রহমতের দশকে প্রথম জুমা ও আমাদের ইবাদত
আলহামদুলিল্লাহ, পবিত্র মাহে রমজানের রহমতের দশকের ২য় দিনের রোজা রাখার সৌভাগ্য আল্লাহপাক আমাদেরকে দান করেছেন। এছাড়া আজ মাহে রমজানের প্রথম জুমা। রমজান মাসের জুমার দিনটি মুসলমানদের জন্য আরো বেশি গুরুত্ব ও ফজিলতপূর্ণ একটি দিন।
হাদিস পাঠে জুমার নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘ক্রীতদাস, মহিলা, নাবালক শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তি, এ চার প্রকার মানুষ ছাড়া সব মুসলমানের ওপর জুমার নামাজ জামাতে আদায় করা অপরিহার্য কর্তব্য’ (আবু দাউদ)।
তাই আমাদের এমন কোন কারণ নেই যে জুমার নামাজ আদায় থেকে বিরত থাকব, আমাদেরকে অবশ্যই জুমার দিন বাজামাত নামাজ আদায় করতে হবে। অপর এক হাদিসে মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে সুন্দর করে গোসল করবে, অতঃপর তেল ব্যবহার করবে এবং সুগন্ধি নেবে, তারপর মসজিদে গমন করবে, দুই মুসল্লির মাঝে জোর করে জায়গা নেবে না, সে নামাজ আদায় করবে এবং ইমাম যখন খুতবা দেবেন, চুপ করে মনোযোগসহকারে তার খুতবা শুনবে। দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার সব গুনা ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (আবু দাউদ)।
মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়; একটি নেকির সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহতায়ালা বলেন, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।
রমজানের এই দিনগুলোতে আমরা চেষ্টা করছি সকল প্রকার ছোট বড়ো পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। জানি না, কতটুকু এতে সফল হতে পারব।
হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় রমজান মাসে সিয়াম পালন করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় রমজানের রাত নামাজে দাঁড়িয়ে কাটাবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় লায়লাতুল কদর ইবাদাতে কাটাবে তারও আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অনেক সময় ছোটো-খাটো পাপ কাজকে আমরা গুরুত্ব দেই না। পাপ ছোট হোক বা বড় সব ধরনের পাপ ইসলামে নিষিদ্ধ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘এবং তোমরা তোমাদের পাপসমূহকে এই কারণে গোপন করতে না যে, পরকালে তোমাদের কর্ণ, তোমাদের চক্ষু এবং তোমাদের চর্ম তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে, বরং তোমরা ধারণা করিতে যে, আল্লাহ তোমাদের অনেক কার্যকলাপ সম্বন্ধে অবগত নন যা তোমরা করছ’ (সুরা হামিম আস সাজদা, আয়াত: ২২)।
হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেছেন, বায়তুল্লাহর নিকট দু’জন কুরায়শী এবং একজন সাকাফী অথবা দু’জন সাকাফী ও একজন কুরায়শী বসেছিলেন। তাদের পেটের চর্বি ছিল খুব বেশি। কিন্তু অন্তরে বুদ্ধি ছিল খুব কম। তাদের একজন বললো, তুমি কি মনে কর আমরা যা বলছি আল্লাহ তা শুনছেন? অপরজন বললো, আমরা জোরে বললে তিনি শুনতে পান, আর চুপে চুপে বললে শুনতে পান না।
অপরজন বললো, জোরে জোরে বললে যদি শুনতে পান তবে চুপে চুপে বললেও শুনতে পাবেন। তখন আল্লাহতায়ালা নাযেল করলেন, তোমরা দুনিয়ার অপরাধ করার সময় যখন লুকাতে, তখন তোমাদের এ চিন্তা ছিল না যে, তোমাদের চোখ, কান, চামড়া তোমাদেরই বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে, বরং তোমরা ধারণা করছিলে যে, তোমরা যা জান এর অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন না’ (বুখারি)।
মূলত যারা পাপ কাজ করবে তাদের অঙ্গ-প্রতঙ্গই বিচার দিবসে সাক্ষ্য দিবে যে তারা কি করেছে। আর আল্লাহতায়ালা সবই দেখেন ও জানেন। সেদিন পাপীদের অপকর্মের ছবি তাদের চোখে মুখেই ফুটে উঠবে, তারা ঐ সব পাপ কর্ম করেছে কি করে নি, এরূপ প্রশ্নের কোনোই প্রয়োজন হবে না।
মানুষ আল্লাহপাকের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হয়েও আজ আমরা কত পাপ কাজই না করি। গায়ে শক্তি আছে বলে শক্তিহীনের ওপর চড়াও হচ্ছি, অর্থ আছে বলে অর্থহীনকে তুচ্ছ জ্ঞান করছি, এক কথায় যত পাপ আছে সবই আমার দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। সব ধরনের অপকর্মই যদি আমার দ্বারা হতে থাকে তাহলে আল্লাহপাকের রহমতের আশা আমরা কীভাবে করতে পারি?
কবি শেখ সাদী (রহ.) কত সুন্দরই না বলেছেন ‘আমি ঐ পিপীলিকা, যাকে প্রতিদিন মানুষেরা ইচ্ছায় অনিচ্ছায় পদদলিত করে চলে যায়। আমি বল্লা নই যে, মানুষকে দংশন করে কান্না-কাটি করার এবং কষ্ট দেব। আমি এ নেয়ামতের শোকর কীভাবে আদায় করব যে, মানুষকে কষ্ট দেয়ার শক্তি আমার নেই।’ আমরা কী কখনও ভেবে দেখেছি যে, সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী আমরা কিন্তু আমাদের কাজকর্মে কী আদৌ এর প্রমাণ দিতে পেরেছি? এর জন্য তো আমাদেরকে দিনরাত আল্লাহপাকের দরবারে শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
অথচ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হয়েও আজ আমার দ্বারা কতই পাপই না সংঘটিত হচ্ছে। আমাদেরকে এমনভাবে জীবন পরিচালনা করতে হবে আমাদের দ্বারা যেন কোনো ধরনের পাপ কাজ সংঘটিত না হয়।
যেহেতু পবিত্র রমজান মাস অতিবাহিত করছি আর রহমতের দিনগুলো দ্রুতই চলে যাচ্ছে। তাই আসুন না, নিজের সমস্ত পাপের জন্য ক্ষমা চেয়ে রহমত, মাগফেরাত আর নাজাতের আধ্যাত্মিক পানীয় পানে সিক্ত হই। কেননা রোজার প্রতিদান আল্লাহতায়ালা নিজেই দেবেন এবং বিনা হিসাবে দেবেন।
এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়; একটি নেকির সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত।
আল্লাহতায়ালা বলেন, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে। ( মুসলিম )
অপর এক হাদিসে আছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, হজরত রাসুল করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বলেন, বান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার ও কামাচার বর্জন করে, রোজা আমার জন্যই, আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব আর (অন্যান্য) নেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ। (বুখারি)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আমাদের সবিনয় প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে ক্ষমা করে তার নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে নেন, আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
[email protected]
এইচআর/জেআইএম