ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

পাঠাগারমুখী প্রজন্ম: আলোকিত আগামীর কারিগর

ড. হারুন রশীদ | প্রকাশিত: ১২:০৩ পিএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬

বই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, জ্ঞানের আধার এবং সভ্যতার ধারক। মানুষের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং ভাবনাকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দেয় বই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, "বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেওয়া সাঁকো।" আর এই সাঁকো বা জ্ঞানভাণ্ডারকে সুসংগঠিতভাবে সংরক্ষণ ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার নামই হলো লাইব্রেরি। 'লাইব্রেরি আন্দোলন' বলতে কেবল ইটের দালান নির্মাণ বোঝায় না; এটি মূলত বই পড়ার একটি নিরন্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জোয়ার সৃষ্টির প্রক্রিয়া। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগেও একটি আলোকিত জাতি গঠনে লাইব্রেরি আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তাই অনস্বীকার্য।

লাইব্রেরি আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি ও দর্শন

লাইব্রেরি আন্দোলনের ইতিহাস অতি প্রাচীন। মেসোপটেমিয়ার কাদামাটির চাকতি থেকে শুরু করে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি পর্যন্ত এর বিস্তার। তবে আধুনিককালে লাইব্রেরি আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় উনিশ ও বিশ শতকে। বাংলাদেশে প্রমথ চৌধুরী ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। প্রমথ চৌধুরী লাইব্রেরিকে স্কুলের চেয়েও উপরে স্থান দিয়ে বলেছিলেন, "লাইব্রেরি হচ্ছে হাসপাতালের চাইতেও বড় হাসপাতাল।" কারণ এটি মনের অসুখ সারিয়ে মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের "আলোকিত মানুষ চাই" স্লোগানে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম আমাদের দেশে এই আন্দোলনকে নতুন গতি প্রদান করেছে।

লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা ও সমাজতত্ত্ব

একটি লাইব্রেরি কেবল বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি সমাজের দর্পণ। এর প্রয়োজনীয়তা বহুমুখী:

১. জ্ঞানের গণতান্ত্রিকায়ন: ইউনেস্কোর মতে, একটি আদর্শ সমাজে প্রতি ৩ হাজার মানুষের জন্য একটি করে লাইব্রেরি থাকা প্রয়োজন। লাইব্রেরি সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে যে কেউ বিনাশুল্কে জ্ঞান আহরণ করতে পারে।

২. মানসিক বিকাশ: পাঠ্যবই আমাদের জীবিকা দেয়, কিন্তু সৃজনশীল বই দেয় জীবনবোধ। টমাস কার্লাইলের মতে, "বর্তমান যুগের প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হলো বইয়ের সংগ্রহশালা।" মানুষের সহানুভূতি ও সহনশীলতা জাগ্রত করতে লাইব্রেরির বিকল্প নেই।

৩. সাংস্কৃতিক কেন্দ্র: লাইব্রেরি একটি এলাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। পাঠচক্র ও সেমিনারের মাধ্যমে এটি সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে। ভিক্টর হুগো যথার্থই বলেছেন, "একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা মানে একটি বিশ্বাসের মন্দির নির্মাণ করা।"

পাঠাগারমুখী প্রজন্ম: আলোকিত আগামীর কারিগর

বই পড়ার অভ্যাস হ্রাস পাওয়ার কারণ ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বই পড়ার প্রতি অনীহার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:

  ডিজিটাল আসক্তি: স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফলে তরুণ প্রজন্মের নিবিড়ভাবে বই পড়ার ধৈর্য কমে যাচ্ছে।

পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা: জিপিএ-কেন্দ্রিক শিক্ষা কাঠামো শিক্ষার্থীদের কেবল সিলেবাসের বই পড়তে বাধ্য করছে, ফলে সৃজনশীল সাহিত্যের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না।

দুষ্প্রাপ্যতা ও পরিবেশ: বাংলাদেশে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের অধীনে মাত্র ৭১টি সরকারি লাইব্রেরি রয়েছে, যা বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য। অনেক লাইব্রেরির পরিবেশও আকর্ষণীয় নয়।

বই পড়ার অভ্যাস কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি আত্মিক প্রয়োজন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছিলেন, "বইয়ের মতো এত বিশ্বস্ত বন্ধু আর নেই।" একটি জাতি কতটা সমৃদ্ধ, তা বিচার করা হয় তার লাইব্রেরির সংখ্যা এবং পাঠকদের রুচি দিয়ে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেধাবী ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে লাইব্রেরি আন্দোলনকে একটি সামাজিক বিপ্লবে রূপান্তর করতে হবে। আসুন, আমরা হাতে হাত মিলিয়ে একটি 'বই পড়ার সমাজ' গড়ে তুলি, যেখানে আলোর মশাল হয়ে প্রতিটি ঘরে একটি করে বই জ্বলবে।

লাইব্রেরি আন্দোলন ও বই পড়ার অভ্যাস গঠনে করণীয়

একটি শক্তিশালী লাইব্রেরি আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

১. পারিবারিক সচেতনতা ও 'বুক কর্নার':

শিশুর প্রথম স্কুল হলো তার পরিবার। সিদনি স্মিথ বলেছিলেন, "গৃহের কোনো আসবাবপত্রই বইয়ের মতো সুন্দর নয়।" প্রতিটি বাড়িতে একটি ছোট বুকশেলফ থাকতে হবে। শিশুকে উপহার হিসেবে খেলনা বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের বদলে আকর্ষণীয় গল্পের বই তুলে দিতে হবে। মা-বাবাকে নিজেরাও বই পড়ে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার বাধ্যতামূলক করা:

প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি থাকতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একটি 'লাইব্রেরি পিরিয়ড' বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই নয়, বরং বাইরের বই পড়ে তার ওপর আলোচনা করবে—এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

৩. ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও পাড়া-মহল্লা পাঠাগার:

১৯৮৪ সাল থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে যে বিপ্লব শুরু করেছে, তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে পাড়ায় পাড়ায় ছোট পরিসরে লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে। 'বই বিনিময়' প্রথা চালু করলে বইয়ের সহজলভ্যতা বাড়বে।

৪. প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় (ডিজিটাল লাইব্রেরি):

বিশ্বে ই-বুক এবং অডিও বুকের বাজার প্রতি বছর ১৫-২০% হারে বাড়ছে। লাইব্রেরি আন্দোলনকে আধুনিক করতে হলে ডিজিটাল রিডিং বা কিণ্ডলের  মতো সুবিধা যুক্ত করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপের মাধ্যমে বই বুকিং বা পড়ার সুবিধা থাকলে তরুণ প্রজন্ম লাইব্রেরিমুখী হবে।

৫. বই নিয়ে উৎসব ও প্রতিযোগিতা:

এলাকাভিত্তিক 'পাঠ উৎসব' আয়োজন করা যেতে পারে। সেরা পাঠকদের পুরস্কৃত করা এবং বইয়ের রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে তরুণদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে উঠবে। উপহার হিসেবে বই দেওয়ার সামাজিক সংস্কৃতিও জোরদার করতে হবে।

লাইব্রেরি আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব

একটি সফল লাইব্রেরি আন্দোলন সমাজ থেকে উগ্রবাদ, মাদকাসক্তি এবং অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনে। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের মতে, "বই মানুষের ভেতরকার পশুত্বকে মারে এবং দেবত্বকে জাগিয়ে তোলে।" যে হাত বই স্পর্শ করে, সেই হাত অস্ত্র তুলে নেয় না। শিক্ষিত ও স্বশিক্ষিত নাগরিকই পারে একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে।

দুই.

গ্রামীণ পাঠাগারগুলোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

১. সরকারি অনুদান ও নীতিমালার আধুনিকায়ন

নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ: সরকারিভাবে বেসরকারি পাঠাগারগুলোকে যে বার্ষিক অনুদান (যেমন: এ, বি, ও সি ক্যাটাগরি অনুযায়ী ৭০,০০০ থেকে ৪৭,০০০ টাকা পর্যন্ত) দেওয়া হয়, তা বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় অত্যন্ত কম। এই বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং তা নিয়মিত বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি।

গণগ্রন্থাগার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ: 'জাতীয় গণগ্রন্থাগার নীতি ২০২০' অনুযায়ী আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে গ্রাম পর্যায়ে গ্রন্থাগার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে।

২. জনসম্পৃক্ততা ও স্থানীয় অংশীদারিত্ব

কমিউনিটি মালিকানা: পাঠাগারকে কেবল বই সংগ্রহের স্থান না বানিয়ে একটি 'কমিউনিটি হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সমাজসেবী এবং প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করে 'পাঠাগার তহবিল' গঠন করা যেতে পারে।

ভলান্টিয়ার নিয়োগ: জনবল সংকট কাটাতে স্থানীয় শিক্ষিত যুবক ও শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, যা তাদের মধ্যে পাঠাগারের প্রতি একাত্মবোধ তৈরি করবে।

৩. আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি

আইসিটি সুবিধা: গ্রামীণ পাঠাগারগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ এবং অন্তত ২-৩টি কম্পিউটার স্থাপন করা প্রয়োজন। এতে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ বা অনলাইন তথ্য সেবা প্রদানের মাধ্যমে পাঠাগারটি তরুণ প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

ডিজিটাল রিসোর্স: ই-বুক এবং অডিও বুকের সংগ্রহ বাড়ানো হলে ফিজিক্যাল স্পেসের সীমাবদ্ধতা কাটিয়েও অনেক পাঠককে সেবা দেওয়া সম্ভব।

৪. সৃজনশীল কার্যক্রম ও প্রচার

ব্যতিক্রমী আয়োজন: কেবল বই পড়া নয়, বরং কৃষি পরামর্শ, স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক সভা বা স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে পাঠাগারকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

পুরস্কার ও প্রতিযোগিতা: নিয়মিত পাঠচক্র, কুইজ এবং রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বিজয়ীদের পৃষ্ঠপোষকদের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৫. প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি

পেশাগত প্রশিক্ষণ: গ্রামীণ পাঠাগারের কর্মীদের লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট ও আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

নিবন্ধকরণ সহজীকরণ: অনেক পাঠাগার সঠিক নির্দেশনার অভাবে সরকারি নিবন্ধন পায় না। জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ ও প্রচার করা প্রয়োজন।

গ্রামীণ পাঠাগারগুলো কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে—এই বার্তাটি নীতিনির্ধারক ও দাতা গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোই পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি।

তিন.

বই পড়ার অভ্যাস কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি আত্মিক প্রয়োজন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছিলেন, "বইয়ের মতো এত বিশ্বস্ত বন্ধু আর নেই।" একটি জাতি কতটা সমৃদ্ধ, তা বিচার করা হয় তার লাইব্রেরির সংখ্যা এবং পাঠকদের রুচি দিয়ে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেধাবী ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে লাইব্রেরি আন্দোলনকে একটি সামাজিক বিপ্লবে রূপান্তর করতে হবে। আসুন, আমরা হাতে হাত মিলিয়ে একটি 'বই পড়ার সমাজ' গড়ে তুলি, যেখানে আলোর মশাল হয়ে প্রতিটি ঘরে একটি করে বই জ্বলবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর জাগো নিউজ।  সেলিম আল দীন পাঠাগার, কচুয়া, সখীপুর, টাংগাইল (জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের তালিকাভুক্ত) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

এইচআর/জেআইএম