বর্ষবরণ উৎসব নিয়ে কেন এত টানাটানি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন মঙ্গল শোভাযাত্রা। পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরুতেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।আবার এই শোভাযাত্রাকে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগেও অভিযুক্ত হতে হয়,তখন থেকেই। না, সেটা শুধু নামের কারণেই নয়,ওই সমালোচকরা এতে জীবজন্তুর ছবি, সরায় শিল্পকর্মকে স্পষ্টতই মুসলিম বিদ্বেষী সংস্কৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করে।কিন্তু জনপ্রিয়তার তোড়ে তাদের দাবি চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু যখন মঙ্গল শোভাযাত্রার সুনাম ও স্বীকৃতি বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বসংস্কৃতির অংশ হিসেবে গণ্য হয় তখন শোভাযাত্রাকে ঢালাওভাবে ধর্মবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করা কমিয়ে দেওয়া হয়।কিন্তু পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনকে তারা বিদায়াত হিসেবে বলতেই থাকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এলে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিরোধীরা আবা্রও তাদের ভাবনার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টায় নেমে পড়ে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা সরওয়ার ফারুকী নিজে একজন সংস্কৃত কর্মী হওয়ার কারণে অনেকেরই ধারণা ছিল, হয়তো মঙ্গল শোভাযাত্রা সনামেই চালু থাকবে। কিন্তু নিজের পরিচিতিকে তিনি পাশ কাটয়ে গেলেন মূলত আত্মরক্ষার প্রয়োজনে। মুস্তফা সারওয়ার ফারুকী মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিভাজনের প্রতীক আখ্যায়িত করে নাম রাখলেন `বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ । ওই সময় ব্যাপক সমালোচনা হলো এ নিয়ে। মঙ্গল বিরোধীরা নাম পরিবর্তনে সন্তোষ প্রকাশ করলেও বিদায়াত কুফুরি ফতোয়া বাস্তবায়নে সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হয়। ওয়াজ মাহফিলে কিংবা ধর্মীয় আলোচনায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে শিরক হিসেবে তারা আখ্যায়িত করতে থাকেন।
অথচ এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মাধ্যমে বিশ্বসংস্কৃতির অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ইউনূস সরকার আমলে একবার এবং বিএনপি সরকার আমলে আবার নাম পরিবর্তন হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়ে গেছে সেই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবেই। এখন সরকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইউনেস্কোর কাছে যদি আবেদন করে যে, মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করা হোক। সেক্ষেত্রে ইউনেস্কো যদি বলে যে, মঙ্গল শোভাযাত্রাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তখন কী বাংলাদেশের একটি অনুষ্ঠানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাতিল হয়ে যাবে? যদি তারা আবেদন গ্রহণও করে তারপরও বাংলাদেশের সুনাম কি অক্ষুণ্ন থাকবে?
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচি যার পেছনে একটি উদ্দেশ্য থাকে,যা মানুষের মন-মানসিকতাকে প্রতিফলন ঘটায়।সেখানে এর ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ কেন? সংস্কৃতি তার নিজস্ব গতিতে চলবে এটাইতো কাঙ্ক্ষিত।চারুকলায় যখন এই মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয় তখন কি সরকার নাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল? নাকি আয়োজকদের কর্মসূচি নির্ধারণ করে দিয়েছিল? এটি কীভাবে হবে,নাম কি হবে, কারা যুক্ত থাকবে কখন কোথায় হবে সবই তো চারুকলার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিকল্পনাতেই হয়েছিল। এখন কেন বারবার নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে।
নাম পরিবর্তনের পরিবেশ দাবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে,যারা মঙ্গলে অমঙ্গল দেখেন তারা কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা আনন্দ শোভাযাত্রায় মুসলিম বিদ্বেষকেও খুঁজে পান। স্পষ্টত বক্তব্য তাদের-এগুলো হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি। বাস্তবতা হচ্ছে সংস্কৃতি জাতির চেতানাপ্রসুত বিষয়। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে বিয়ের সময় নারীরা উলুধ্বনি দেয়। আরব মুসলমান নারীরা উলুধ্বনি দেয় সেই সুবাদের বাঙালি মুসলমান নারীদের জন্য এটা প্রযোজ্য নয়। এটা ওদের সংস্কৃতি মুসলমান হওয়ার পরও বাংলাদেশে সর্বজনীন উৎসব এটা নয়।
মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইরানে ঘটা করে নওরোজ পালনের ইতিহাস দীর্ঘ। অগ্নিউপাসকরা প্রাচীনকালে অগ্নিপূজা করতো। সেই আদলে অগ্নিকুণ্ডের উপর দিয়ে লাফানোর মতো বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় এখনও। নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনা,কবিতা আবৃত্তি,বিভিন্ন খেলাধুলার প্রচলন আছে বর্ষবরণের উৎসবে। নওরোজ উদ্যাপনের উদাহরণ কুর্দিদেরও মধ্যেও আছে। অথচ এর উৎস ইসলাম প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকে। অগ্নিউপাসকদের রীতি-রেওয়াজ বলে সেখানে এটা নিষিদ্ধ হয়নি। নওরোজ উৎসবেও ঘাটতি পড়েনি কিংবা জায়েজ না জায়েজ এমন বাহাসও তৈরি হয়নি।
একটি সাংস্কৃতিক আচরণ মঙ্গল শোভাযাত্রা,বর্ষবরণ শোভাযাত্রা কিংবা নতুন কোনো নামেও যদি ডাকা হয় সেটা। এখানে বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কেন? সংস্কৃতি চলবে নিজ পথে। সংস্কৃতির চলার পথের সাথী হচ্ছে রাজনীতি। আরও স্পষ্ট বলতে গেলে,সংস্কৃতির অংশ হচ্ছে রাজনীতি। এখন রাজনীতি যদি সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে কার লাভ-ক্ষতি কেমন হবে? এই মানসিকতা সংস্কৃতির সামান্য ক্ষতি করতে পারলেও রাজনীতির ক্ষতিটা হবে অনেক বেশি। রাজনীতির ক্ষতি দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবেই। সেই বোধ থেকেই যেন রাজনীতি রাজনীতি নিয়েই থাকে-সংস্কৃতি থাকুক নিজ বলয়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের একটি অংশ শোভাযাত্রার নাম নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা খোঁজা হচ্ছে। মঙ্গল শব্দ প্রয়োগে যদি ধর্মের ওপর আঘাত আসে তাহলে কি মুসলমানদের মঙ্গল শব্দটি অভিধান থেকে বাদ দিতে হবে? মঙ্গল অর্থও কি পাল্টে দেওয়া সম্ভব হবে? আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুনও কি বলা যাবে না?
সর্বশেষ ইউনূস সরকারের পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এখন। মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামটিই ছিল বছর দুই ধরে। যেখানে মঙ্গল বাদ হয়ে যায়।এখন আবার কী কারণে সেটিও পরিবর্তন হচ্ছে,স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন আসে। এবার যুক্ত হচ্ছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম।অথচ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী গত ১ এপ্রিল স্পষ্টত বলেছিলেন,‘মঙ্গল আর আনন্দের মধ্যে পার্থক্যটা কী? আসলে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
মঙ্গল শোভাযাত্রায় যতখানি আনন্দ আছে, একই ধরনের আনন্দ এই আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যেও আছে। আনন্দের কোনো পার্থক্য নেই।’ এ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা অনর্থক এবং এ ধরনের বিষয় দেশকে বিভক্ত করতে পারে। (যুগান্তর ১ এপ্রিল ২০২৬)। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে-ড. মুহম্মদ ইউনূস যে পরিবর্তন করেছেন সেটা অপ্রয়োজনীয় ছিল। তাঁর বক্তব্য মঙ্গল নামের পক্ষেই যায় এবং নাম পরিবর্তনকে অপ্রয়োজনীয় এবং বিভক্তিকে উস্কে দেওয়া হিসেবেই অভিহিত করেছেন।
মন্ত্রীর বক্তব্য প্রচারের পর হেফাজতে ইসলাম তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী এধরনের পরিবর্তনকে দেশকে বিভক্ত করতে পারে বলেছেন, ঠিক উল্টোটা বলা হলো হেফাজতে ইসলাম এর পক্ষ থেকে। এমনকি তারা নিতাই রায় চৌধুরীর মন্তব্য উল্লেখকালে মনে করিয়ে দিলেন, তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন। মন্ত্রী যদি মঙ্গল শোভাযাত্রায় ফিরে যেতে চান তাহলে প্রতিহতের ঘোষণাও দিলেন তারা। বলা হলো-
‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে নিতাই রায় চৌধুরীকে সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু আমাদের এই ঔদার্যের সুযোগ নিয়ে যারা হিন্দুত্ববাদী ও আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাতে চাইবে, তাদের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’ (ইত্তেফাক,১ এপ্রিল ২০২৬)
এমন প্রতিক্রিয়াকে আমলে নিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা নয় কিংবা ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ও নয়-এবার এই শোভাযাত্রার নাম হবে-‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষিত নামে আনন্দ ছিল তাহলে এই আনন্দও কি অমুসলিম শব্দ হিসেবে গণ্য হয়েছে? ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভা যাত্রায়’ও কী ক্ষতি ছিল? এর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। তবে সরকারের এই পরিবর্তন কোন কারণে? এটা কি ইউনূস সরকারের গৃহীত নাম হওয়ার কারণে? নাকি সেখানে ‘আনন্দ’ শব্দটি থাকার কারণে। এই ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রায়’ও কি বিভাজনের গন্ধ আছে?
একটি সাংস্কৃতিক আচরণ মঙ্গল শোভাযাত্রা,বর্ষবরণ শোভাযাত্রা কিংবা নতুন কোনো নামেও যদি ডাকা হয় সেটা। এখানে বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কেন? সংস্কৃতি চলবে নিজ পথে। সংস্কৃতির চলার পথের সাথী হচ্ছে রাজনীতি। আরও স্পষ্ট বলতে গেলে,সংস্কৃতির অংশ হচ্ছে রাজনীতি। এখন রাজনীতি যদি সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে কার লাভ-ক্ষতি কেমন হবে? এই মানসিকতা সংস্কৃতির সামান্য ক্ষতি করতে পারলেও রাজনীতির ক্ষতিটা হবে অনেক বেশি। রাজনীতির ক্ষতি দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবেই। সেই বোধ থেকেই যেন রাজনীতি রাজনীতি নিয়েই থাকে-সংস্কৃতি থাকুক নিজ বলয়ে।
লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।
এইচআর/জেআইএম