ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

শৈশব যখন ফুটপাতে: বিশ্ব পথশিশু দিবসের প্রাসঙ্গিকতা

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম | প্রকাশিত: ১১:২৩ এএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চললেও সমাজের একটি বড় অংশ এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ হলো পথশিশুরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশুকে রাস্তায় বেড়ে উঠতে দেখা যায়—যাদের শৈশব জড়িয়ে থাকে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তায়। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আজও বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বাস্তবতায় ‘লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন‘ (লিডো) পথশিশুদের জন্য একটি আশার আলো হিসেবে কাজ করছে। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা শিক্ষা, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছে, যার লক্ষ্য পথশিশুদের মানবসম্পদে রূপান্তর করা।

পথশিশুদের জীবন অত্যন্ত অনিরাপদ। তারা প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকে এবং অল্প বয়সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। লিডো এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা শেল্টার হোম পরিচালনা করছে, যেখানে শিশুদের থাকা-খাওয়া, পোশাক ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এই স্থিতিশীল পরিবেশ তাদের জীবনে নিরাপত্তা ও আশার সঞ্চার করে।

শিক্ষাক্ষেত্রে লিডোর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিত শেখানোর পাশাপাশি শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে কাজ করছে। অনেক শিশুকে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে তাদের পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করা হচ্ছে। এর ফলে পথশিশুরা নতুন জীবনের সুযোগ পাচ্ছে।

শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, লিডো শিশুদের জীবন দক্ষতা—যেমন যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, আত্মরক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা শেখায়। এই দক্ষতাগুলো তাদের বাস্তব জীবনে টিকে থাকতে সহায়তা করে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও লিডোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পথশিশুরা সাধারণত অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়। লিডো নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থাও করে থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিকাশের বিষয়টিও তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো হয় এবং ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি গড়ে তোলা হয়।

পথশিশুদের উন্নয়নে লিডোর ভূমিকা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

লিডোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো পরিবার পুনর্মিলন। অনেক শিশু বিভিন্ন কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। লিডো তাদের পরিবার খুঁজে বের করে এবং উপযুক্ত পরিবেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। একই সঙ্গে পরিবারকে সচেতন করা হয়, যাতে শিশুরা পুনরায় রাস্তায় না ফিরে যায়।

এছাড়া, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও লিডো কাজ করছে। কর্মশালা, সেমিনার ও প্রচারণার মাধ্যমে তারা পথশিশুদের অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করছে, যা সমাজে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে সহায়ক।

তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। লিডোর সেবার আওতায় থাকা শিশুদের সংখ্যা মোট পথশিশুর তুলনায় সীমিত। কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। পাশাপাশি, প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রমের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য।

প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতে লিডোর কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে। ডিজিটাল শিক্ষা ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা তাদের কাজকে আধুনিক ও বিস্তৃত করবে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নে ভূমিকা রাখাও সময়ের দাবি।

নগরায়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা পথশিশু সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। তাই পরিবর্তিত বাস্তবতায় লিডোকে তাদের কৌশল নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, পথশিশুদের উন্নয়নে লিডোর ভূমিকা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা যদি সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসি, তবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব- যেখানে কোনো শিশু রাস্তায় নয়, বরং শিক্ষার আলোয় নিরাপদ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাবে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন। 
[email protected]

এইচআর/জেআইএম