ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

মব সন্ত্রাসের বিভীষিকা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা

চিররঞ্জন সরকার | প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় ঘটনা ছিল মব সন্ত্রাস। এই সময় বাংলাদেশের জনজীবনে একটি আতঙ্কজনক বাস্তবতা বারবার ফিরে এসেছে—মব সহিংসতা। কোনো ঘটনা ঘটলেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানোর আগেই উত্তেজিত জনতা বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে—এমন দৃশ্য বহুবার দেখা গেছে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং স্থানীয় ক্ষোভ—সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘মব কালচার’ সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রথম এবং প্রধান প্রত্যাশাই ছিল, দেশে যেন মব সন্ত্রাসের অবসান হয়। সাধারণ মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন—বাংলাদেশে আর কোনোভাবেই মব সহিংসতা সহ্য করা হবে না।

সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশে দাবি-দাওয়া থাকবে, প্রতিবাদ হবে, মিছিল-সমাবেশ চলবে—কিন্তু তা হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। মহাসড়ক অবরোধ, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সহিংসতা—এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বক্তব্য কেবল প্রশাসনিক সতর্কতা নয়; এটি আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক প্রকাশ্য অঙ্গীকার। কারণ মব সন্ত্রাস শুধু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার নাম নয়—এটি বিচারব্যবস্থা, সংবিধান ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাই ছিল মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে না পারা। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ মতে, গত দুই বছরে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৮ জন নিহত হন, আর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৯৭ জনে। অধিকাংশ ঘটনাই গুজবনির্ভর—বিশেষ করে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ সন্দেহ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, কিংবা চুরি-ডাকাতির গুজবকে কেন্দ্র করে। পরে অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণ হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে তার জীবন, পরিবার ও সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস হয়ে গেছে।

মব সহিংসতার ধরনও বহুমাত্রিক। কোথাও গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, কোথাও ধর্মীয় উসকানিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ কখনো কখনো সহিংস জনতায় রূপ নিয়েছে। আবার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, বাউল সম্প্রদায়, ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদেরও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। এসবই প্রমাণ করে—আইনের বাইরে গিয়ে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে।

মব মানসিকতার বিস্তারের পেছনে একটি বড় কারণ হলো আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা। অনেকেই মনে করে, বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগে; তাই তাৎক্ষণিক শাস্তিই ন্যায্য। এই ধারণা অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ জনতার হাতে বিচার মানে প্রমাণ, সাক্ষ্য, যুক্তি—সবকিছুকে উপেক্ষা করা। এতে প্রকৃত অপরাধী অনেক সময় পার পেয়ে যায়, আর নিরপরাধ মানুষ শিকার হয় জনরোষের।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি ইতিবাচক দিক হলো—তিনি গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রতিবাদ নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য। গণতন্ত্র মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; তবে সেই স্বাধীনতা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার লাইসেন্স নয়। অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা, জরুরি সেবা বন্ধ করে দেওয়া, জনসম্পদ ধ্বংস করা—এসব গণতান্ত্রিক চর্চা নয়, বরং নৈরাজ্য।

তবে কেবল ঘোষণা দিয়ে মব কালচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাস্তব সংস্কার জরুরি। আইনের শাসন মানে—আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য আলাদা মানদণ্ড থাকলে মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়। বিচার হবে আদালতে, রাস্তায় নয়; গ্রেফতার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, চাপ বা প্রভাবের কারণে নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে—অর্থের বিনিময়ে হয়রানিমূলক মামলা বা গ্রেফতার করা হচ্ছে। এ ধরনের চর্চা আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে গ্রেফতার একটি ভয় দেখানোর হাতিয়ার, তবে তারা আইনকে নয়, প্রভাবকে অনুসরণ করবে। তাই পুলিশি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল রেকর্ড, বডি ক্যামেরা এবং স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

মব সহিংসতার পাশাপাশি আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। একইভাবে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনাও ঘটেছে—২০২৫ সালে অন্তত ৩৮ জন এবং ২০২৪ সালে ২১ জন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এসব ঘটনাও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তাও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কয়েকজন সাংবাদিক নিহত ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। গণমাধ্যমের ওপর হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে এবং সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে।

১৮ ডিসেম্বর শীর্ষস্থানীয় দুটি পত্রিকা—প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা গণমাধ্যম নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। হামলার সময় ফায়ার সার্ভিসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও ছিল। এ ধরনের ঘটনা কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, তথ্যপ্রবাহ ও গণতান্ত্রিক পরিসরকেও আঘাত করে।

তবে নির্বাচিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেদিন মবের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সেদিন রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাসস–এ মব সৃষ্টি করে শীর্ষ কর্মকর্তা অপসারণের ঘটনা আলোচনায় আসে। বিষয়টি উদ্বেগের। পুরনো ব্যাধি যদি আবার নতুন করে ফিরে আসে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? সান্ত্বনা পাবে কীভাবে? কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই হওয়া উচিত। মব চাপ দিয়ে সিদ্ধান্ত আদায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারক অপসারণ, আন্দোলন দমন বা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে সমালোচনা আছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে কোনো পরিবর্তন বা দাবিদাওয়া আদায়, তা যে কোনো শক্তির জন্য নিয়মতান্ত্রিক পথই হওয়া উচিত একমাত্র পথ।

ডিজিটাল যুগে গুজবের বিস্তার মব সহিংসতার বড় অনুঘটক। যাচাইহীন পোস্ট, বিকৃত ছবি, পুরোনো ভিডিও—সবকিছু মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। তাই দ্রুত তথ্য যাচাই, সাইবার মনিটরিং এবং সরকারি পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে শেখে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, সামাজিক ক্ষোভ ও রাজনৈতিক মেরুকরণও মব আচরণের পেছনে ভূমিকা রাখে। বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভ সংগঠিত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। তাই উন্নয়ন ও সুশাসনকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। শুধু কঠোরতা নয়, ন্যায়বিচার ও আস্থা নিশ্চিত করেই স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব।

সাম্প্রতিক শাসনপর্ব নিয়ে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নাম উল্লেখ করে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে—বিশেষ করে সাংবাদিক নির্যাতন ও আইনি নিপীড়নের অভিযোগ ঘিরে। যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে রাষ্ট্রের অবস্থান হতে হবে নিরপেক্ষ ও নীতিনিষ্ঠ।

মব কালচার বন্ধ করতে হলে তিনটি স্তরে একযোগে কাজ জরুরি—কার্যকর আইন প্রয়োগ, বিচারব্যবস্থা সংস্কার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত, স্বাধীন প্রসিকিউশন, পেশাদার পুলিশিং এবং জবাবদিহি—এসব নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে—গুজবে কান না দেওয়া, উত্তেজনায় না জড়ানো, আইন নিজের হাতে না নেওয়া।

সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শ দেখে আইন প্রয়োগ করলে মানুষের আস্থা ভেঙে যায়। তখনই মানুষ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে চায়। তাই নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিই হতে পারে মব সন্ত্রাস বন্ধের প্রধান ভিত্তি।

বাংলাদেশের সংবিধান আইনের শাসনের অঙ্গীকার করে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল কঠোর বক্তব্য নয়, ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। লক্ষ্য একটাই—অপরাধী শাস্তি পাবে, নিরপরাধ নিরাপদ থাকবে; প্রতিবাদ হবে, কিন্তু সহিংসতা নয়; গ্রেফতার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, বাণিজ্যের জন্য নয়। মবের বদলে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই এখন সময়ের দাবি।

এইচআর/এমএস