ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: মামলা কমলেও কাটছে না ভয়
প্রতীকী ছবি
ডিজিটাল প্রযুক্তিতে জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সাইবার অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কথা বলে করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আইন হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছিল, আইন প্রয়োগের চাইতে অপপ্রয়োগই হয়েছে বেশি। নানান সমালোচনার পর এ আইনে মামলা কমেছে। কমেছে গ্রেফতারও। তবে কয়েক বছরে যে ভীতি ছড়িয়েছে, তা তেমন কমেনি।
২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আইনটিতে বলা হয়, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আগের মতো সাংবাদিক হেনস্তা হচ্ছে না
এক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেফতার করতে পারবে বলে আইনে বিধান রাখা হয়।
এই আইনটি হওয়ার পর থেকেই মামলা হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই হতে থাকে বাড়াবাড়ি। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে কেউ কেউ ব্যবহার করেন এই আইন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার ঝুমন দাস-ফাইল ছবি
তথ্য ও মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিনের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২০১৮ সালে ৩৪টি, ২০১৯ সালে ৬৩টি, ২০২০ সালে ১৯৭টি, ২০২১ সালে ২৩৮টি মামলা হয়। ধারাবাহিকভাবে টানা চার বছর মামলার সংখ্যা বাড়ার পরের বছরে তা কমে আসে। ২০২২ সালে এ আইনে মামলা হয় ১২২টি।
আরও পড়ুন: আইসিটি মামলায় সাংবাদিক গ্রেফতার বন্ধে আইন পাস প্রয়োজন
অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য মতে, ২০২১ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ অনুযায়ী রাজধানীতে মামলা হয়েছে ৩৪৬টি। এতে গ্রেফতার করা হয়েছে ২১০ জনকে। ২০২২ সালে এই আইনে মামলা হয়েছে ২৮৬টি, গ্রেফতার করা হয়েছে ২০৫ জনকে। অর্থাৎ পুলিশের হিসাবেও ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে রাজধানীতে মামলা-গ্রেফতার দুটোই কমেছে।
তবে এই আইনের যারা ভুক্তভোগী, এ নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বলছেন, ইদানীং মামলা-গ্রেফতার কমলেও মন থেকে আতঙ্ক যাচ্ছে না। এখনো কোনো কিছু লিখতে গেলে ভাবতে হয় সেই আইনের কথা।
২০২১ সালের জুলাই মাসে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে স্থানীয় এক সরকারি হাসপাতালে যান সাংবাদিক তানভীর হাসান তানু। পরে হাসপাতালটির খাবারের মান নিয়ে প্রতিবেদন করায় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হাসপাতালের মান ক্ষুণ্নের অভিযোগে তানুসহ দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। এরপর পুলিশ গ্রেফতার করে তানুকে। জামিনে থাকলেও এখনো নিয়মিত হাজিরা দিতে হয় তাকে।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: মেয়র তাপসের মামলায় ছাত্রলীগ নেতা রিমান্ডে
জাগো নিউজকে তানু বলেন, ঠাকুরগাঁও থেকে রংপুরে গিয়ে আমাকে হাজিরা দিতে হয়। টাকা যেমন খরচ হয় তেমনি জামিন না পাওয়া নিয়েও ভয়ে থাকি। একটা ভোগান্তির মধ্যে রয়েছি। মামলার পর থেকে এখন কোনো অপরাধের তথ্য পেলেও প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে অনেক ভাবতে হয়। আবার কোনো মামলার আসামি হই কি না, সে আতঙ্কে থাকি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার শিক্ষক রুমা সরকার-ফাইল ছবি
‘পাপিয়ার মুখে আমলা, এমপি, ব্যবসায়ীসহ ৩০ জনের নাম’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করায় ২০২০ সালের ৯ মার্চ মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শেখর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শেরে বাংলা নগর থানায় মামলা করেন দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ও রিপোর্টার আল-আমিনের বিরুদ্ধে। পরে মামলাটি খারিজ করে দেন আদালত।
আরও পড়ুন: উসকানিমূলক পোস্ট না করার শর্তে জামিন পেলেন ঝুমন দাস
মামলা থেকে বেঁচে গেলেও ভয় থেকে গেছে মামলার ভুক্তভোগীদের। ওই মামলার আসামি সাংবাদিক আল-আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে নিজেই নিউজ করার আগে এখন সেন্সর করতে হয়। কারণ নিউজ লেখার পর মামলা খেতে হবে কি না, কী ধরনের চাপ বা হুমকি আসে, এগুলো চিন্তা করতে হয়। এই আইনটা বাতিল করা উচিত।
শুধু সাংবাদিকরা নন, এই আইনে মামলার শিকার হয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদসহ অনেকেই। এ কারণে মামলার ভয়ে সাধারণ মানুষও এখন অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধসহ নানান অসঙ্গতি নিয়ে স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন না বা কোনো বিষয়ে মত প্রকাশ করতে সাহস পান না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখতে গিয়েও ভয়ে থাকেন অনেকে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহফুজ আহাম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের মুখে ভয়ের কালো কাপড় বেঁধে দেওয়ার মতো। আমরা রাষ্ট্র, সরকার ইত্যাদি নিয়ে আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো ভাবনাও ফেসবুক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে সন্ত্রস্ত বোধ করি। কারণ কখন কে মামলা করে দেয়! ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামের এই সেন্সরশিপ আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করেছে। এই কালো আইন বাতিল করা রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক।
আরও পড়ুন: জামিনে মুক্তি পেলেন মহিলা দল নেত্রী স্মৃতি
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ আইনে এরই মধ্যে অনেক অপপ্রয়োগ হয়েছে। ফলে এখন মামলা, গ্রেফতার, অপব্যবহার কমলেও আইন থাকলে ভয় সহজে কমবে না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক (কর্মসূচি) ও মানবাধিকারকর্মী নীনা গোস্বামী জাগো নিউজকে বলেন, আইনটির বেশ অপপ্রয়োগ হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় রয়েছে, কোনো কিছু লিখতে গেলে মামলা হয় কি না। আইনটির কিছুটা সংশোধন হবে শুনেছি, কিন্তু তার বাস্তবায়ন দেখছি না।
সাংবাদিক তানভীর হাসান তানু গ্রেফতারের ফাইল ছবি
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মোতাহার হোসেন সাজু জাগো নিউজকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো যাচাই-বাছাই করার আগেই মামলা নিয়ে নেয়। আরেকটি বিষয় হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার পাশাপাশি ক্রিমিনাল আইনেও মামলা হয় অনেক সময়। মামলা হয় এক জায়গায় কিন্তু বিচার চলে বিভাগীয় শহরে। ফলে এই মামলায় হেনস্তার শিকার হতে হয়। তাই মামলা হওয়ার আগে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করে যদি প্রমাণ হয় তখন মামলা নেওয়া উচিত।
তবে পুলিশ বলছে, এ আইনে এখন গ্রেফতার বা মামলা নেওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করা হয়।
আরও পড়ুন: জামিনে মুক্ত সাংবাদিক তানু
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) ড. খ. মহিদ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, যেকোনো মামলা নেওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করা হয়। কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরোয়ানা ছাড়াও গ্রেফতার করা হয়। এটি আমাদের পুরোনো আইনেও রয়েছে।
আরএসএম/এমএইচআর/এসএইচএস/এএসএম