ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

নীরব ঘাতক কোলন ক্যান্সার

লক্ষণ না থাকলেও কেন স্ক্রিনিং জরুরি

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান | প্রকাশিত: ০৩:০০ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬

মার্চ মাস বিশ্বজুড়ে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বা কোলন ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। এই মাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—কোলন ক্যান্সার অনেক সময় নীরবে বেড়ে ওঠে। রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার শরীরে একটি গুরুতর রোগ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। অথচ সময়মতো পরীক্ষা করলে এই ক্যান্সার অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সম্প্রতি আমার চেম্বারে ৫১ বছর বয়সী এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন। তিনি মোটামুটি সুস্থ মানুষ। বড় কোনো অসুখের ইতিহাস নেই, পেটের ব্যথা নেই, মলত্যাগে কোনো পরিবর্তন নেই, ওজনও কমেনি। দৈনন্দিন জীবনে তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলেন।

কিন্তু একটি সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে তার হালকা অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা রয়েছে। বিষয়টি তার চিকিৎসকের নজরে আসে এবং তিনি এর কারণ খুঁজতে মলের একটি পরীক্ষা করান। সেই পরীক্ষায় দেখা যায়, তার মলের মধ্যে অল্প পরিমাণে রক্ত রয়েছে—যা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু পরীক্ষায় ধরা পড়ে।

যদিও রোগীর কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছিল না, তবুও সতর্কতার অংশ হিসেবে তাকে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের কাছে পাঠানো হয়। তার বয়স, অ্যানিমিয়া এবং মলের মধ্যে রক্ত—এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে আমরা কোলোনোস্কপি করার সিদ্ধান্ত নিই।

দুঃখজনকভাবে পরীক্ষায় দেখা গেল—তার বড় অন্ত্রে কোলন ক্যান্সার রয়েছে।

এই গল্পটি খুব ব্যতিক্রম নয়। বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, অনেক রোগী যাদের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নেই, তাদের মধ্যেই কোলন ক্যান্সার বা ক্যান্সার হওয়ার আগের অবস্থা ধরা পড়ে। আমার চেম্বারে প্রায়ই এমন রোগী আসেন যাদের কোলন বা বৃহৎ অন্ত্রে প্রি-ক্যান্সারাস পলিপ ধরা পড়ে।

পলিপ থেকে ক্যান্সার: একটি ধীর প্রক্রিয়া

কোলন ক্যান্সার সাধারণত হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি একটি দীর্ঘ ও ধীরগতির প্রক্রিয়ার ফল।

প্রথমে বড় অন্ত্রের ভেতরে ছোট একটি পলিপ বা গুটির মতো বৃদ্ধি তৈরি হয়। অনেক সময় এই পলিপ সম্পূর্ণ নিরীহ থাকে, কিন্তু কিছু পলিপ ধীরে ধীরে কোষের পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। এই পরিবর্তন হতে অনেক বছর সময় লাগে।

এই কারণেই নিয়মিত স্ক্রিনিং এত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে পলিপ ধরা পড়লে সেটি সরিয়ে ফেলা যায় এবং ক্যান্সার হওয়ার আগেই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কেন এই ক্যান্সার হয়

কোলন ক্যান্সারের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে—

পারিবারিক বা জেনেটিক ঝুঁকি
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে অতিরিক্ত লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
স্থূলতা
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
ধূমপান ও অ্যালকোহল
দীর্ঘমেয়াদি অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ, যেমন ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ

তবে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর কোনো স্পষ্ট ঝুঁকির কারণ থাকে না। তাই স্ক্রিনিংই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

লক্ষণ সবসময় দেখা যায় না

কোলন ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না।

তবে কিছু সতর্ক সংকেত হতে পারে—

মলে রক্ত দেখা
দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া
মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন
অকারণে অ্যানিমিয়া
পেটব্যথা বা পেটে অস্বস্তি
অকারণে ওজন কমে যাওয়া

কিন্তু মনে রাখতে হবে, লক্ষণ না থাকলেও ক্যান্সার থাকতে পারে—যেমনটি আমরা সেই ৫১ বছর বয়সী রোগীর ক্ষেত্রে দেখেছি।

কখন স্ক্রিনিং করা উচিত

বর্তমান আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী, যাদের কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের গড় ঝুঁকি রয়েছে তাদের ৪৫ বছর বয়স থেকে নিয়মিত স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত।

যাদের পরিবারে এই ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে বা বিশেষ ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আরও আগে থেকেই স্ক্রিনিং প্রয়োজন হতে পারে।

স্ক্রিনিংয়ের পদ্ধতি

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার শনাক্ত করার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে।

মলের পরীক্ষা (Stool test):

এতে মলের মধ্যে অদৃশ্য রক্ত বা ক্যান্সারের কিছু জেনেটিক উপাদান খোঁজা হয়।

রক্ত পরীক্ষা:

কিছু ক্ষেত্রে সহায়ক তথ্য দিতে পারে।

কোলোনোস্কপি:

এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে অনেক সময় গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বলা হয়। এই পরীক্ষায় একটি ক্যামেরার সাহায্যে পুরো কোলন বা বৃহৎ অন্ত্র দেখা যায় এবং একই সঙ্গে পলিপ থাকলে তা সরিয়েও ফেলা যায়।

সচেতনতা জীবন বাঁচাতে পারে

কোলন ক্যান্সার একটি মারাত্মক রোগ হলেও এটি এমন একটি ক্যান্সার যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত স্ক্রিনিং করলে পলিপ ধরা পড়ে এবং সেগুলো সরিয়ে ফেলে ক্যান্সার হওয়ার আগেই রোগ থামিয়ে দেওয়া যায়।

মার্চ মাসের এই সচেতনতা সময়ে সবার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়া দরকার—

লক্ষণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না।

আপনার বয়স যদি ৪৫ বছর বা তার বেশি হয়, তাহলে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন এবং কোলোরেক্টাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং সম্পর্কে জানুন।

কারণ অনেক সময় একটি সাধারণ পরীক্ষা একটি পরিবারকে বড় দুঃখ থেকে বাঁচাতে পারে এবং একটি জীবন রক্ষা করতে পারে।

লেখক: আমেরিকার অরলান্ডো প্রবাসী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

এইচআর/জেআইএম