার দেন, কেউ সময় দেন, কেউ কেবল পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই দৃশ্য পথচারীদের থামিয়ে দেয়, ভাবতে বাধ্য করে।
প্রশ্নের শেষ নেই
কে এই বৃদ্ধ? তিনি কি কোনো আধ্যাত্মিক সাধক, নাকি জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হারিয়ে যাওয়া এক সাধারণ মানুষ? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। তবে তার নীরব উপস্থিতি প্রতিদিন এই ব্যস্ত নগরীতে এক ভিন্ন বার্তা দেয়—মানুষ এখনো মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে।
এমইউ/এমআরএম