ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

নেতার হলফনামা ও বাস্তবতা: ভোটারের আস্থার সংকট কোথায়?

মোস্তফা হোসেইন | প্রকাশিত: ০৯:৩৫ এএম, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬

দুই রুমের বাসা। এক রুমের চৌকিতে বিছানা পাতা। চৌকির সামান্য অংশ ফাঁকা। একজন শোয়ার জায়গা। বাকিটুকুতে বইয়ের স্তূপ। অবশিষ্ট একটি রুম কিছুটা বড়। হল ঘরের মতো। এক কোনায় রান্নার চুলা-হাঁড়ি-পাতিল। এটা একজন রাজনৈতিক নেতার বসত।

এটা পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার উখড়া এলাকায়-বর্তমান ওই জেলা সিপিএম সেক্রেটারি গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায়ের ঠিকানা। রাজনীতি করার কারণে বিয়ে করেননি। ১৭-১৮ বছর আগে যখন তার ওই বাসায় গিয়েছিলাম তার দুদিন আগে তার বাবা প্রয়াত হয়েছেন। শেষকৃত্য সম্পন্ন করে পরদিনই চলে এসেছেন উখড়ায়। পার্টির কাজ আছে তাই। পেশা রাজনীতি। পার্টির ভাতায় জীবনযাপন।

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব বসু দায়িত্ব পালনকালেও দুই রুমের বাসায় থাকতেন। দীর্ঘকাল মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী জ্যোতি বসুর জীবনযাপনও ছিল তেমনি। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধু চটি পায়ে চলতে দেখাই নয়, তিনি থাকেন একটি টালির ঘরে। সম্পদ আছে মাত্র ১৫ লাখ টাকার। রাজনীতিকেই সংসার বানিয়েছেন, তাই বিয়েও করেননি। অথচ সাতবার এমপি হয়েছেন নির্বাচনে এবং পশ্চিমবঙ্গে টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী তিনি।

না এমন ভাবার কারণ নেই, ভারতেই শুধু এমন রাজনীতিবিদ আছেন। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ার পরও কারও কারও ঢাকা শহরে নিজের বাড়ি না থাকার উদাহরণ আছে। আমাদের জাতীয় নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বাড়ি-গাড়ি ছিল না। থাকতেনও টাঙ্গাইলের সন্তোষে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি ছিলেন বোরহান আহমেদ। রাজনীতি করতে গিয়ে সংসার করার সুযোগ পাননি। জীবনটাও ছিল অতি সাধারণ। চপ্পল পায়ে চলতে দেখেছি দীর্ঘদিন। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলেরই সাবেক সভাপতি (সম্ভবত প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি) ইস্কান্দার আলীর ঢাকায় কোনো বাড়িঘর, গাড়ি কিছুই ছিল না। সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ নির্মল সেনের কথা তো সবারই জানার কথা। এমন আরও আছেন, তবে বড় দলের বড় নেতা কিংবা মন্ত্রী এমপি হওয়ার সুযোগ পাওয়া নেতাদের বাড়ি-গাড়ি নেই এমন কারও নাম জানা নেই।

আমাদের দেশের নেতাদের রাজকীয় চালচলন দেখতে পেলেও সম্পদ ও সম্পদ বৃদ্ধির তালিকা ওইভাবে জনগণ জানতে পারে না। নির্বাচন এলে প্রদর্শিত আয় ও সম্পদই দেখার সুযোগ হয়েছে সম্প্রতি। ক্ষমতা ছাড়ার পর প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ হয়, যেখানে আবার সত্য-মিথ্যা তালগোল পাকানোর ঘটনাই ঘটে বেশি। জনগণ ও নেতাদের মধ্যে প্রচলিত দেওয়াল উঁচু হওয়ায় মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে ইচ্ছামতো বিত্তবান বানায়। হয়তো বা অধিকাংশ তাদের কল্পনার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। দৈনিক পত্রিকাগুলোও ফলাও করে তথ্য প্রচার করছে। এই সুযোগটি করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা দেবে এই প্রক্রিয়া।

একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ৫টি দলের সিনিয়র নেতাদের আয় ও সম্পদের বিবরণীতে দেখা যায়- ‘পাঁচটি রাজনৈতিক দলের ১০ শীর্ষ নেতার মধ্যে সাতজনেরই মাসে আয় লাখ টাকার কম। সবচেয়ে কম আয় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের। তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এরপরেই রয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, যার আয় বছরে ৪ লাখ টাকা। তাদের চেয়ে আয়ে কিছুটা এগিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা; যা মাসে ৫৬ হাজার টাকার সামান্য বেশি।

পাঁচটি দলের নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বার্ষিক আয় জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারির। তিনি বছরে ৩৩ লাখ টাকা আয় করেন। সম্পদে তিনি শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ধনী। ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা সম্পদের মালিক তিনি। ৪ কোটি ৫ লাখ টাকার সম্পদ নিয়ে এরপরই রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তার মাসিক আয় লাখ টাকার মতো। জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের আয় বছরে ৪ লাখ টাকা।

প্রার্থীদের সম্পদ ও আয়ের হিসাব দেখে ভোটার প্রার্থী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তারা বুঝতে পারবে ওই প্রার্থী নির্বাচিত হলে তার দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে গিয়ে জনগণের তহবিলে হাত দেবেন কি না। যে প্রার্থী নিজ সংসার চালানোর এক দশমাংসও আয় করতে পারে না সেই ব্যক্তি এমপি হয়ে আদৌ জনসেবা করতে পারবে কি না, এমন বিষয়ও ভোটার ভাবতে পারেন। প্রার্থীদের প্রদর্শিত হিসাব-কিতাবে শুভংকরের ফাঁকি আছে কি না তাও তারা যাচাই করার সুযোগ পায়।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আয়ে দ্বিতীয়। পেশায় পরামর্শক এই নেতা বছরে ১৬ লাখ টাকা আয় করেন। ১৯০ ভরি স্বর্ণের মালিক ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের বার্ষিক আয় ১৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মাসে আয় ৩৯ হাজার টাকা। এনসিপির সদস্য সচিব শিক্ষানবিশ আইনজীবী আখতার হোসেনের আয়ও তার চেয়ে বেশি, বছরে ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা।’

প্রদর্শিত তথ্য দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করে রাজধানীর পস এলাকা বসুন্ধরায় আধুনিক বসতিতে বসবাস করা সম্ভব হয় কী করে। যদি কেউ বলেন, দল তাকে ভাতা দেয়। তখন প্রশ্ন আসতেই পারে তিনি দল থেকে যে ভাতা পান সেটা কি তার আয় নয়? ধরে নেওয়া যাক ওই প্রার্থীর যাবতীয় খরচ তার দল বহন করে, তারপরও তার সংসার খরচের প্রশ্ন আসে। এই ৩০ হাজার টাকায় কী করে তার সংসার খরচ চলে? আবার অবাক করা তথ্যও জানা যায়-জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের একটি হিসাবে দেখা গেছে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী রমজান আলীর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসিক আয় ১ হাজার ২৫০ টাকা। (সমকাল, ৪ জানুয়ারি ২০২৬)। ৩০ হাজার টাকা মাসিক আয় দিয়ে যেমন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থেকে জীবনযাপন প্রশ্নবোধক তেমনি বাংলাদেশে কোনো রাজনীতিবিদ মাসে মাত্র ১২৫০.০০ টাকা আয় করে নিজে চলে কীভাবে তার সংসার থাকলে সেটাও চলে কী করে? তবে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কিছু প্রশ্নের জবাব তারা মিলিয়ে নিতে পারেন। যেমন-যে নেতা মাসে ১২৫০ টাকা মাত্র রোজগার করার যোগ্যতা রাখেন তিনি এমপি হয়ে কী করবেন?

প্রার্থীদের সম্পদ ও আয়ের হিসাব দেখে ভোটার প্রার্থী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তারা বুঝতে পারবে ওই প্রার্থী নির্বাচিত হলে তার দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে গিয়ে জনগণের তহবিলে হাত দেবেন কি না। যে প্রার্থী নিজ সংসার চালানোর এক দশমাংসও আয় করতে পারে না সেই ব্যক্তি এমপি হয়ে আদৌ জনসেবা করতে পারবে কি না, এমন বিষয়ও ভোটার ভাবতে পারেন। প্রার্থীদের প্রদর্শিত হিসাব-কিতাবে শুভংকরের ফাঁকি আছে কি না তাও তারা যাচাই করার সুযোগ পায়।

এই পর্যন্ত যেসব প্রার্থীর খতিয়ান প্রকাশ হয়েছে, মোটামুটি তাদের অধিকাংশেরই আয় মাসিক ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। প্রদর্শিত আয়ের এই অংক বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা দেখার বিষয়। মোটা দাগে বলতে গেলে, এসব প্রার্থী সঠিক আয় দেখাননি এটা মনে করা যেতে পারে। কারণ তাদের জীবনযাপন দেখে এসব তথ্যকে সত্য বলা যায় না।

বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনেই ২০-৩০ লাখ টাকায় করা সম্ভব হয় না। সেখানে যে প্রার্থীর মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা কিংবা ১ হাজার টাকার কিছু বেশি, তিনি নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহ করবেন কীভাবে? তবে কিছু কৌতূহল উদ্দীপক তথ্যও জানা গেছে এই সুবাদে। সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম যখন উপদেষ্টার পদ ত্যাগ করেন তখন জনসমক্ষে তিনি তার সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, উপদেষ্টা হওয়ার আগে তার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। উপদেষ্টার সন্মানী গ্রহণের জন্য তিনি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। পদত্যাগকালে সেই অ্যাকাউন্টে স্থিতি ছিল ১০ হাজার ৬৯৮ টাকা। ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর এই দশ মাস পর এসে দেখা গেলো তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ টাকার। স্ত্রীর নামেও আছে ১৫ লাখ টাকার সম্পদ।

এমন প্রশ্ন অন্য অনেক নেতার ক্ষেত্রেই করা যাবে। হয়তো ভোটাররা বিশ্লেষণও করবেন তাদের প্রার্থীদের সহায় সম্পদ বিষয়ে। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়নে কারা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তাদের বাছাই করতেও ভোটারদের সুবিধা হবে নিঃসন্দেহে।

হাতজোড় করে ভোট ভিক্ষা চাওয়া নেতাদের আবেদন নিবেদন যেমন ভোটাররা দেখছে, তেমনি তাদের দৃষ্টি কিন্তু প্রার্থীদের বহনকারী দামি গাড়ির দিকেও যায়। হাতজোড় করা প্রার্থীর দৈনন্দিন জীবনযাপনও কিন্তু তার মনে ভেসে আসে। প্রশ্নবিদ্ধ আয়ে রাজকীয় জীবনযাপনও দেখে তারা। বর্তমানের এই দৃশ্য দেখে তারা সহজেই নেতার আগামীটাও কল্পনা করতে পারে। ভাবতে পারে নেতা নির্বাচিত হয়ে কতটা জনগণের থাকবেন আর কতটা নিজের ভাগ্য উন্নয়নে মনোযোগী হবেন।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

এইচআর/এমএস